‘লয়ের পুতুল’ বিরজু মহারাজের প্রয়াণ
jugantor
‘লয়ের পুতুল’ বিরজু মহারাজের প্রয়াণ

  যুগান্তর ডেস্ক  

১৮ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রবিশঙ্কর তার নাচ দেখে বলেছিলেন, ‘তুমি তো লয়ের পুতুল!’ কত্থকের সেই ‘মহারাজা’ আর নেই। রোববার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি নৃত্যগুরু পণ্ডিত বিরজু মহারাজ ৮৩ বছর বয়সে। একাধারে নাচ, তবলা এবং কণ্ঠসঙ্গীতে সমান পারদর্শী ছিলেন বিরজু। ছবিও আঁকতেন। ভারতের সংবাদ মাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, রোববার রাতে দিল্লির বাড়িতে নাতির সঙ্গে খেলছিলেন। তখনই হঠাৎ করে অসুস্থ বোধ করেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন তিনি। সম্প্রতি তার কিডনির অসুখ ধরা পড়ায় ডায়ালাইসিস চলছিল। প্রবাদপ্রতিম শিল্পী বিরজু মহারাজ বলতেন, ‘হৃদয়ের কম্পনই তো নাচ!’ সেই হৃৎস্পন্দন, সেই নাচ থেমে গেল চিরতরে। কত্থকের ‘মহারাজা’ পরিবারে জন্ম। সাত পুরুষ ধরে তাদের পরিবারে কত্থক নাচের চর্চা। তার দুই কাকা শম্ভু মহারাজ এবং লচ্ছু মহারাজ ছিলেন বিখ্যাত শিল্পী। বাবা অচ্চন মহারাজই ছিলেন বিরজুর গুরু।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একাধিক ধারার সঙ্গে যেমন যুক্ত ছিলেন, তেমনই বহু ছবিতে কোরিওগ্রাফারের কাজও করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সত্তর দশকের মাঝামাঝি সত্যজিৎ রায়ের ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’-র কোরিওগ্রাফি। ছবিতে দুটি গানের কোরিওগ্রাফি করেন। তার মধ্যে একটা ছিল ‘কানহা মে তোসে হারি’। গানটার সঙ্গে ছিল আমজাদ খানের অভিনয়।

কলকাতার সঙ্গে নিবিড় যোগ ছিল বিরজুর। ১৯৫২ সালে এ শহরেই জীবনে প্রথম মঞ্চে পারফর্ম করেন। মন্মথ নাথ ঘোষের বাড়িতে। তখন তার বয়স ১৪। বাবা মারা গিয়েছেন। জীবনে দাঁড়াবার জন্য লড়াই করছেন। সে সময় ডাক কলকাতায়। কাকা লচ্ছু মহারাজ তখন মুম্বইয়ে কোরিওগ্রাফির কাজ করছেন। আর এক কাকা শম্ভু মহারাজ ব্যস্ত ছিলেন লক্ষ্ণৌউতেই নিজের কাজে। মা এক পাতানো ভাইয়ের সঙ্গে কলকাতায় পাঠিয়েছিলেন বিরজুকে। এর পর থেকে কাকাদের কাছে শিক্ষা চলেছে। ধীরে ধীরে মেলে ধরেছেন নিজেকে। দেশ-বিদেশে বহু অনুষ্ঠান করেছেন। রয়েছে প্রচুর ছাত্রছাত্রী। নিজের শিল্পকর্ম এবং শিক্ষার মধ্য দিয়েই অমরত্ব লাভ করবেন বিরজু।

উপমহাদেশের কত্থক কিংবদন্তি ঈশ্বরী প্রসাদের এ বংশধর জন্ম নেন ১৯৩৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। বাবা পতি অচ্ছন মহারাজের কাছে ‘তেহাই’ আর ‘টুকরা’ আবৃত্তি দিয়ে শুরু; আট বছর বয়সেই নাচ, গান আর বাদনে তুখোড় হয়ে ওঠেন। নয় বছর বয়সে ‘শিক্ষক’ বাবাকে হারিয়ে ছন্দপতন। নিরুপায় হয়ে ভিটেবাড়ি বিক্রি করতে হলেও সঙ্গীত আর নৃত্যসাধনা থেকে একচুল বিচ্যুত হননি ‘দুঃখহরণ নাথ’। শৈশবে এ নামেই পরিচিত ছিলেন বিরজু মহারাজ।

কিশোর বয়সেই বিরজু হয়ে ওঠেন নৃত্যগুরু। প্রথমে সঙ্গীতভারতী, পরে ভারতীয় কলাকেন্দ্র, কত্থককেন্দ্র ও নিজের প্রতিষ্ঠিত কলাশ্রমে তালিম দিয়েছেন ৪৬ বছর বয়সে ‘পদ্মবিভূষণ’ পাওয়া এ কিংবদন্তি। ‘বাজিরাও মাস্তানি’ চলচ্চিত্রের জন্য ২০১৬ সালে ‘ শ্রেষ্ঠ কোরিওগ্রাফার’ হিসাবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

পেয়েছেন সঙ্গীত ও নাটক আকাদেমি অ্যাওয়ার্ড, কালিদাস সম্মাননা, নৃত্যচূড়ামণি পুরস্কারসহ আরও অসংখ্য পদক ও পুরস্কার। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, খাইরাগারাহ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে দিয়েছে সম্মানসূচক ডিগ্রি।

বিরজু মহারাজ ২০১৬ সালের ডিসেম্বরেও এসেছিলেন বাংলাদেশে, ছায়ানটে কত্থক নৃত্য উৎসবের মঞ্চে শুনিয়েছিলেন নিজের কর্মময় জীবনের গল্প, নাচ নিয়ে একান্ত ভাবনার কথা।

তিনি বলেছিলেন, ‘সারা দুনিয়াই নাচছে! এই দেখুন না, বাতাস নাচছে, চাঁদ নাচছে, পৃথিবী নাচছে, পাতা নাচে, ফুল নাচে। কৃষ্ণ বাঁশি বাজায়, শিব ডমরু বাজায়, নাচে তো বটেই।’

‘ভগবান আসলে আমাদের সবার মধ্যে কেমন এক অদ্ভুত ছন্দ দিয়েছেন। আমি বলি কী, হৃদয়ের কম্পনই তো নাচ। এ নাচ কেউ খুঁজে পায়, কেউ পায় না।’

‘লয়ের পুতুল’ বিরজু মহারাজের প্রয়াণ

 যুগান্তর ডেস্ক 
১৮ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

রবিশঙ্কর তার নাচ দেখে বলেছিলেন, ‘তুমি তো লয়ের পুতুল!’ কত্থকের সেই ‘মহারাজা’ আর নেই। রোববার রাতে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হলেন উপমহাদেশের কিংবদন্তি নৃত্যগুরু পণ্ডিত বিরজু মহারাজ ৮৩ বছর বয়সে। একাধারে নাচ, তবলা এবং কণ্ঠসঙ্গীতে সমান পারদর্শী ছিলেন বিরজু। ছবিও আঁকতেন। ভারতের সংবাদ মাধ্যম আনন্দবাজার পত্রিকা জানায়, রোববার রাতে দিল্লির বাড়িতে নাতির সঙ্গে খেলছিলেন। তখনই হঠাৎ করে অসুস্থ বোধ করেন। সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রয়াত হন তিনি। সম্প্রতি তার কিডনির অসুখ ধরা পড়ায় ডায়ালাইসিস চলছিল। প্রবাদপ্রতিম শিল্পী বিরজু মহারাজ বলতেন, ‘হৃদয়ের কম্পনই তো নাচ!’ সেই হৃৎস্পন্দন, সেই নাচ থেমে গেল চিরতরে। কত্থকের ‘মহারাজা’ পরিবারে জন্ম। সাত পুরুষ ধরে তাদের পরিবারে কত্থক নাচের চর্চা। তার দুই কাকা শম্ভু মহারাজ এবং লচ্ছু মহারাজ ছিলেন বিখ্যাত শিল্পী। বাবা অচ্চন মহারাজই ছিলেন বিরজুর গুরু।

শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের একাধিক ধারার সঙ্গে যেমন যুক্ত ছিলেন, তেমনই বহু ছবিতে কোরিওগ্রাফারের কাজও করেছেন। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সত্তর দশকের মাঝামাঝি সত্যজিৎ রায়ের ‘শতরঞ্জ কি খিলাড়ি’-র কোরিওগ্রাফি। ছবিতে দুটি গানের কোরিওগ্রাফি করেন। তার মধ্যে একটা ছিল ‘কানহা মে তোসে হারি’। গানটার সঙ্গে ছিল আমজাদ খানের অভিনয়।

কলকাতার সঙ্গে নিবিড় যোগ ছিল বিরজুর। ১৯৫২ সালে এ শহরেই জীবনে প্রথম মঞ্চে পারফর্ম করেন। মন্মথ নাথ ঘোষের বাড়িতে। তখন তার বয়স ১৪। বাবা মারা গিয়েছেন। জীবনে দাঁড়াবার জন্য লড়াই করছেন। সে সময় ডাক কলকাতায়। কাকা লচ্ছু মহারাজ তখন মুম্বইয়ে কোরিওগ্রাফির কাজ করছেন। আর এক কাকা শম্ভু মহারাজ ব্যস্ত ছিলেন লক্ষ্ণৌউতেই নিজের কাজে। মা এক পাতানো ভাইয়ের সঙ্গে কলকাতায় পাঠিয়েছিলেন বিরজুকে। এর পর থেকে কাকাদের কাছে শিক্ষা চলেছে। ধীরে ধীরে মেলে ধরেছেন নিজেকে। দেশ-বিদেশে বহু অনুষ্ঠান করেছেন। রয়েছে প্রচুর ছাত্রছাত্রী। নিজের শিল্পকর্ম এবং শিক্ষার মধ্য দিয়েই অমরত্ব লাভ করবেন বিরজু।

উপমহাদেশের কত্থক কিংবদন্তি ঈশ্বরী প্রসাদের এ বংশধর জন্ম নেন ১৯৩৮ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। বাবা পতি অচ্ছন মহারাজের কাছে ‘তেহাই’ আর ‘টুকরা’ আবৃত্তি দিয়ে শুরু; আট বছর বয়সেই নাচ, গান আর বাদনে তুখোড় হয়ে ওঠেন। নয় বছর বয়সে ‘শিক্ষক’ বাবাকে হারিয়ে ছন্দপতন। নিরুপায় হয়ে ভিটেবাড়ি বিক্রি করতে হলেও সঙ্গীত আর নৃত্যসাধনা থেকে একচুল বিচ্যুত হননি ‘দুঃখহরণ নাথ’। শৈশবে এ নামেই পরিচিত ছিলেন বিরজু মহারাজ।

কিশোর বয়সেই বিরজু হয়ে ওঠেন নৃত্যগুরু। প্রথমে সঙ্গীতভারতী, পরে ভারতীয় কলাকেন্দ্র, কত্থককেন্দ্র ও নিজের প্রতিষ্ঠিত কলাশ্রমে তালিম দিয়েছেন ৪৬ বছর বয়সে ‘পদ্মবিভূষণ’ পাওয়া এ কিংবদন্তি। ‘বাজিরাও মাস্তানি’ চলচ্চিত্রের জন্য ২০১৬ সালে ‘ শ্রেষ্ঠ কোরিওগ্রাফার’ হিসাবে ভারতের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান।

পেয়েছেন সঙ্গীত ও নাটক আকাদেমি অ্যাওয়ার্ড, কালিদাস সম্মাননা, নৃত্যচূড়ামণি পুরস্কারসহ আরও অসংখ্য পদক ও পুরস্কার। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়, রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, খাইরাগারাহ বিশ্ববিদ্যালয় তাকে দিয়েছে সম্মানসূচক ডিগ্রি।

বিরজু মহারাজ ২০১৬ সালের ডিসেম্বরেও এসেছিলেন বাংলাদেশে, ছায়ানটে কত্থক নৃত্য উৎসবের মঞ্চে শুনিয়েছিলেন নিজের কর্মময় জীবনের গল্প, নাচ নিয়ে একান্ত ভাবনার কথা।

তিনি বলেছিলেন, ‘সারা দুনিয়াই নাচছে! এই দেখুন না, বাতাস নাচছে, চাঁদ নাচছে, পৃথিবী নাচছে, পাতা নাচে, ফুল নাচে। কৃষ্ণ বাঁশি বাজায়, শিব ডমরু বাজায়, নাচে তো বটেই।’

‘ভগবান আসলে আমাদের সবার মধ্যে কেমন এক অদ্ভুত ছন্দ দিয়েছেন। আমি বলি কী, হৃদয়ের কম্পনই তো নাচ। এ নাচ কেউ খুঁজে পায়, কেউ পায় না।’

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন