ঢাকার মাদক সাম্রাজ্যে ৩৭ গডফাদার

রাজধানীতে ছোট-বড় পাঁচ শতাধিক মাদক স্পট * সারা দেশে সাত দিনে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ২৭ * মাদকে জড়িত ২০০০ জনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কারাদণ্ড

  নুরুল আমিন ২২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাদক
ছবি: সংগৃহীত

রাজনীতিক, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও প্রশাসনের ছত্রছায়ায় ঢাকার মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে প্রভাবশালী ৩৭ গডফাদার। তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে প্রায় এক হাজার মাদক ব্যবসায়ী রাজধানীর পাঁচ শতাধিক স্পটে মাদক কেনাবেচা করছে। এসব স্পটে প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। পুলিশ-র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সম্প্রতি মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রস্তুত এক তালিকায় ৩৭ গডফাদারের নাম উঠে এসেছে। এ তালিকা ধরে রাজধানীর মাদক সাম্রাজ্য নিয়ন্ত্রণকারী গডফাদারদের গ্রেফতারে মাঠে নেমেছে পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা। অপরদিকে সারা দেশে মাদকের বিরুদ্ধে চলমান অভিযানে সাত দিনে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ২৭ জন নিহত হয়েছে।

মাদক ব্যবসা ও সেবনের অভিযোগে দুই হাজার জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত। পুলিশ, র‌্যাব ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এ কঠোর অবস্থানের কারণে আতঙ্ক বিরাজ করছে মাদক ব্যবসায়ীদের মাঝে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকের আগ্রাসন থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বাঁচাতে গডফাদারদের আইনের আওতায় আনতে হবে। শুধু দু’একজন বহনকারী ও খুচরা ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে সার্বিক পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হবে না।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের সহকারী পরিচালক খুরশিদ আলম যুগান্তরকে বলেন, ঢাকার গডফাদারদের ধরতে ডিজির নির্দেশে ১৫ দিনের বিশেষ অভিযান চলছে। মাদকের সঙ্গে যত প্রভাবশালীই জড়িত থাকুক; কাউকে ছাড় দেয়া হবে না।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, পল্লবী, কালশী, জেনেভা ক্যাম্প, কমলাপুর রেলস্টেশন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, চাঁনখারপুল, গেণ্ডারিয়া, টিটিপাড়া, খিলগাঁও, পুরানা পল্টন, বাড্ডা, ভাটারা, বনানী, গুলশান, মতিঝিল, আরামবাগ, যাত্রাবাড়ী, দক্ষিণ বনশ্রী, ধানমণ্ডি, মিরপুর, তেজগাঁও রেলবস্তি, উত্তরা, গাবতলী, কাওরানবাজার রেলবস্তি, রূপনগর, শাহআলী, বংশাল, চকবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রায় পাঁচ শতাধিক স্পটে প্রকাশ্যে চলে মাদক কেনাবেচা। আর এসব স্পট নিয়ন্ত্রণ করছে চিহ্নিত গডফাদাররা। তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

ঢাকার মাদক সাম্রাজ্যের ৩৭ গডফাদার : মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ গডফাদার ইশতিয়াক ওরফে কামরুল হাসান। দীর্ঘদিন ধরে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে জেনেভা ক্যাম্পসহ আশপাশের শতাধিক মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণে রেখেছে সে। মাদকের কারবার করে এক সময়ের টোকাই ইশতিয়াক এখন শত কোটি টাকার মালিক।

জেনেভা ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসার আরেক গডফাদারের নাম নাদিম ওরফে পঁচিশ। প্রতিদিন জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় মাদক বিক্রি করে কয়েক লাখ টাকা হাতিয়ে নেয় সে। শীর্ষ এই মাদক কারবারির বিরুদ্ধে থানায় একাধিক মামলা থাকলেও গ্রেফতার হয়ে জেল খেটেছে মাত্র ১২ দিন। দাপুটে মাদক কারবারি নাদিমের ওপর ছায়া হয়ে থাকেন স্থানীয় নেতা, প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিরা। উত্তরা এলাকায় মাদক সাম্রাজ্যের একচ্ছত্র আধিপত্য ফজলুল করিমের। পিরোজপুর থেকে ঢাকায় এসে শুরু করে মাদক ব্যবসা।

মাদক সাম্রাজ্যের উত্তরা থেকে আবদুল্লাহপুরের নিয়ন্ত্রণ তার হাতে। র‌্যাব-পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে মাদক বিক্রির টাকায় বিলাসী জীবনযাপন করছে সে। গডফাদার রিয়াদ উল্লাহ, সাব্বির হোসেন, এনায়েত করিম, শরিফ ভুইয়া, ইতি বেগম, আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু, নার্গিস ওরফে মামির নিয়ন্ত্রণে বাড্ডা, ভাটারা, গুলশান ও বনানী এলাকার মাদক ব্যবসা।

মুন্সীগঞ্জের রিয়াদ উল্লাহর নিয়ন্ত্রণে চলে বাড্ডা এলাকার ১০-১২টি স্পট। কক্সবাজারের সাব্বির হোসেনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ভাটারার ইয়াবা সিন্ডিকেট। পুলিশ-র‌্যাবের তালিকায় রয়েছে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী সাব্বিরের নাম। এছাড়াও তালিকাভুক্ত ঢাকার ৩৭ গডফাদারের মধ্যে রয়েছে- উত্তরায় গোলাম সামদানি, বংশালে নাসির উদ্দিন, মুগদায় পারভীন, শফিকুল ইসলাম মলাই, রাজু আহমেদ ও আলম হোসেন, কমলাপুরে লিটন, চকবাজারে ওমর ফারুক, লালমিয়া, কলাবাগানে নাজমুস সাকিব ভুইয়া, শামিম, কামরাঙ্গীরচরে খুরশিদা ওরফে খুশি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও শাহবাগে শহিদুজ্জামান, চাঁনখারপুলে পারভিন আক্তার, আসমা আহমেদ ও নারায়ণগঞ্জের ছেলে কামাল হোসেন, যাত্রাবাড়ীতে মোবারক, গেণ্ডারিয়া এলাকায় রহিম ও মিরপুর চলন্তিকা বস্তি এলাকায় নজরুল। তালিকাভুক্ত গডফাদারদের প্রত্যেকের ইয়াবা ব্যবসা রয়েছে। আবার অনেকের হেরোইন, গাঁজা, ফেনসিডিলসহ একাধিক মাদকের কারবার রয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে পুলিশ-র‌্যাবের চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে গত সাত দিনে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ২৭ জন নিহত হয়েছে। সবশেষ রোববার রাতে দেশের সাত জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ৯ জন। পুলিশ ও র‌্যাব বলছে, নিহতরা মাদকের সঙ্গে জড়িত। তাদের বিরুদ্ধে মাদক আইনে মামলাও রয়েছে।

এদিকে মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশ-র‌্যাবের যুদ্ধ ঘোষণায় শীর্ষ অনেক মাদক ব্যবসায়ী আত্মগোপনে চলে গেছে। রোববার রাজধানীতে র‌্যাবের মাদকবিরোধী ‘চলো যাই যুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধে’ শীর্ষক দেশব্যাপী ক্যাম্পেইন উদ্বোধন অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, মাদক দেশের মেধাবী ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্সের কথা ঘোষণা করেছেন। প্রধনমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী মাদকের বিরুদ্ধে অভিযান চলছে।

ওই অনুষ্ঠানে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে জাতিগত যুদ্ধ করতে হবে। ’৭১ সালের পর জাতিগতভাবে ঐক্যবদ্ধ অনেক বড় বিজয় ছিনিয়ে এনেছি। এবারও আশা করি এর একটা ভালো ফলাফল পাব, মানুষ বিজয়ী হবে। মাদকের বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অত্যন্ত স্পষ্ট উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদকের খুচরা বিক্রেতা থেকে ডিলার সে যে-ই হোক, তাকে এ পেশা ছাড়তে হবে। হু এভার, হোয়াট এভার, হয়ার এভার- কেউ আমাদের অপারেশনের বাইরে নয়। মাদকের শিকড়-বাঁকড়সহ তুলে নিয়ে আসব।

এর আগে ১৪ মে এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের পর তারা মাঠে নেমেছেন। মাদকের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছেন।

র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে মাদক ব্যবসা ও সেবনের অপরাধে দুই হাজার জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ঘটনাপ্রবাহ : মাদকবিরোধী অভিযান ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.