ঢামেক হাসপাতাল

ঘুষি দিয়ে এক্স-রে মেশিন নষ্ট করেন টেকনোলজিস্ট

প্রকাশ : ২২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রাশেদ রাব্বি

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক্স-রে মেশিনটি নষ্ট এক মাসেরও বেশি সময়। মেশিনটি যান্ত্রিক ত্র“টির কারণে নষ্ট হয়নি। মেশিনটির টাচ স্ক্রিন প্যানেলের ওপর ঘুষি মেরে সেটিকে নষ্ট করা হয়েছে। আর এ কাজটি করেছেন কর্তব্যরত একজন টেকনোলজিস্ট (রেডিওলজি)।

বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হয়। প্রায় এক মাস তদন্ত শেষে যে প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে, সেখানে নির্দিষ্ট করে কাউকে অভিযুক্ত করা হয়নি। ওই রাতে কর্তব্যরতদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়েছে। আর ঘুষির কারণে মেশিনটির যে ক্ষতি হয়েছে, তা ঠিক করতে প্রায় ৬ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০ এপ্রিল রাতে ঢামেক হাসপাতালের জরুরি বিভাগের এক্স-রে বিভাগে মো. সেলিম রেজা টেকনোলজিস্ট (রেডিওলজি) হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ওই দিন রোগীর চাপ তুলনামূলক বেশি থাকায় তিনি বিরক্ত হন এবং এক পর্যায়ে এক্স-রে মেশিনের টাচ স্ক্রিন প্যানেলে ঘুষি দিয়ে তা ফাটিয়ে ফেলেন।

তার ঘুষিতে মেশিনটি তখনই অকেজো হয়ে পড়ে। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে তিনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এক্স-রে মেশিন নষ্ট হওয়ার বিষয়টি জানলেও কীভাবে মেশিনটি নষ্ট হয়েছে তা বলেননি।

এই পরিপ্রেক্ষিতে ২২ এপ্রিল হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. খন্দকার সাজ্জাদ হোসেনের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়। কমিটির সদস্য সচিব হিসেবে ছিলেন নিউরো রেডিওলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. খলিলুর রহমান। অন্য সদস্যরা হলেন- সিনিয়র স্টোর অফিসার ডা. মো. ফেরদৌস আজাদ, জরুরি বিভাগের আরএস ডা. মো. আলাউদ্দিন।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, পরিচালক তদন্ত কমিটিকে কী অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে, কীভাবে এ ঘটনা ঘটেছে তার কারণ উদঘাটনসহ দায়ীদের শনাক্তের নির্দেশ দেয়। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ করতেও বলা হয়। কিন্তু তদন্ত কমিটি এ ঘটনায় নির্দিষ্ট কাউকে দায়ী করতে পারেনি। এমনকি ৭ কর্মদিবসে তদন্ত রিপোর্ট জমা দেয়ার কথা থাকলেও সেটি দিতে প্রায় এক মাস সময় নিয়েছে।

তদন্ত কমিটির সভাপতি ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. খন্দকার সাজ্জাদ হোসেন সোমবার যুগান্তরকে বলেন, দু’একদিন আগেই তদন্ত রিপোর্ট দেয়া হয়েছে। তদন্তে এক্স-রে মেশিন নষ্ট করার ঘটনায় কাউকে নির্দিষ্ট করে দায়ী করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু ওই দিন এক্স-রে রুমে কর্মরত টেকনোলজিস্ট মো. সেলিম রেজা ও একজন এমএলএসএসকে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের শাস্তির সুপারিশ করা হয়েছে।

হাসপাতালের একটি সূত্র জানিয়েছে, মেশিনটি নষ্ট হওয়ার পর এটি কী ধরনের সমস্যায় পড়েছে জানতে চাওয়া হয় সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান মেডিটেলের কাছে। তারা মেশিনটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করে উল্লেখ করে ‘টাচ প্যানেল ইজ ব্রকেন হুইচ ইজ এ ফিজিক্যাল ড্যামেজ।’ সেখানে বলা হয়, ভাঙা টাচ প্যানেলটি পরিবর্তন করলে মেশিনটি কার্যকর করা সম্ভব। মেশিনটি ঠিক করতে প্রায় ৬ লাখ টাকা প্রয়োজন বলেও মেডিটেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছে।

হাসপাতালের জরুরি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, এ বিভাগে আসা রোগীদের মধ্যে প্রায় অর্ধেকের এক্স-রের প্রয়োজন পড়ে। দুপুর ২টার পর প্রতিদিন গড়ে জরুরি বিভাগে ২০০ থেকে ২৫০ জন রোগীর এক্স-রে করা প্রয়োজন হয়। ওই দিন রাত ৮টার পরে রোগীর চাপ একটু বেশি ছিল। সেই চাপ সামলাতে না পেরেই কর্তব্যরত টেকনোলজিস্ট এ কাজটি করেছে। তবে একজন সরকারি কর্মচারী হিসেবে, সরকারি সম্পদ নষ্ট করে তিনি অপরাধ করেছেন। তাছাড়া এক্স-রে মেশিনটি নষ্ট হওয়ার কারণে জরুরি বিভাগে আসা মুমূর্ষু রোগীদের অনেকটা পথ ঘুরে নতুন ভবনে গিয়ে এক্স-রে করাতে হচ্ছে।

জরুরি বিভাগে আসা বেশিরভাগ রোগীরই শারীরিক অবস্থা অনেক খারাপ থাকে। অনেকেই হাঁটা-চলায় অক্ষম হয়ে পড়েন। যাতে রোগী ও স্বজনদের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। নতুন ভবনে এক্স-রে করাতে প্রায় ৪০ থেকে ৫০ মিনিট সময় বেশি লাগছে। এতে বিভিন্ন ইনজুরি নিয়ে আসা রোগীর চিকিৎসা শুরু করতে বিলম্ব হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের কাছে ঘুষি মেরে এক্স রে মেশিন নষ্টের প্রসঙ্গে জানতে চাইলে, রোববার এ প্রতিবেদকের সামনে তিনি ঢামেক হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিনকে ফোন করেন। ফোনালাপ শেষে ডা. আজাদ বলেন, হাসপাতাল পরিচালক বিষয়টি আমার কাছে স্বীকার করেছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন।

অভিযুক্ত টেকনোলজিস্ট সেলিম রেজা সোমবার যুগান্তরকে বলেন, কাজ করতে করতে মেশিনটি হ্যাং হয়ে যেত, তখন বারবার অন-অফ করতে হয়। এমনকি টাচ স্ক্রিনে কাজ না করায় জোরে জোরে চাপ দেয়া লেগেছে। এমনটি করতে গিয়েই মেশিনটির স্ক্রিন ফেটে যায়। ঘুষি দিয়ে ভাঙার মতো ঘটনা ঘটেনি।