চার ভয়ংকর কিলারের লোমহর্ষক বর্ণনা

যাত্রী সেজে চালককে খুন করে গাড়ি ছিনতাই ওদের পেশা

চুরির মামলা তদন্ত করতে গিয়ে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য

  আহমদুল হাসান আসিক ২২ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খুন
প্রতীকি ছবি

বান্ধবী নিয়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে যাওয়ার জন্য ২০ হাজার টাকায় নোহা গাড়ি ভাড়া করেছিল দুই গার্মেন্টকর্মী। নির্ধারিত সময়ে দুই বান্ধবীকে নিয়ে গাজীপুরের টঙ্গী বাসস্ট্যান্ড থেকে ভাড়া করা গাড়িতে ওঠে তারা। গাড়িটি কক্সবাজারের চকরিয়া বাসস্ট্যান্ড পৌঁছলে তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় আরও দু’জন।

কিছু দূর যাওয়ার পর তাদের সঙ্গে থাকা দুই বান্ধবী অসুস্থ হয়ে যাওয়ার নাটক করে। সেখানেই এক বন্ধুর আত্মীয়ের বাসায় দুই বান্ধবীকে রেখে চারজন সমুদ্রসৈকতের উদ্দেশে রওনা দেয়। কিছু দূর যাওয়ার পর নির্জন স্থানে চালককে গাড়ি থামাতে বলে তারা।

গাড়ি থামাতেই পেছন থেকে চালককে গামছা দিয়ে ফাঁস দেয় চারজনের একজন। তারপর সিটের ওপর তুলে গলাটিপে চালককে হত্যা করে ওরা। মৃত্যু নিশ্চিত করতে পেটে চালানো হয় ছুরি। এরপর নির্জন স্থানে লাশ ফেলে গাড়ি নিয়ে সটকে পড়ে চারজন।

নির্মম এ ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯ ফেব্র“য়ারি রাতে। হত্যার শিকার হতভাগ্য ওই চালকের নাম ফিরোজ কবীর (৩১)। আর ভয়ংকর চার খুনি হল- সাদেক (২৪), সুজন মিয়া (১৮), মফিজুর রহমান (২১) ও নবী হোসেন ওরফে পুতিয়া (২৪)। ঘটনার প্রায় তিন মাস পর ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে। ভয়ংকর চার কিলার এ ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছে। পুরো ঘটনাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত।

ডিবি বলছে, চারজনই ভয়ংকর কিলার। তারা যাত্রী সেজে চালককে হত্যা করে গাড়ি ছিনতাই করে। এ স্টাইলে তারা একাধিক গাড়ি ছিনতাই করেছে বলে কর্মকর্তাদের ধারণা। তবে তারা অন্য কোনো ঘটনার কথা সরাসরি স্বীকার করছে না। ডিবির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গাড়ি ছিনতাইকালে এ ধরনের হত্যাকাণ্ড আরও ঘটিয়ে থাকতে পারে তারা। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।

ডিবির পশ্চিম বিভাগের সিনিয়র সহকারী কমিশনার হাফিজ আল আসাদ যুগান্তরকে বলেন, মোহাম্মদপুর থানার একটি গাড়ি চুরি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে সাদেক ও সুজন নামে দুই গার্মেন্টকর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদেই বেরিয়ে আসে ফিরোজ হত্যার রহস্য। সর্বশেষ গ্রেফতার করা হয় মফিজ ও পুতিয়াকে। তারা চারজনই আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে।

ডিবি কর্মকর্তারা জানান, সুজন পেশাদার চোর। এক বছর আগে একটি চুরির মামলায় বান্দরবান জেলা কারাগারে বন্দি ছিল সে। সেখানে তার সঙ্গে পরিচয় হয় পেশাদার মাদক ব্যবসায়ী মফিজের। মফিজ কয়েকদিন পর জামিন পায়। তারপর সে সুজনকেও ছাড়িয়ে নেয়। সুজন কয়েক মাস বান্দরবানেই অবস্থান করে। সেখানে পুতিয়ার সঙ্গে সুজনের পরিচয় করিয়ে দেয় মফিজ।

ছয় মাস আগে সুজন গ্রামের বাড়ি গাজীপুরে ফিরে এসে একটি গার্মেন্ট কারখানায় চাকরি নেয়। সেখানে তার সঙ্গে পরিচয় হয় সাদেকের। সুজন তাকে দলে নেয়। তারপর এ চারজন মিলে গড়ে তোলে একটি গাড়ি ছিনতাই চক্র। পরিকল্পনা অনুযায়ী সুজন ও সাদেক ঢাকা থেকে গাড়ি ভাড়া করে কক্সবাজার নিয়ে যায়। সেখানে গিয়ে তারা মিলিত হয় মফিজ এবং পুতিয়ার সঙ্গে।

ফিরোজ হত্যার রহস্য উদ্ঘাটনের বিষয়ে ডিবির এক কর্মকর্তা জানান, ফিরোজ যে গাড়িটি চালাতেন, সেটি মোহাম্মদপুরের একটি রেন্ট-এ কারের। ঘটনার ২০ দিন পর তারা মোহাম্মদপুর থানায় একটি গাড়ি চুরির মামলা করে।

প্রযুক্তিগত তদন্তে নেমে ৩০ এপ্রিল গাজীপুরের হোতাপাড়া থেকে সাদেক এবং ৭ মে কুমিল্লা ইপিজেড থেকে সুজনকে গ্রেফতার করা হয়। তারা প্রথমে হত্যার কথা স্বীকার করেনি। গাড়ির চালকের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে একপর্যায়ে তারা হত্যার কথা স্বীকার করে। তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। সর্বশেষ শনিবার মফিজকে কেরানীগঞ্জ এবং পুতিয়াকে চকরিয়া থেকে গ্রেফতার করা হয়।

ডিবি জানায়, ঘটনার দু’দিন পর একুশে ফেব্র“য়ারি চকরিয়া থানা পুলিশ ফিরোজের লাশ উদ্ধার করে। পচন ধরায় লাশ পরিবার শনাক্ত করতে পারেনি। ফিরোজের পরিবার লাশ শনাক্ত করতে না পেরে চকরিয়া থেকে ফিরে আসে। পরে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের মাধ্যমে চট্টগ্রামে লাশ দাফন করা হয়। গাড়ি চোরদের স্বীকারোক্তির পর নিশ্চিত হওয়া গেছে, ২১ ফেব্র“য়ারি চকরিয়ার হাসেরদীঘি এলাকা থেকে উদ্ধার হওয়া লাশটি ফিরোজের।

আসামিরা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বলেছে, পুতিয়া পেছন থেকে ফিরোজের গলায় গামছা প্যাঁচিয়ে ফাঁস দেয়। সুজন, মফিজ ও সাদেক গলা চেপে ধরে। মৃত্যু নিশ্চিত করতে সাদেক পেটে ছুরিকাঘাত করে। তারপর মফিজ গাড়িটি চালিয়ে চকরিয়া বাসস্ট্যান্ডে যায়। গাড়িটি মফিজ ও পুতিয়া নিয়ে যায়। সুজন এবং সাদেক দুই বান্ধবীকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে ট্রেনে করে ঢাকায় ফিরে আসে। তাদের সঙ্গে থাকা দুই বান্ধবীকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
bestelectronics

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.