নীলফামারীতে ট্রেনের ধাক্কায় ৪ অটো যাত্রী নিহত
jugantor
অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং
নীলফামারীতে ট্রেনের ধাক্কায় ৪ অটো যাত্রী নিহত

  নীলফামারী প্রতিনিধি  

২৭ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডের একটি শিল্প-প্রতিষ্ঠানে কাজে যাওয়া হলো না সেফালী বেগম, সাহেরা বেগম, রোমানা বেগম ও মিনা পারভীনের। তারা লাশ হয়ে ফিরলেন নিজ বাড়িতে।

এ চার নারী শ্রমিকের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। আহত অপর চারজনের মধ্যে দুইজন নীলফামারী জেনারেল হাসপাতাল এবং দুইজন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

খুলনা থেকে ছেড়ে আসা সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনটি বুধবার সকাল ৭টায় চিলাহাটীর দিকে যাচ্ছিল। এ সময় চারদিক ছিল ঘনকুয়াশায় আচ্ছন্ন।

ঠিক এই সময় অটোবাইকটি আটজন যাত্রী নিয়ে নীলফামারী দারোয়ানি রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন একটি অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং পার হচ্ছিল।

এতে ট্রেনের ধাক্কায় অটোবাইকটি বেশ কিছুদূর হিঁচড়ে যাওয়ার পর যাত্রী নিয়ে রেললাইন থেকে প্রায় ২০ ফুট দূরে ছিটকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান নারী শ্রমিক সেফালী বেগম। সেফালী সোনারায় ধনীপাড়ার আশরাফ আলীর স্ত্রী। একই এলাকার মোশারফ আলীর স্ত্রী রোমানা বেগম, আলতাফ হোসেনের স্ত্রী মিনা পারভীন ও বেলাল হোসেনের স্ত্রী সাহেরা বেগমও মারা যান।

নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. কাজী আব্দুল মোমিন জানান, হাসপাতালে আসা সাতজন রোগীর মধ্যে সাহেরা বেগম, রোমানা বেগম মারা যান। ভর্তি পাঁচজনের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

তাদের মধ্যে মিনা পারভীন মারা যান। নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন সোনারায় এলাকার ইয়াকুব আলীর ছেলে অহিদুল ইসলাম, নজরুল ইসলামের স্ত্রী রওশন আরা এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন সায়েদ আলীর স্ত্রী কুলসুমা বেগম ও গোলাম মোস্তফার স্ত্রী নাসরীন আক্তার।

নীলফামারী ফায়ার স্টেশন ইনচার্জ মো. নিয়ারাজ হোসেন বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুর রহমান বিশ্বাস বলেন, এ দুর্ঘটনার ব্যাপারে সৈয়দপুর রেলওয়ের পিডব্লিউ সুলতান আহমেদ বাদী হয়ে রেল থানায় একটি অপমৃত্য মামলা করেছেন। নিহতদের স্বজনদের আবেদনের ভিত্তিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

নীলফামারীর সোনারায় ধনীপাড়ার দুর্ঘটনায় নিহত সেফালী বেগমের স্বামী আশরাফ আলী বলেন, আমি গরিব পরিবারের সন্তান। আমার স্ত্রী উত্তরা ইপিজেড-এর একটি কোম্পানিতে চাকরি করে যা পায়, তা দিয়ে চলে সংসার। সে মারা যাওয়ায় আমার পরিবারটি পথে বসল।

একই এলাকার মৃত মিনা পারভীনের স্বামী আলতাফ হোসেন বলেন, আমাদের সংসারে একটিমাত্র পুত্রসন্তান। তার বয়স মাত্র সাড়ে তিন বছর। বউ তো দুর্ঘটনায় মারা গেল, আমার সংসারের আয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে গেল। এই বাচ্চাকে নিয়ে আমি কী করব। অবুঝ ছেলে সারাক্ষণ মা মা করে কান্নাকাটি করছে।

মৃত সাহেরা বেগমের স্বামী বেলাল হোসেন বলেন, দারোয়ানি স্টেশন সংলগ্ন এই লেভেল ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন শত শত যানবাহন ও মানুষ পারাপার হয়। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায় ইপিজেড-এ নারী শ্রমিক নিয়ে যাতায়াতকারী শত শত অটোবাইক চলাচল করে। কোনোদিন কোন দুর্ঘটনা হয়নি। আজকের এই দুর্ঘটনা আমাদের সুখের সংসারকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিল। আমরা এ লেভেলক্রসিংয়ে গেট ও গেটম্যান দেওয়ার জন্য অনেক দাবি জানিয়েছি। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ কোনো কথাই শুনেননি। তাদের অবহেলার জন্য আজ অকালে মারা গেল তারা।

এর আগে গত বছরের আট ডিসেম্বর পার্শ্ববর্তী কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের বউবাজারে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে একই পরিবারের তিন শিশুসহ চারজন নিহত হয়। সৈয়দপুর চিলাহাটী ৫২ কিলোমিটার রেলপথে ৩৬টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে তিনটি অবৈধ ও ২১টি অরক্ষিত। এসব রেলপথে গেট ও গেটম্যান না থাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।

অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং

নীলফামারীতে ট্রেনের ধাক্কায় ৪ অটো যাত্রী নিহত

 নীলফামারী প্রতিনিধি 
২৭ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

নীলফামারীর উত্তরা ইপিজেডের একটি শিল্প-প্রতিষ্ঠানে কাজে যাওয়া হলো না সেফালী বেগম, সাহেরা বেগম, রোমানা বেগম ও মিনা পারভীনের। তারা লাশ হয়ে ফিরলেন নিজ বাড়িতে।

এ চার নারী শ্রমিকের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। আহত অপর চারজনের মধ্যে দুইজন নীলফামারী জেনারেল হাসপাতাল এবং দুইজন রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

খুলনা থেকে ছেড়ে আসা সীমান্ত এক্সপ্রেস ট্রেনটি বুধবার সকাল ৭টায় চিলাহাটীর দিকে যাচ্ছিল। এ সময় চারদিক ছিল ঘনকুয়াশায় আচ্ছন্ন।

ঠিক এই সময় অটোবাইকটি আটজন যাত্রী নিয়ে নীলফামারী দারোয়ানি রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন একটি অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং পার হচ্ছিল।

এতে ট্রেনের ধাক্কায় অটোবাইকটি বেশ কিছুদূর হিঁচড়ে যাওয়ার পর যাত্রী নিয়ে রেললাইন থেকে প্রায় ২০ ফুট দূরে ছিটকে পড়ে। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান নারী শ্রমিক সেফালী বেগম। সেফালী সোনারায় ধনীপাড়ার আশরাফ আলীর স্ত্রী। একই এলাকার মোশারফ আলীর স্ত্রী রোমানা বেগম, আলতাফ হোসেনের স্ত্রী মিনা পারভীন ও বেলাল হোসেনের স্ত্রী সাহেরা বেগমও মারা যান।

নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. কাজী আব্দুল মোমিন জানান, হাসপাতালে আসা সাতজন রোগীর মধ্যে সাহেরা বেগম, রোমানা বেগম মারা যান। ভর্তি পাঁচজনের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তিনজনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়।

তাদের মধ্যে মিনা পারভীন মারা যান। নীলফামারী জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন সোনারায় এলাকার ইয়াকুব আলীর ছেলে অহিদুল ইসলাম, নজরুল ইসলামের স্ত্রী রওশন আরা এবং রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন সায়েদ আলীর স্ত্রী কুলসুমা বেগম ও গোলাম মোস্তফার স্ত্রী নাসরীন আক্তার।

নীলফামারী ফায়ার স্টেশন ইনচার্জ মো. নিয়ারাজ হোসেন বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে স্থানীয়দের সহযোগিতায় আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

নীলফামারীর সৈয়দপুর রেলওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুর রহমান বিশ্বাস বলেন, এ দুর্ঘটনার ব্যাপারে সৈয়দপুর রেলওয়ের পিডব্লিউ সুলতান আহমেদ বাদী হয়ে রেল থানায় একটি অপমৃত্য মামলা করেছেন। নিহতদের স্বজনদের আবেদনের ভিত্তিতে ময়নাতদন্ত ছাড়াই তাদের লাশ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

নীলফামারীর সোনারায় ধনীপাড়ার দুর্ঘটনায় নিহত সেফালী বেগমের স্বামী আশরাফ আলী বলেন, আমি গরিব পরিবারের সন্তান। আমার স্ত্রী উত্তরা ইপিজেড-এর একটি কোম্পানিতে চাকরি করে যা পায়, তা দিয়ে চলে সংসার। সে মারা যাওয়ায় আমার পরিবারটি পথে বসল।

একই এলাকার মৃত মিনা পারভীনের স্বামী আলতাফ হোসেন বলেন, আমাদের সংসারে একটিমাত্র পুত্রসন্তান। তার বয়স মাত্র সাড়ে তিন বছর। বউ তো দুর্ঘটনায় মারা গেল, আমার সংসারের আয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে গেল। এই বাচ্চাকে নিয়ে আমি কী করব। অবুঝ ছেলে সারাক্ষণ মা মা করে কান্নাকাটি করছে।

মৃত সাহেরা বেগমের স্বামী বেলাল হোসেন বলেন, দারোয়ানি স্টেশন সংলগ্ন এই লেভেল ক্রসিং দিয়ে প্রতিদিন শত শত যানবাহন ও মানুষ পারাপার হয়। বিশেষ করে সকাল ও সন্ধ্যায় ইপিজেড-এ নারী শ্রমিক নিয়ে যাতায়াতকারী শত শত অটোবাইক চলাচল করে। কোনোদিন কোন দুর্ঘটনা হয়নি। আজকের এই দুর্ঘটনা আমাদের সুখের সংসারকে ভেঙে টুকরো টুকরো করে দিল। আমরা এ লেভেলক্রসিংয়ে গেট ও গেটম্যান দেওয়ার জন্য অনেক দাবি জানিয়েছি। কিন্তু রেল কর্তৃপক্ষ কোনো কথাই শুনেননি। তাদের অবহেলার জন্য আজ অকালে মারা গেল তারা।

এর আগে গত বছরের আট ডিসেম্বর পার্শ্ববর্তী কুন্দুপুকুর ইউনিয়নের বউবাজারে অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ে একই পরিবারের তিন শিশুসহ চারজন নিহত হয়। সৈয়দপুর চিলাহাটী ৫২ কিলোমিটার রেলপথে ৩৬টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে তিনটি অবৈধ ও ২১টি অরক্ষিত। এসব রেলপথে গেট ও গেটম্যান না থাকায় প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন