ঢাবির গেস্টরুমে শিক্ষার্থীকে নির্যাতন ছাত্রলীগের
jugantor
ঢাবির গেস্টরুমে শিক্ষার্থীকে নির্যাতন ছাত্রলীগের

  ঢাবি প্রতিনিধি  

২৮ জানুয়ারি ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের গেস্টরুমে বুধবার রাতে ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মীর হাতে এক ছাত্র নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এক পর্যায়ে ওই শিক্ষার্থী অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে হাসপাতালে নিতে হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদ ও ঢাবিতে ‘গেস্টরুম কালচার’ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

নির্যাতনের শিকার ওই শিক্ষার্থীর নাম মো. আকতারুল ইসলাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের (২০২০-২১ সেশন) শিক্ষার্থী। বিজয় একাত্তর হলের মেঘনা ৩০০২(ক) নম্বর কক্ষে (গণরুম) থাকেন। বৃহস্পতিবার তিনি হল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। হল কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

অভিযোগে বলা হয়, আকতারুলের বাবা কয়েকদিন আগে হার্ট অ্যাটাক করেছেন, এখনো তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, তাকে দেখাশোনা করছেন দিনমজুর বড় ভাই। এ নিয়ে মানসিকভাবে তিনি বিপর্যস্ত ছিলেন। এছাড়া সকাল থেকে তিনি শারীরিকভাবেও অসুস্থ ছিলেন। এ কারণে বুধবার রাতে যথাসময়ে (রাত ১০টা) তিনি গেস্টরুমে যেতে পারেননি। ১০ মিনিট পর ছাত্রলীগের কয়েকজন তাকে গেস্টরুমে ডেকে নেন। তার কাছে জানতে চান ঠিক সময়ে আসেননি কেন, কেন ডেকে আনতে হল। জবাব না শুনেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেরির ‘অপরাধে’ শাস্তি হিসাবে বৈদ্যুতিক বাল্বের দিকে ১ ঘণ্টা তাকিয়ে থাকার নির্দেশ দেন। কারণ জানালেও তাকে তাকিয়ে থাকতে বলা হয়। আনুমানিক ২০ মিনিট তাকিয়ে থাকার পর অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত নিজ কক্ষে চলে আসেন। সেখানে পৌঁছেই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরে কক্ষের অন্যদের শুশ্রূষায় তার জ্ঞান ফিরলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ সময় আকতারুলের গায়ে শীতের পোশাক ছিল না। এমনকি তার ভাইয়ের গায়েও ছিল না শীতের পোশাক। হাসপাতালে ইসিজি করানোর পর প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে হলে ফেরত আনা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন-২০১৯-২০ সেশনের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কামরুজ্জামান রাজু, মনোবিজ্ঞান বিভাগের শুভ, ইতিহাস বিভাগের হৃদয় আহমেদ কাজল, সমাজকল্যাণ বিভাগের ইয়ামিন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাইফুল ইসলাম, লোক প্রশাসন বিভাগের সাইফুল ইসলাম রোহান। তারা সবাই হল শাখা ছাত্রলীগে পদপ্রত্যাশী আবু ইউনুস ও রবিউল ইসলাম রানার অনুসারী। তারা দুজনেই ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের অনুসারী। এ বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার সারা দিনে চেষ্টা করেও অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুল বাছির যুগান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে অধ্যাপক শাহ মিরানকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে।

ঢাবিতে গেস্টরুম কালচার বন্ধের দাবি : আকতারুল ইসলামকে নির্যাতনের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেছে একই বর্ষের শিক্ষার্থীরা। তারা মানববন্ধন থেকে জড়িতদের বিচার, ছাত্রত্ব বাতিল এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গেস্টরুম কালচার বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী রিসাত রশিদ বলেন, ভর্তি হওয়ার আগে আমরা ভার্সিটি নিয়ে যা শুনেছি এখানে দেখি ঠিক তার উলটো। কতিপয় গোষ্ঠী আমাদের শকুনের মতো খাবে, তা আমরা বুঝিনি। আমরা নিম্নবিত্ত, আমাদের অনেক টাকা নেই যে বাইরে মেসে থাকব। এর সুযোগ নিয়ে আমাদের নির্যাতন করা হবে, লাঞ্ছিত করা হবে-এটা অন্যায়। তিনি আরও বলেন, আমরা গেস্টরুমের নামে এই নির্যাতনের সমাপ্তি চাই।

দর্শন বিভাগের নাফিসা ইসলাম সাকাফি বলেন, আমরা সবাই ম্যানার (আচরণ) শিখেই এখানে এসেছি। হলগুলোতে ম্যানার শিখানোর নামে আমাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। আমরা চাই এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গেস্টরুম কালচারটা পুরোপুরি বন্ধ হোক এবং আকতারকে যারা নির্যাতন করেছে তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করা হোক।

ছাত্রলীগ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে-ছাত্রদল : আকতারুলকে নির্যাতনের নিন্দা জানিয়েছে হল শাখা ছাত্রদল। বৃহস্পতিবার বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের সভাপতি সোহেল রানা ও সাধারণ সম্পাদক বিএম কাওসার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্যাতনকারীরা সবাই হল ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও সবগুলো হলে ছাত্রলীগ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। হলগুলোতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য নিয়মিত পরিচালিত সন্ত্রাসী কার্যক্রমেরই অংশ বুধবারের এ নির্যাতন। নির্যাতনকারী ও তাদের মদদদাতা সবাইকে শাস্তির আওতায় এনে ক্যাম্পাস ও হলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানাই।

এ ঘটনায় আরেক বিজ্ঞপ্তিতে নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল)। কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি গৌতম চন্দ্র শীল ও সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমানের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুক্তচিন্তা চর্চার প্রাণকেন্দ্রে এ ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও হৃদয়বিদারক। বিসিএল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছে, এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।

ঢাবির গেস্টরুমে শিক্ষার্থীকে নির্যাতন ছাত্রলীগের

 ঢাবি প্রতিনিধি 
২৮ জানুয়ারি ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হলের গেস্টরুমে বুধবার রাতে ছাত্রলীগের কয়েকজন কর্মীর হাতে এক ছাত্র নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এক পর্যায়ে ওই শিক্ষার্থী অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে হাসপাতালে নিতে হয়। এ ঘটনার প্রতিবাদ ও ঢাবিতে ‘গেস্টরুম কালচার’ বন্ধের দাবি জানিয়েছেন বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন ও সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

নির্যাতনের শিকার ওই শিক্ষার্থীর নাম মো. আকতারুল ইসলাম। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রথম বর্ষের (২০২০-২১ সেশন) শিক্ষার্থী। বিজয় একাত্তর হলের মেঘনা ৩০০২(ক) নম্বর কক্ষে (গণরুম) থাকেন। বৃহস্পতিবার তিনি হল কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানান। হল কর্তৃপক্ষ এ নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।

অভিযোগে বলা হয়, আকতারুলের বাবা কয়েকদিন আগে হার্ট অ্যাটাক করেছেন, এখনো তিনি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন, তাকে দেখাশোনা করছেন দিনমজুর বড় ভাই। এ নিয়ে মানসিকভাবে তিনি বিপর্যস্ত ছিলেন। এছাড়া সকাল থেকে তিনি শারীরিকভাবেও অসুস্থ ছিলেন। এ কারণে বুধবার রাতে যথাসময়ে (রাত ১০টা) তিনি গেস্টরুমে যেতে পারেননি। ১০ মিনিট পর ছাত্রলীগের কয়েকজন তাকে গেস্টরুমে ডেকে নেন। তার কাছে জানতে চান ঠিক সময়ে আসেননি কেন, কেন ডেকে আনতে হল। জবাব না শুনেই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা দেরির ‘অপরাধে’ শাস্তি হিসাবে বৈদ্যুতিক বাল্বের দিকে ১ ঘণ্টা তাকিয়ে থাকার নির্দেশ দেন। কারণ জানালেও তাকে তাকিয়ে থাকতে বলা হয়। আনুমানিক ২০ মিনিট তাকিয়ে থাকার পর অসুস্থ বোধ করলে দ্রুত নিজ কক্ষে চলে আসেন। সেখানে পৌঁছেই তিনি অজ্ঞান হয়ে পড়েন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, পরে কক্ষের অন্যদের শুশ্রূষায় তার জ্ঞান ফিরলে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। এ সময় আকতারুলের গায়ে শীতের পোশাক ছিল না। এমনকি তার ভাইয়ের গায়েও ছিল না শীতের পোশাক। হাসপাতালে ইসিজি করানোর পর প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাকে হলে ফেরত আনা হয়। এ ঘটনায় অভিযুক্তদের মধ্যে রয়েছেন-২০১৯-২০ সেশনের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী কামরুজ্জামান রাজু, মনোবিজ্ঞান বিভাগের শুভ, ইতিহাস বিভাগের হৃদয় আহমেদ কাজল, সমাজকল্যাণ বিভাগের ইয়ামিন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাইফুল ইসলাম, লোক প্রশাসন বিভাগের সাইফুল ইসলাম রোহান। তারা সবাই হল শাখা ছাত্রলীগে পদপ্রত্যাশী আবু ইউনুস ও রবিউল ইসলাম রানার অনুসারী। তারা দুজনেই ঢাবি শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদ্দাম হোসেনের অনুসারী। এ বিষয়ে জানতে বৃহস্পতিবার সারা দিনে চেষ্টা করেও অভিযুক্তদের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি।

হল প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক আবদুল বাছির যুগান্তরকে বলেন, এ বিষয়ে অধ্যাপক শাহ মিরানকে প্রধান করে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হবে।

ঢাবিতে গেস্টরুম কালচার বন্ধের দাবি : আকতারুল ইসলামকে নির্যাতনের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার বিকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে মানববন্ধন করেছে একই বর্ষের শিক্ষার্থীরা। তারা মানববন্ধন থেকে জড়িতদের বিচার, ছাত্রত্ব বাতিল এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গেস্টরুম কালচার বন্ধের দাবি জানিয়েছেন।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষার্থী রিসাত রশিদ বলেন, ভর্তি হওয়ার আগে আমরা ভার্সিটি নিয়ে যা শুনেছি এখানে দেখি ঠিক তার উলটো। কতিপয় গোষ্ঠী আমাদের শকুনের মতো খাবে, তা আমরা বুঝিনি। আমরা নিম্নবিত্ত, আমাদের অনেক টাকা নেই যে বাইরে মেসে থাকব। এর সুযোগ নিয়ে আমাদের নির্যাতন করা হবে, লাঞ্ছিত করা হবে-এটা অন্যায়। তিনি আরও বলেন, আমরা গেস্টরুমের নামে এই নির্যাতনের সমাপ্তি চাই।

দর্শন বিভাগের নাফিসা ইসলাম সাকাফি বলেন, আমরা সবাই ম্যানার (আচরণ) শিখেই এখানে এসেছি। হলগুলোতে ম্যানার শিখানোর নামে আমাদের শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করা হয়। আমরা চাই এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গেস্টরুম কালচারটা পুরোপুরি বন্ধ হোক এবং আকতারকে যারা নির্যাতন করেছে তাদের ছাত্রত্ব বাতিল করা হোক।

ছাত্রলীগ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে-ছাত্রদল : আকতারুলকে নির্যাতনের নিন্দা জানিয়েছে হল শাখা ছাত্রদল। বৃহস্পতিবার বিজয় একাত্তর হল ছাত্রদলের সভাপতি সোহেল রানা ও সাধারণ সম্পাদক বিএম কাওসার স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, নির্যাতনকারীরা সবাই হল ছাত্রলীগের সক্রিয় কর্মী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস ও সবগুলো হলে ছাত্রলীগ ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে। হলগুলোতে নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য নিয়মিত পরিচালিত সন্ত্রাসী কার্যক্রমেরই অংশ বুধবারের এ নির্যাতন। নির্যাতনকারী ও তাদের মদদদাতা সবাইকে শাস্তির আওতায় এনে ক্যাম্পাস ও হলে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানাই।

এ ঘটনায় আরেক বিজ্ঞপ্তিতে নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ (বিসিএল)। কেন্দ্রীয় সংসদের সভাপতি গৌতম চন্দ্র শীল ও সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমানের সই করা বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো মুক্তচিন্তা চর্চার প্রাণকেন্দ্রে এ ঘটনা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও হৃদয়বিদারক। বিসিএল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছে, এ ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন