সুজনের সংবাদ সম্মেলন

ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত খুলনা সিটি

শান্তিপূর্ণভাবে কারচুপির নতুন মডেল * আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি ইসি * জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইসি সাহস দেখাতে পারবেÑ তা জনগণ মনে করে না * এই নির্বাচনের ত্র“টি-বিচ্যুতি আমলে নিয়ে তদন্ত করার পরামর্শ

  যুগান্তর রিপোর্ট ২৩ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

খুলনা সিটি কর্পোরেশন (কেসিসি) নির্বাচনকে অস্বচ্ছ ও ত্র“টিপূর্ণ হিসেবে আখ্যায়িত করে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বলেছে, এ নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবে কারচুপির নতুন মডেল। এ নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি নির্বাচন কমিশন (ইসি)। সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনে কমিশন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের সাহস দেখাতে পারেনি। নির্বাচনী পরীক্ষায় কমিশন ‘তৃতীয় বিভাগে’ পাস করেছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ইসি সেই সাহস দেখাতে পারবে কিনা- তা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছে বেসরকারি এ সংস্থাটি। একই সঙ্গে খুলনা সিটি নির্বাচনের ত্রুটি-বিচ্যুতি আমলে নিয়ে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করেছে সুজন। মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ‘খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের তথ্য উপস্থাপন ও সুজনের দৃষ্টিতে নির্বাচন’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন।

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন সুজন সভাপতি সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা এম হাফিজউদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার, নির্বাহী সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ ও ড. তোফায়েল আহমেদ। লিখিত বক্তব্য পড়েন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার। এতে নির্বাচনে জয়ী মেয়র, সংরক্ষিত নারী কাউন্সিলর ও সাধারণ কাউন্সিলরদের হলফনামার তথ্য তুলে ধরা হয়। সংবাদ সম্মেলনে বক্তারা আরও বলেন, আসন্ন সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলো সুষ্ঠুভাবে আয়োজনের মধ্য দিয়ে নির্বাচন কমিশনকে জনমনে আস্থা সৃষ্টি করতে হবে। অন্যথায় জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে জাতিগতভাবে আমরা নতুন সঙ্কটের মুখোমুখি হতে পারি; যা আমাদের একটি অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করতে পারে। আশা করি নির্বাচন কমিশন, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই তাদের চিহ্নিত ত্র“টিগুলো সংশোধন করবে এবং আগামী নির্বাচনগুলো অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ তথা স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করবে।

মূল প্রবন্ধে দিলীপ কুমার সরকার বলেন, খুলনা সিটি নির্বাচনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। পাশাপাশি পুরো ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, কারসাজিমুক্ত ও বিশ্বাসযোগ্য ছিল না। এ নির্বাচনে দৃশ্যত ব্যাপক এলাকাজুড়ে বড় কোনো ধরনের অঘটন ও সহিংসতা ছাড়া অনুষ্ঠিত হলেও নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও সুষ্ঠুতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেননা, অনেক ভোট কেন্দ্রে বিরোধী দলের পোলিং এজেন্ট না থাকা, কেন্দ্র দখল, জালভোট প্রদান, সিল-স্বাক্ষরবিহীন ব্যালটে প্রদত্ত ভোটকে বৈধ ভোট হিসেবে গণ্য করা, কেন্দ্রের সামনে ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর কর্মী কর্তৃক জটলা সৃষ্টি করে কোনো কোনো ভোটারের জন্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়েছে। অনেক ভোটার তাদের ভোট দিতে না পারা, নির্বাচনের আগ থেকেই বিরোধী দলের প্রার্থীর কর্মী সমর্থকদের গ্রেফতার ও হয়রানি করা, রিটার্নিং অফিসারের ওপর যুগ্ম-সচিব পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে সহায়তাকারী হিসেবে নিয়োগ করা ইত্যাদি ঘটনাবলি এ নির্বাচনকে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। তিনি বলেন, সর্বশেষ অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা করলেও বলা যায় যে, কয়েকটি ভালো নির্বাচনের পর একটি অস্বচ্ছ ও ত্রুটিপূর্ণ নির্বাচনের দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো খুলনায়। তিনি আরও বলেন, রংপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ইসি যে আস্থা অর্জন করেছিল, সাম্প্রতিককালে অন্যান্য কিছু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও খুলনা সিটি নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তা বহুলাংশে ভূলুণ্ঠিত হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা সম্পর্কে তিনি বলেন, এই নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের প্রস্তুতি ভালো থাকলেও একপর্যায়ে এসে রিটার্নিং অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে রিটার্নিং অফিসারকে সহায়তার জন্য যুগ্ম সচিব পদমর্যাদার একজনকে খুলনা পাঠানো হয়। বিষয়টি একদিকে যেমন নজিরবিহীন, পাশাপাশি তা কতটুকু যৌক্তিক ও আইনসম্মত তা নিয়ে বিস্তর প্রশ্ন রয়েছে। প্রথম দিক থেকেই এক ধরনের অভিযোগ ছিল যে, রিটার্নিং অফিসার পুলিশ প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না। তিনি বলেন, রিটার্নিং অফিসার ঘোষণা দিয়েছিলেন কোনো কেন্দ্রে ব্যাপক অনিয়ম হলে বা গোলযোগ সৃষ্টির কোনো চেষ্টা করা হলে, ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হবে। বিশৃঙ্খলার কারণে তিনটি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে। তবে আরও কিছু কেন্দ্র ছিল, যেখানে স্থগিত করার মতো ঘটনা ঘটলেও ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়নি। অনেক ভোট কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসারসহ নির্বাচনী কর্মকর্তারা নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা ও বিধি-বিধান অনুসরণ করেছেন কিনা- তা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে।

নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা সম্পর্কে দিলীপ সরকার বলেন, নির্বাচনের দিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রায় দশ হাজার সদস্য কাজ করেছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে একজন করে মোট ৩১ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ১০ জন জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করেছেন। কিন্তু ভোটগ্রহণ নির্বিঘœ করতে এত ব্যাপক প্রস্তুতি সত্ত্বেও অনেক কেন্দ্রে জাল ভোট দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। অনেক কেন্দ্রে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের সামনেই জাল ভোট প্রদান, ব্যালট পেপারে সিল মারা ইত্যাদি ঘটনা ঘটলেও, তাদের বিরুদ্ধে নির্লিপ্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে।

এম হাফিজউদ্দিন খান বলেন, আমরা দিন দিন গণতান্ত্রিক বিকাশের চর্চা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি। খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে যেসব অনিয়ম হয়েছে তার জন্য কারও অভিযোগ দায়ের করার অপেক্ষা না করে নির্বাচন কমিশনের ব্যবস্থা নেয়াটা তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব। কিন্তু তা আমরা তাদের করতে দেখিনি, যা সত্যিই হতাশাজনক।

ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সুজন নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রগুলো পর্যবেক্ষণ না করলেও পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণ করেছে। এতে দেখা গেছে, খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, শান্তিপূর্ণ, তথা স্বচ্ছ ও সুষ্ঠুভাবে আয়োজন করতে ব্যর্থ হয়েছে। কমিশন প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই করেনি। তিনি বলেন, কোনো কোনো ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম ইসিকে নিয়ন্ত্রণ করতে দেখা যায়নি। এর আগের কোনো নির্বাচনে এত সংখ্যক গ্রেফতারের ঘটনা ঘটেনি- যা একটি নতুন প্রক্রিয়া।

সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে এই নির্বাচনটা ছিল ইসির জন্য একটা পরীক্ষা, যাতে তারা তৃতীয় বিভাগে পাস করেছে। খুলনা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন আয়োজন করার ক্ষেত্রে ইসির সাংবিধানিক যে সাহস দেখানো দরকার ছিল, তা তারা দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। আগামী জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে আয়োজনে এই ইসি সাহস দেখাতে পারবে- তা জনগণ মনে করে না, আমিও মনে করি না।

ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ‘খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে একটি নতুন মডেলের নির্বাচন বলে আখ্যায়িত করা যায়। নির্বাচনে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া বা সহিংসতা হয়তো ততটা দেখা যায়নি কিন্তু ভেতরে ভেতরে নানা ধরনের অনিয়ম ঠিকই হয়েছে। নির্বাচনে পোলিং এজেন্টদের নিরাপত্তার অভাব দেখা যায় এবং ভোটারদের এক ধরনের ত্রাসের মধ্যে রাখা হয়েছিল। তিনি বলেন, যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করে তারাও তাদের মতামত স্বাধীনভাবে প্রকাশ করতে পারেনি। কারণ তাদের সরকারের কাছ থেকে রেজিস্ট্রেশন করে সংস্থা চালাতে হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নবনির্বাচিত সর্বমোট ৩৯ জন জনপ্রতিনিধির মধ্যে ১৮ জনেরই (শতকরা ৪৬ দশমিক ১৫ শতাংশ) শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি বা তার নিচে। পক্ষান্তরে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারীর সংখ্যা ১৫ জন (৩৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ)। ৩৯ জন নবনির্বাচিত জন প্রতিনিধির মধ্যে সাতজন (১৭ দশমিক ৯৪ শতাংশ) মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণ্ডি অতিক্রম করতে পারেননি। এ ছাড়া জয়ী ৩৯ জন জনপ্রতিনিধির মধ্যে ২৭ জনই (৬৯ দশমিক ২৩ শতাংশ) ব্যবসায়ী। চারজনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×