পল্লবীতে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক

পুলিশের শেল্টারেই মাদকের কারবার!

এসআই বিল্লাল মাদক কারবারিদের কাছ থেকে বিকাশে নেন টাকা * মাদক ব্যবসায় বাধা দিলে হেরোইন মামলায় জেলে পাঠানোর অভিযোগ

প্রকাশ : ২৯ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আহমদুল হাসান আসিক

সারা দেশে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের মধ্যে খোদ পুলিশের শেল্টারে রাজধানীর পল্লবীর একাধিক স্পটে এখনও প্রকাশ্যে চলছে মাদক ব্যবসা। স্থানীয়রা বলছেন, কিছু অসাধু পুলিশ সদস্যকে ম্যানেজ করে বিহারি অধ্যুষিত এ এলাকায় গড়ে উঠেছে একাধিক মাদক স্পট।

এখানকার মাদক ব্যবসায়ীদের মূল শেল্টারদাতা এসআই বিল্লাল হোসেইন। তাকে ম্যানেজ করতে পারলেই মাদক ব্যবসায়ীদের আর কোনো সমস্যা নেই। তিনি বিকাশের মাধ্যমে মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ নেন। বিল্লালের সঙ্গে সখ্য রয়েছে এমন মাদক ব্যবসায়ীদের সম্পর্কে পুলিশকে কোনো সোর্স তথ্য দিলে তার রেহাই নেই। বিল্লাল নিজে উদ্যোগ নিয়ে সেই সোর্সকে মাদকসহ মামলা দিয়ে জেলে পাঠান। সরেজমিনে যুগান্তরের অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকায় মাদক ব্যবসায়ীদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এসআই বিল্লালের নাম উঠে এসেছে। সরেজমিন খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, পল্লবীর বিভিন্ন স্পটে প্রকাশ্যেই চলছে মাদক ব্যবসা। পল্লবীর বাউনিয়া বাঁধ এলাকার মাদক স্পট নিয়ন্ত্রণ করে পাপিয়া। এ স্পটে এখনও প্রকাশ্যেই কয়েক নারী মাদক বিক্রি করছেন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, সন্ধ্যা নামলেই ইয়াবায় আসক্ত তরুণ-তরুণীর আনাগোনা বেড়ে যায় পাপিয়ার স্পটে। মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরুর পরও এখানে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক।

রোববার রাতে এই প্রতিবেদক এক ইয়াবা ক্রেতার সঙ্গে পাপিয়ার স্পট গিয়ে ইয়াবা ট্যাবলেট বিক্রি প্রত্যক্ষ করে। সোর্সের মাধ্যমে রুসি নামে এক নারী মাদক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ৬০০ টাকার বিনিময়ে ওই ক্রেতা দুটি ইয়াবা ট্যাবলেট কিনেন। প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি হওয়ার তথ্য পাওয়ার পর সরেজমিন গিয়ে সত্যতা যাচাইয়েও একই চিত্র মেলে।

মাদক ক্রয়ে সহায়তাকারী সোর্স জানান, মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চলার কারণে অপরিচিত কারও কাছে মাদক বিক্রি করা হয় না। আগে একটি ইয়াবা ট্যাবলেট ছিল ২০০ টাকা। কড়াকড়ির কারণে এখন দাম ৩০০ টাকা।

স্থানীয়রা জানান, পাপিয়ার সঙ্গে এসআই বিল্লালের সখ্য থাকায় এ নিয়ে তারা কোনো কথা বলতে চান না। কথা বললেই ধরে নিয়ে সাজানো মাদক মামলা দেন বিল্লাল। অধিকাংশ ক্ষেত্রে তিনি হেরোইন দিয়ে মামলা দেন। পল্লবীতে এখন তিনি ‘হেরোইন বিল্লাল’ নামেও পরিচিত। পাপিয়ার মাদক ব্যবসায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল এমন একাধিক ব্যক্তিকে বিল্লাল হেরোইন মামলা দিয়ে জেলে পাঠিয়েছেন বলেও অভিযাগ রয়েছে।

যুগান্তরের কাছে একাধিক ভুক্তভোগী এমন অভিযোগ করেছেন। পাপিয়ার স্পটে যারা মাদক বিক্রি করে তারা সবাই নারী। তারা হলো- মনি, মুন্নি, রুসি, রাবেয়া, শাহিনা ও হালিমা।

পুলিশের একাধিক সোর্স যুগান্তরকে জানান, পাপিয়া স্থানীয় ‘রহিম নেতা’র মেয়ে। রহিম এক সময় মদ বিকি করত। পরে সে এলাকায় গাঁজা বিক্রি করে। কোনো দলের হোমরা-চোমরা না হলেও সে ‘রহিম নেতা’ নামে এলাকায় পরিচিত। রহিমের মেয়ে পাপিয়া ইয়াবা ও গাঁজা বিক্রি করেন। শুধু পাপিয়ার স্পটই নয়, পল্লবীর বিভিন্ন স্পটে এমন প্রকাশ্যে বিভিন্ন ধরনের মাদক বিক্রি হচ্ছে।

বিভিন্ন স্থানে পুলিশ অভিযান চালাচ্ছে। কিন্তু অভিযানের আগেই মাদক ব্যবসায়ীরা খবর পেয়ে পালিয়ে যায়। পরে আবার তারা স্পটে ফিরে মাদক বিক্রি করেন। ১১ নম্বরের তালতলায় কাল্লুর গাজার স্পট এবং খালার মদের স্পটে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে মাদক। ১০ নম্বর ঝুট পট্টিতে রাজীবের স্পট, কুর্মিটোলা বিহারি ক্যাম্পে মুকুলের স্পট (মুকুল একটি হত্যা মামলায় এখন জেলে), বাউনিয়া বাঁধ এলাকায় হারুনের স্পটেও মাদক বিক্রি থেমে নেই। ভাসমান হেরোইন ব্যবসায়ী বুদু বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই হেরোইন বিক্রি করছে।

বিহারিদের মিল্লাত ক্যাম্পে হাফিজ এবং ইরানি ও তালাত ক্যাম্পে দেলোয়ার মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করেন। এই তিনটি ক্যাম্পেও মাদক বিক্রি চলছে। ফুটবল গ্রাউন্ড ক্যাম্পে মাদক বিক্রি করছে ইমতিয়াজ ও মিস্টার। তারা দু’জন সহোদর। তারা ক্যাম্পে অবস্থান করে মাদক বিক্রি করলেও পুলিশ তাদের ধরছে না।

পল্লবী থানার এসআই বিল্লাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, আমি কোনো মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে আপস করেছি এমন কোনো রেকর্ড নেই। আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষ তদন্ত করছে। তাদের সঙ্গে আপনি কথা বলে দেখতে পারেন।

পল্লবী থানার ওসি দাদন ফকির যুগান্তরকে বলেন, আগে পল্লবী এলাকার বিভিন্ন স্পটে প্রকাশ্যেই মাদক বিক্রি চলত। এগুলো আমরা বন্ধ করে দিয়েছি। এখন পল্লবীতে কোনো মাদকের স্পট নেই। ভ্রাম্যমাণ কেউ কেউ মাদক বিক্রি করে থাকে। তাদের ধরতে আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি। এসআই বিল্লালের বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।