এবার সিসার রাজ্যে হানা

অলআউট অভিযান চলবে মাদকবিরোধী স্টাইলে * সিসা বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে, ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ নিয়ে কাজও শুরু করেছে -স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

  তোহুর আহমদ ৩১ মে ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

এবার সিসার রাজ্যে হানা
ফাইল ছবি।

সরকারের মাদকবিরোধী চলমান সাঁড়াশি অভিযানে এবার যুক্ত হচ্ছে ‘সিসা’। রেস্টুরেন্টের আড়ালে রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে গড়ে ওঠা জমজমাট সিসার নেশা আড্ডায় হানা দেবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ইতিমধ্যে তালিকা প্রণয়নসহ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইয়াবার চেয়েও ভয়াবহ। যারা সিসা গ্রহণ করে তাদের অনেকেই আগে থেকেই ইয়াবা আসক্ত। তাই মাদকবিরোধী অভিযানকে সফল করতে সিসার আস্তনাগুলো গুঁড়িয়ে দেয়া হবে। এদের গডফাদারসহ শীর্ষদের আইনের আওতায় আনা হবে।

সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার সিসাবারগুলো বন্ধ করে দেয়ার পাশাপাশি মালিকদের বিরুদ্ধে মাদক ও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলা দায়ের করা হবে। একই সঙ্গে সিসাকে মাদক হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সোমবার যুগান্তরকে বলেন, সিসা বন্ধে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এ নিয়ে কাজও শুরু করেছে।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯০ সংশোধন করে সিসাকে মাদক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে ইতিমধ্যে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। আগামী ৬ মাসের মধ্যে এটি মাদক আইনে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে।

এ প্রসঙ্গে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক মজিবুর রহমান পাটোয়ারী যুগান্তরকে বলেন, সিসা যতটা না মাদক তার চেয়েও বড় এটি ক্রমেই প্রজন্মের অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ সিসা সেবনের পরিবেশটাই ভালো নয়।

ছোট ছোট খুপরি ঘরে তরুণ-তরুণীরা একসঙ্গে বসে যেভাবে বুক ভরে ধোঁয়া টানছে তাতে যথেষ্ট উদ্বেগের কারণ রয়েছে। তাছাড়া আমরা দেখেছি আজকে যারা সিসা সেবনে অভ্যস্ত কালকে তারাই ইয়াবাসহ বড় ধরনের মাদকে আসক্ত হচ্ছে।

এদিকে রাজধানীর সিসাবারগুলোতে দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা যায়, যারা সিসা নিতে আসে তারা বহু আগে থেকেই ইয়াবা সেবনে আসক্ত। মূলত এরা বেশির ভাগ সময় নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। যাদের অনেকেই ধনাঢ্য ঘরের সন্তান। নেশার উপকরণ হিসেবে তারা এটি নিয়ে থাকে।

জানতে চাইলে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক দুলাল কৃষ্ণ সাহা যুগান্তরকে বলেন, বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিসার নমুনা পরীক্ষায় মাত্রাতিরিক্ত নিকোটিনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। তিনি বলেন, সাধারণভাবে সিগারেটের ক্ষেত্রে নিকোটিনের অনুমোদিত মাত্রা দু’শ পিপিএম (পার্টিকেলস পার মিলিয়ন)। কিন্তু সিসায় নিকোটিনের মাত্রা সর্বনিু আড়াইশ থেকে সাড়ে তিনশ’ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। তাছাড়া অনেক সময় সিসা সেবনের হুঁক্কায় বিশেষভাবে ইয়াবা ট্যাবলেটের গুঁড়ো মিশিয়ে সেবন করা হয়। তাই সিসা মাদক নয় বলে হাত গুটিয়ে বসে থাকার সুযোগ নেই।

গত ৫ মার্চ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত জাতীয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের এক সভায় সিসার ব্যাপারে আলোচনা হয়। সভায় বলা হয়, আদালতের আদেশ নিয়ে সিসা লাউঞ্জগুলো চলার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে না। ওই সভায় র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ বলেন, আইনি বাধা দূর হলে সিসার বিরুদ্ধে র‌্যাবের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ঢাকার ১০ অভিজাত সিসাবার : আগে রাজধানীর গুলশান ও বনানীতে সিসা সেবনের কথিত লাউঞ্জ বেশি দেখা গেলেও এখন তা ধানমণ্ডি এলাকায় ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে। এখন ধানমণ্ডির সাতমসজিদ রোড এলাকার প্রায় প্রতিটি রেস্টুরেন্টেই সিসা সেবনের ব্যবস্থা রয়েছে। দিন দিন এটি মিরপুর, উত্তরা ও পুরান ঢাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।

ধানমণ্ডি সাতমসজিদ রোডে এইচটুও নামের সিসা লাউঞ্জটি তরুণদের মধ্যে ব্যাপক পরিচিত। এর ঠিকানা ৭/এ রোডের ৮৪ নম্বর বাড়ি (লেভেল-৪)।

এখানে একবার রিফিল করা সিসা সেবনের জন্য গুনতে হয় এক হাজার টাকা। একসঙ্গে চারজন সেবন করলে মাত্র ২০ মিনিটে তা শেষ হয়ে যায়। এরপর আবার রিফিল করতে হয়। এভাবে এক ঘণ্টার আড্ডায় অন্তত ৫ হাজার টাকা খরচ হয়।

সরেজমিন সেখানে গিয়ে দেখা যায়, রেস্টুরেন্টের দেয়ালে বিশাল টিভি পর্দায় ইংরেজি গান বাজানো হচ্ছে। মাঝখানে দুই সারিতে কালো সোফাসেট সাজানো। অন্তত ৫০ জনের বসার ব্যবস্থা। সন্ধ্যার পর একটা সিটও খালি পাওয়া গেল না। চারটি সিটের মাঝখানে অন্তত ৩ ফিট লম্বা স্টেনলেস স্টিলের হুক্কা স্ট্যান্ড বসানো। স্ট্যান্ডের নিচের দিক থেকে একটা লম্বা পাইপ বেরিয়ে এসেছে। সেই পাইপে মুখ লাগিয়ে বড় দমে ধোঁয়া টেনে নিচ্ছেন সেবনকারীরা।

কিছুক্ষণ পরপর হুঁক্কার আগুনে বাতাস দিয়ে গনগনে করে যাচ্ছেন ওয়েটাররা। একেকজন ২-৩ বার সিসায় দম দিয়ে অন্যের দিকে পাইপটি বাড়িয়ে দিচ্ছেন। এভাবেই হাতবদল করে সিসা সেবন চলছে। ভেতরে ঘণ্টা দুয়েক বসে থেকে দেখা গেল, সিসাসেবনকারীরা রেস্টুরেন্টের খাবার-দাবার তেমন একটা খাচ্ছেন না। বেশির ভাগ টেবিলে তরুণ-তরুণীরা একসঙ্গে বসে সিসা সেবনে মত্ত। এগিয়ে গিয়ে এক জায়গায় বসে থাকা চার বন্ধুর সঙ্গে কথা বলে যুগান্তর প্রতিবেদক।

সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে টেবিলে থাকা এক তরুণী তাৎক্ষণিক উঠে বাইরে চলে গেলেন। দু’জন তরুণ জানান, তারা পার্শ্ববর্তী ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) শিক্ষার্থী। নিছক সময় কাটানোর জন্য এখানে বসে বন্ধুদের নিয়ে আড্ডা মারেন।

সূত্র জানায়, ধানমণ্ডি, গুলশান ও বনানীতে এ রকম অন্তত ১০টি অভিজাত রেস্টুরেন্টে সিসা সেবনের বড়সড় আয়োজন রয়েছে। এগুলো হল- বনানী ১১ নম্বর রোডের সি ব্লকের ৫৪ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত ফ্লোর সিক্স রিলোটেড। এখানে এক হুক্কা সিসার দাম এক হাজার থেকে ১২শ টাকা।

বাড়ি নম্বর ৭, রোড ২৪, বনানী কে ব্লকের ২৪ নম্বর রোডে অবস্থিত মি-লাউঞ্জ কফি অ্যান্ড কনভারসেশন নামে সিসা লাউঞ্জ গড়ে উঠেছে ৭ নম্বর বাড়ির নিচতলাজুড়ে।

গুলশান-১ নম্বরে দীর্ঘদিন ধরে চলছিল মিরেজ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড সিসা লাউঞ্জ। রোববার ৮ লাখ টাকা জরিমানার পর প্রতিষ্ঠানটি সিল করে দিয়েছে পুলিশ। ফিউসন হান্ট নামের রাজধানীর অন্যতম অভিজাত রেস্টুরেন্টটি এখন সিসা লাউঞ্জ হিসাবেই পরিচিত। এর ঠিকানা বনানী ২৭ নম্বর রোডের এ ব্লকের ৬৫/বি নম্বর বাড়ি।

ফারেনহাইট পয়েন্ট নামের আরেকটি সিসা বার চলছে বনানী ১১ নম্বর রোডের এইচ ব্লকের ২৫ নম্বর বাড়িতে। বনানীর ই ব্লকের ১২ নম্বর রোডের ১৩৩ নম্বর বাড়িতে চলছে অরিয়েন্টাল লাউঞ্জ নামের আরেকটি সিসাবার। বনানী ১১ নম্বর রোডে ১৫৩ নম্বর বাড়িতে গড়ে ওঠা মিন্ট আল্ট্রা লাউঞ্জ নামের সিসা বারটিতে মদ বিয়ারসহ অবৈধ অ্যালকোহল বিক্রির অভিযোগ আছে। বনানীর ১১ নম্বর রোডের ৬৭/ডি প্লটের একটি বহুতল ভবনের ৭ম তলায় গড়ে ওঠা রোজাক রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড লাউঞ্জে রয়েছে সিসা সেবনের সব উপকরণে আভিজাত্যের ছোঁয়া।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকায় রাজধানীর সিসা লাউঞ্জগুলোর সংখ্যা অন্তত দেড়শ’। এ রকম একটি তালিকায় রাজধানীর ১৭টি সিসা বারকে উদ্বেগজনক হিসেবে চিহ্নিত করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে গোপন প্রতিবেদন দেয়া হয়।

এগুলো হচ্ছে- ধানমণ্ডি ২৭ নম্বর রোডের ৬০ নম্বর বাড়ির এলএইচএফ ফুড অ্যান্ড লাউঞ্জ ও ঝাল লাউঞ্জ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট, ধানমণ্ডি ৭/এ নম্বর রোডের (সাতমসজিদ রোড) ৮৪/২ নম্বর বাড়ির এইচটুও লাউঞ্জ ও অ্যারাবিয়ান নাইটস, ধানমণ্ডি ৬ নম্বর রোডের ধানমণ্ডি প্লাজার তৃতীয় তলায় ‘লাউঞ্জ সিক্স’, ধানমণ্ডির ৮১ নম্বর রোডের ৮/এ নম্বর বাড়ির (গ্রীন তাজ সেন্টার) তৃতীয় তলায় ‘সেভেন টুয়েলভ লাউঞ্জ’, মোহাম্মদপুর তাজমহল রোডের ‘ফুড কিং’, উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের ৭ নম্বর রোডের ৫৯ নম্বর বাড়ির ‘হাঙ্গরি আই’ ও গরিব-ই-নেওয়াজ এভিনিউ’র ‘হাঙ্গরি আই-২’, উত্তরা ১ নম্বর সেক্টরের ৫ নম্বর রোডের ১ নম্বর বাড়ির ‘পেট রাস’, উত্তরা ৩ নম্বর সেক্টরের ৭/বি নম্বর রোডের ৩৩ নম্বর বাড়ির ‘ক্যাফে মিরর’, বনানীর ই ব্লকের ১১ নম্বর রোডের ১৫৩ নম্বর বাড়ির ৪ তলায় ‘মিন্ট আল্ট্রা লাউঞ্জ’ ও সি ব্লকের ৫৪ নম্বর বাড়িতে ‘ফ্লোর সিক্স লাউঞ্জ অ্যান্ড গ্রিল’, বনানীর ডি ব্লকের ১০ নম্বর রোডের ৬৬ নম্বর বাড়িতে ‘আলগিরা রেস্টুরেন্ট’ ও ২৩ নম্বর বাড়িতে ‘রক রেস্টুরেন্ট’, বনানী ১১ নম্বর রোডের সি ব্লকের ৯৮ নম্বর বাড়িতে ‘সিসা লাউঞ্জ’ এবং গুলশান-১ এর জায়িকা রেস্টুরেন্ট। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর জানিয়েছে, এসব সিসা বারে স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের আনাগোনা সবচেয়ে বেশি। না বুঝে ফ্যাশন বা স্টাইলের নামে তারা নেশার জগতে জড়িয়ে পড়ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যেসব রেস্টুরেন্টে সিসা লাউঞ্জ খোলা হয়েছে তার বেশির ভাগেরই ট্রেড লাইসেন্স নেই। স্থানীয় প্রভাবশালী ভবন মালিক বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে মাসোয়ারা দিয়ে এগুলো টিকে আছে। এমনকি সিসা পরিবেশন হয় এমন রেস্টুরেন্টগুলো থেকে পুলিশকে মাসিক ভিত্তিতে (মান্থলি পেমেন্ট) ঘুষ দেয়ার অভিযোগও পুরনো।

তবে চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের পর রাজধানীর বেশির ভাগ সিসা লাউঞ্জে সিসা পরিবেশন সাময়কিভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। অনেক জায়গায় সাময়িকভাবে সিসা পরিবেশন বন্ধ থাকায় দুঃখ প্রকাশ করে নোটিশও টানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ঘটনাপ্রবাহ : মাদকবিরোধী অভিযান ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter