প্রয়োজন আরও দুই লাখ ইভিএম
jugantor
আগামী জাতীয় নির্বাচনে সব আসনে ভোট
প্রয়োজন আরও দুই লাখ ইভিএম
মেশিন পরিচালনায় এক লাখের বেশি জনবল দরকার, আছে ১৩ হাজার * সব আসনে ইভিএমের আগে দলগুলোর ঐকমত্য জরুরি -ড. সাখাওয়াত হোসেন

  কাজী জেবেল  

০৯ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনশ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণে এখনও প্রস্তুত নয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের হাতে এক লাখ ৫২ হাজার ৫৩৫টি ইভিএম রয়েছে; যা দিয়ে সর্বোচ্চ একশ আসনে ভোটগ্রহণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ইসি সচিবালয়। তিনশ আসনে এ মেশিনে ভোটগ্রহণ করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে অন্তত আরও দুই লাখ নতুন ইভিএম কিনতে হবে। এসব মেশিন কেনার জন্য নিতে হবে নতুন প্রকল্প। একইসঙ্গে বিপুলসংখ্যক জনবলকে প্রশিক্ষণও দিতে হবে। আগামী নির্বাচনের আগে এক লাখের বেশি জনবলকে ইভিএম বিষয়ে প্রশিক্ষণ শেষ করতে হবে। বর্তমানে এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল ১৩ হাজারের কিছুটা বেশি। নির্বাচন কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব আসনে ইভিএম ব্যবহারের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য জরুরি বলে মনে করেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে এ মেশিন ব্যবহারের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসির আলোচনা করা দরকার। নির্বাচনে তারা এ মেশিন চায় কিনা, তাদের মধ্যে ঐকমত্য আসে কিনা-সেগুলো দেখা দরকার। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতাও আছে কিনা-সেটাও বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যেসব ইভিএম কিনেছে সেগুলোর মধ্যে কতগুলো ব্যবহারযোগ্য, সেগুলো সংরক্ষণ স্থান সমস্যা দূর হয়েছে কিনা-সেগুলো বিবেচনায় নতুন ইভিএম প্রকল্প নেওয়া বাঞ্চনীয়।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর। রোববার তিনি যুগান্তরকে বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্তমূলক আলোচনা হয়নি। তবে আমাদের হাতে কত সংখ্যক ইভিএম আছে, কত লাগতে পারে সেগুলো পর্যালোচনা করছি। তিনি বলেন, ইভিএম ব্যবহারের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সন্দেহ দূর করতে হবে। তাই যেসব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে সেখানে এ মেশিন কাস্টোমাইজেশন ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার সময়ে প্রার্থী বা তাদের প্রতিনিধিদের রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আইনেও এ বিষয়ে বলা আছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তিনশ আসনে ইভিএম ব্যবহারের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমরা মনে করি, ইভিএম একটি ভালো প্রযুক্তি। এ মেশিন ব্যবহারে কারিগরি দিক, জনবল প্রশিক্ষণ ও আর্থিক বিষয় জড়িত। এসব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইসির ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র ও ভোটকক্ষ স্থাপন করা হয়। বিদ্যমান ১১ কোটি ৩২ লাখ ৫৮ হাজার ভোটার হিসাব ধরা হলেই আগামী নির্বাচনে অন্তত ৪৫ হাজার ৩১৬ কেন্দ্র এবং দুই লাখ ৫৪ হাজার ৩৮১ ভোটকক্ষ হবে। এ হিসাবেই প্রায় তিন লাখ ইভিএম মেশিনের প্রয়োজন হবে। চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদে আড়াই থেকে তিন শতাংশ ভোটার বেড়ে গেলে ভোটকেন্দ্র ও কক্ষের সংখ্যাও বেড়ে যাবে। এছাড়া বিদ্যমান মেশিনের মধ্যে যেগুলো অচল সেগুলো বাদ দেওয়া, কিছু মেশিন রিজার্ভে রাখা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহার-এ তিন ক্যাটাগরিতে আরও ৫০ হাজার মেশিনের দরকার হবে। সবমিলিয়ে অন্তত আরও দুই লাখ ইভিএম কেনার প্রয়োজন দেখা দেবে।

নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা শাখা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ইসির চারটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। বিগত নির্বাচন কমিশন যে দেড় লাখ ইভিএম কিনেছে সেই প্রকল্প শেষ হবে আগামী বছরের জুনে। ইভিএম কেনার নতুন কোনো প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কোনো কার্যক্রম নেই ইসির। আগামী বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহনের দিন নির্ধারণ করতে হলে ওই বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করতে হবে। এ হিসাবে এক বছরের ৪ মাসের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ, অনুমোদন ও ইভিএম কিনে সেগুলো ইসিকে বুঝিয়ে দেওয়ার কাজও শেষ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ যুগান্তরকে বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ব্যালটে নাকি ইভিএমে হবে তা নিয়ে এখনও কমিশনের কোনো সিদ্ধান্ত পাইনি। আমাদের হাতে যে সংখ্যক ইভিএম আছে তাতে একশ বা তার কিছু বেশি আসনে ভোটগ্রহণ করা যাবে। তিনশ আসনে ভোটগ্রহণ করতে হলে নতুন ইভিএম কিনতে হবে। নতুন ইভিএম কেনার কোনো পরিকল্পনা এখনও ইসির নেই।

জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় লাখ ইভিএম কেনে বিগত কেএম নূরুল হুদা কমিশন। ২০১৮ সালের জুনে নেওয়া ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের জুনে। এছাড়া প্রকল্পের বাইরে আরও দুই হাজার ৫৩৫টি ইভিএম কিনেছিল ইসি। সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় অনেক জেলায় ইভিএমের সরঞ্জাম ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। তারা যুগান্তরকে জানান, সংরক্ষণের স্থান না থাকায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সার্ভার স্টেশনগুলোতে একটার ওপর আরেকটা ইভিএম স্তূপ রাখা হয়েছে। এতে ভারের চাপে অনেক ইভিএমের মনিটর ও ব্যালট ইউনিট নষ্ট হয়ে গেছে। যদিও বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সংরক্ষণের জন্য গুদাম ভাড়া করতে ইসির মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছে।

তিনশ আসনে কত ইভিএম : ইসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতি ৫০০ পুরুষ ভোটারের জন্য একটি ও প্রতি ৪০০ নারী ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকক্ষ স্থাপন করা হয়। প্রতি দুই হাজার ৫০০ ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকেন্দ্র করা হয়। ২ মার্চ পর্যন্ত দেশে ভোটার সংখ্যা ১১ কোটি ৩২ লাখ ৯১ হাজার ৭৬৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ কোটি ৭৬ লাখ ৯৩ হাজার ১৯ ও নারী ভোটার ৫ কোটি ৫৫ লাখ ৯৮ হাজার ২৯৬ জন। এ হিসাব ধরা হলে আগামী নির্বাচনে ভোটকক্ষ হবে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৮১টি। আর ভোটকেন্দ্র হবে ৪৫ হাজার ৩১৬টি। নির্বাচনে প্রতিটি কক্ষে একটি করে এবং প্রতিটি কেন্দ্রে একটি অতিরিক্ত ইভিএম রাখা হয়। এ হিসাবেই আগামী সংসদ নির্বাচনে দুই লাখ ৯৯ হাজার ৬৯৭টি ইভিএমের দরকার হবে। আরও জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু করেছে। এতে আড়াই থেকে তিন শতাংশ নতুন ভোটার তালিকায় যুক্ত হবে বলে ইসি আশা করছে। নতুন ভোটার যুক্ত হলে আরও অন্তত সাত হাজার ইভিএম বেশি লাগবে। এছাড়া নির্বাচনের আগে মক ভোটিং ও নির্বাচনি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্যও ইভিএম মেশিন লাগবে। সবমিলিয়ে আগামী নির্বাচনে সাড়ে তিন লাখ ইভিএম প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন ইসির কর্মকর্তারা। বর্তমানে ইসির হাতে রয়েছে এক লাখ ৫২ হাজার ৫৩৫টি।

জনবল প্রশিক্ষণ : নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউশন সূত্রে জানা গেছে, ইভিএমের কোয়ালিটি কন্ট্রোল, কাস্টোমাইজেশন ও কারিগরি সমস্যা দূরকরণ-এ তিন ধরনের প্রশিক্ষিত জনবলের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে ইসির প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার। আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনশ আসনে ইভিএম ব্যবহার হলে বর্তমানে যেসব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের জন্য দুজন করে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তাদের রাখা হচ্ছে। এ হিসাব ধরা হলে আগামী নির্বাচনে এক লাখ কারিগরি প্রশিক্ষিত জনবলের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রশিক্ষিত ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা রয়েছেন ১২ হাজারের কিছু বেশি। ইভিএম মেশিনে প্রতীক ও ভোটার তালিকা কাস্টোমাইজেশন বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি করে আসছে। সম্প্রতি ইসির নিজস্ব ৪০ কর্মকর্তাকে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনশ আসনে ভোটগ্রহণ করতে হলে কয়েক হাজার কর্মকর্তাকে এ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এছাড়া ইভিএমের কোয়ালিটি কন্ট্রোল সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ইসির ৮০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। এ সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে।

আগামী জাতীয় নির্বাচনে সব আসনে ভোট

প্রয়োজন আরও দুই লাখ ইভিএম

মেশিন পরিচালনায় এক লাখের বেশি জনবল দরকার, আছে ১৩ হাজার * সব আসনে ইভিএমের আগে দলগুলোর ঐকমত্য জরুরি -ড. সাখাওয়াত হোসেন
 কাজী জেবেল 
০৯ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনশ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) ভোটগ্রহণে এখনও প্রস্তুত নয় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বর্তমানে নির্বাচন কমিশনের হাতে এক লাখ ৫২ হাজার ৫৩৫টি ইভিএম রয়েছে; যা দিয়ে সর্বোচ্চ একশ আসনে ভোটগ্রহণ করা সম্ভব হবে বলে মনে করছে ইসি সচিবালয়। তিনশ আসনে এ মেশিনে ভোটগ্রহণ করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে অন্তত আরও দুই লাখ নতুন ইভিএম কিনতে হবে। এসব মেশিন কেনার জন্য নিতে হবে নতুন প্রকল্প। একইসঙ্গে বিপুলসংখ্যক জনবলকে প্রশিক্ষণও দিতে হবে। আগামী নির্বাচনের আগে এক লাখের বেশি জনবলকে ইভিএম বিষয়ে প্রশিক্ষণ শেষ করতে হবে। বর্তমানে এ বিষয়ে প্রশিক্ষিত জনবল ১৩ হাজারের কিছুটা বেশি। নির্বাচন কমিশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব আসনে ইভিএম ব্যবহারের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য জরুরি বলে মনে করেন সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচনে এ মেশিন ব্যবহারের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে ইসির আলোচনা করা দরকার। নির্বাচনে তারা এ মেশিন চায় কিনা, তাদের মধ্যে ঐকমত্য আসে কিনা-সেগুলো দেখা দরকার। একইসঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতাও আছে কিনা-সেটাও বিবেচনা করতে হবে। তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন যেসব ইভিএম কিনেছে সেগুলোর মধ্যে কতগুলো ব্যবহারযোগ্য, সেগুলো সংরক্ষণ স্থান সমস্যা দূর হয়েছে কিনা-সেগুলো বিবেচনায় নতুন ইভিএম প্রকল্প নেওয়া বাঞ্চনীয়।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্তের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনার মো. আলমগীর। রোববার তিনি যুগান্তরকে বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে ইভিএমে ভোটগ্রহণের বিষয়ে এখনও সিদ্ধান্তমূলক আলোচনা হয়নি। তবে আমাদের হাতে কত সংখ্যক ইভিএম আছে, কত লাগতে পারে সেগুলো পর্যালোচনা করছি। তিনি বলেন, ইভিএম ব্যবহারের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর সন্দেহ দূর করতে হবে। তাই যেসব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার হবে সেখানে এ মেশিন কাস্টোমাইজেশন ও অন্যান্য কার্যক্রম পরিচালনার সময়ে প্রার্থী বা তাদের প্রতিনিধিদের রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আইনেও এ বিষয়ে বলা আছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, তিনশ আসনে ইভিএম ব্যবহারের কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে আমরা মনে করি, ইভিএম একটি ভালো প্রযুক্তি। এ মেশিন ব্যবহারে কারিগরি দিক, জনবল প্রশিক্ষণ ও আর্থিক বিষয় জড়িত। এসব বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ইসির ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, ভোটার সংখ্যার ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট কেন্দ্র ও ভোটকক্ষ স্থাপন করা হয়। বিদ্যমান ১১ কোটি ৩২ লাখ ৫৮ হাজার ভোটার হিসাব ধরা হলেই আগামী নির্বাচনে অন্তত ৪৫ হাজার ৩১৬ কেন্দ্র এবং দুই লাখ ৫৪ হাজার ৩৮১ ভোটকক্ষ হবে। এ হিসাবেই প্রায় তিন লাখ ইভিএম মেশিনের প্রয়োজন হবে। চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদে আড়াই থেকে তিন শতাংশ ভোটার বেড়ে গেলে ভোটকেন্দ্র ও কক্ষের সংখ্যাও বেড়ে যাবে। এছাড়া বিদ্যমান মেশিনের মধ্যে যেগুলো অচল সেগুলো বাদ দেওয়া, কিছু মেশিন রিজার্ভে রাখা এবং প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে ব্যবহার-এ তিন ক্যাটাগরিতে আরও ৫০ হাজার মেশিনের দরকার হবে। সবমিলিয়ে অন্তত আরও দুই লাখ ইভিএম কেনার প্রয়োজন দেখা দেবে।

নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা শাখা সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে ইসির চারটি প্রকল্প চলমান রয়েছে। বিগত নির্বাচন কমিশন যে দেড় লাখ ইভিএম কিনেছে সেই প্রকল্প শেষ হবে আগামী বছরের জুনে। ইভিএম কেনার নতুন কোনো প্রকল্প প্রস্তাব তৈরির কোনো কার্যক্রম নেই ইসির। আগামী বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহনের দিন নির্ধারণ করতে হলে ওই বছরের সেপ্টেম্বরের মধ্যে তফসিল ঘোষণা করতে হবে। এ হিসাবে এক বছরের ৪ মাসের মধ্যে প্রকল্প গ্রহণ, অনুমোদন ও ইভিএম কিনে সেগুলো ইসিকে বুঝিয়ে দেওয়ার কাজও শেষ করতে হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ যুগান্তরকে বলেন, আগামী সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ ব্যালটে নাকি ইভিএমে হবে তা নিয়ে এখনও কমিশনের কোনো সিদ্ধান্ত পাইনি। আমাদের হাতে যে সংখ্যক ইভিএম আছে তাতে একশ বা তার কিছু বেশি আসনে ভোটগ্রহণ করা যাবে। তিনশ আসনে ভোটগ্রহণ করতে হলে নতুন ইভিএম কিনতে হবে। নতুন ইভিএম কেনার কোনো পরিকল্পনা এখনও ইসির নেই।

জানা গেছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তিন হাজার ৮২৫ কোটি টাকা ব্যয়ে দেড় লাখ ইভিএম কেনে বিগত কেএম নূরুল হুদা কমিশন। ২০১৮ সালের জুনে নেওয়া ওই প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে আগামী বছরের জুনে। এছাড়া প্রকল্পের বাইরে আরও দুই হাজার ৫৩৫টি ইভিএম কিনেছিল ইসি। সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় অনেক জেলায় ইভিএমের সরঞ্জাম ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন কয়েকজন জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। তারা যুগান্তরকে জানান, সংরক্ষণের স্থান না থাকায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে সার্ভার স্টেশনগুলোতে একটার ওপর আরেকটা ইভিএম স্তূপ রাখা হয়েছে। এতে ভারের চাপে অনেক ইভিএমের মনিটর ও ব্যালট ইউনিট নষ্ট হয়ে গেছে। যদিও বর্তমান কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর সংরক্ষণের জন্য গুদাম ভাড়া করতে ইসির মাঠ প্রশাসনকে নির্দেশনা দিয়েছে।

তিনশ আসনে কত ইভিএম : ইসির কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতি ৫০০ পুরুষ ভোটারের জন্য একটি ও প্রতি ৪০০ নারী ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকক্ষ স্থাপন করা হয়। প্রতি দুই হাজার ৫০০ ভোটারের জন্য একটি করে ভোটকেন্দ্র করা হয়। ২ মার্চ পর্যন্ত দেশে ভোটার সংখ্যা ১১ কোটি ৩২ লাখ ৯১ হাজার ৭৬৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫ কোটি ৭৬ লাখ ৯৩ হাজার ১৯ ও নারী ভোটার ৫ কোটি ৫৫ লাখ ৯৮ হাজার ২৯৬ জন। এ হিসাব ধরা হলে আগামী নির্বাচনে ভোটকক্ষ হবে ২ লাখ ৫৪ হাজার ৩৮১টি। আর ভোটকেন্দ্র হবে ৪৫ হাজার ৩১৬টি। নির্বাচনে প্রতিটি কক্ষে একটি করে এবং প্রতিটি কেন্দ্রে একটি অতিরিক্ত ইভিএম রাখা হয়। এ হিসাবেই আগামী সংসদ নির্বাচনে দুই লাখ ৯৯ হাজার ৬৯৭টি ইভিএমের দরকার হবে। আরও জানা গেছে, নির্বাচন কমিশন ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রম শুরু করেছে। এতে আড়াই থেকে তিন শতাংশ নতুন ভোটার তালিকায় যুক্ত হবে বলে ইসি আশা করছে। নতুন ভোটার যুক্ত হলে আরও অন্তত সাত হাজার ইভিএম বেশি লাগবে। এছাড়া নির্বাচনের আগে মক ভোটিং ও নির্বাচনি কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণের জন্যও ইভিএম মেশিন লাগবে। সবমিলিয়ে আগামী নির্বাচনে সাড়ে তিন লাখ ইভিএম প্রয়োজন হবে বলে মনে করছেন ইসির কর্মকর্তারা। বর্তমানে ইসির হাতে রয়েছে এক লাখ ৫২ হাজার ৫৩৫টি।

জনবল প্রশিক্ষণ : নির্বাচনি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউশন সূত্রে জানা গেছে, ইভিএমের কোয়ালিটি কন্ট্রোল, কাস্টোমাইজেশন ও কারিগরি সমস্যা দূরকরণ-এ তিন ধরনের প্রশিক্ষিত জনবলের প্রয়োজন হয়। বর্তমানে ইসির প্রশিক্ষিত জনবল রয়েছে প্রায় ১৩ হাজার। আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনশ আসনে ইভিএম ব্যবহার হলে বর্তমানে যেসব নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহার করা হচ্ছে সেখানে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রের জন্য দুজন করে কারিগরি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তাদের রাখা হচ্ছে। এ হিসাব ধরা হলে আগামী নির্বাচনে এক লাখ কারিগরি প্রশিক্ষিত জনবলের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে প্রশিক্ষিত ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা রয়েছেন ১২ হাজারের কিছু বেশি। ইভিএম মেশিনে প্রতীক ও ভোটার তালিকা কাস্টোমাইজেশন বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি করে আসছে। সম্প্রতি ইসির নিজস্ব ৪০ কর্মকর্তাকে এ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আগামী সংসদ নির্বাচনে তিনশ আসনে ভোটগ্রহণ করতে হলে কয়েক হাজার কর্মকর্তাকে এ প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এছাড়া ইভিএমের কোয়ালিটি কন্ট্রোল সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে ইসির ৮০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে। এ সংখ্যা আরও বাড়াতে হবে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন