বৈষম্য কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
jugantor
আয়ের পরিসংখ্যান প্রশ্নবিদ্ধ
বৈষম্য কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ
জিডিপি আয় বৃদ্ধির সঙ্গে অর্থনীতির অন্যান্য সূচকের মিল নেই * আয়-সম্পদ-ভোগ ৩ খাতেই বৈষম্য রয়েছে

  মনির হোসেন  

১৪ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। সরকারি হিসাবে এখন মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৫ মার্কিন ডলার। এটি উচ্চ মধ্যম আয়ের কাছাকাছি। গত ৫ বছরে মাথাপিছু আয় বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈষম্য। আয় বেড়েছে কিছু মানুষের। আয়, সম্পদ ও ভোগ ৩টিতেই বৈষম্য রয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বৈষম্য কমানোর বিকল্প নেই। তারা বলছেন, সরকার মাথাপিছু আয় ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) যে তথ্য প্রকাশ করছে, তার সঙ্গে অর্থনীতির সূচকের মিল নেই। এছাড়াও বৈষম্য কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত সপ্তাহে মাথাপিছু আয় ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৫ ডলার ধরা হয়েছে। আগের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৫৯১ ডলার। করোনার মধ্যে যেখানে অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির ছিল, সেখানে আয় কীভাবে বাড়ল তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শীর্ষ স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য যুগান্তরকে বলেন, ‘মাথাপিছু আয় ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রাক্কলন করা হয়েছে, তা প্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে সমর্থিত নয়।’ এ প্রাসঙ্গিক তথ্য বেসরকারি বিনিয়োগ, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, ঋণের প্রবৃদ্ধি এবং কাঁচামাল আমদানি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে মারাত্মক ত্রুটি আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তারমতে দেশের আয়বৈষম্য যে বেড়েছে, সেটি খুব ভালোভাবেই সরকারের মাথাপিছু আয়ের তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে। আর এ জন্যই মানুষ মাথাপিছু আয়ের তথ্যের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পাচ্ছেন না।’

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অন্যদিকে অর্থনীতির ৯টি সূচকের মধ্যে রপ্তানি ছাড়া কোনোটিতে উল্লেখযোগ্য হয়নি। তিনি বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ আগের বছরের চেয়ে কমেছে। রপ্তানিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এটি ইতিবাচক। অন্য সূচকগুলোর ভালো অবস্থায় নেই। রেমিট্যান্স কমেছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়লেও তা খুবই সামান্য।

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে বড় সমস্যা হলো বৈষম্য। আয়ের অনুপাতে করদাতা বাড়ছে না। এখনও বাংলাদেশে কর জিডিপি রেশিও যা আছে, তা দ্বিগুণ বাড়তে পারে। আয় বাড়লে করদাতা বাড়বে।

তিনি বলেন, আয়বৈষম্য থাকলেও মাথাপিছু আয় যেভাবে আছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। তবে এই পরিমাণ আয় বাড়লে নতুন করে কিছু লোক করযোগ্য হয়েছে।

তিনি বলেন, করদাতার চিহ্নিতের ক্ষেত্রে এনবিআরের দুর্বলতা রয়েছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান মঙ্গলবার একনেক বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মানুষের কেনাকাটা অনেক বেড়েছে। গ্রামে গেলেই দেখা যায়, মানুষ কেনাকাটা করছে। তার মানে মানুষের আয় বেড়েছে। হতে পারে কারও কম বেড়েছে কিংবা কারও বেশি। তবে আয় বেড়েছে।’

অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বৈষম্যের কারণে এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ায় মাথাপিছু আয় বাড়লেও দেশের মানুষের প্রকৃত আয় কতটা বেড়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ।

জানা গেছে, মাথাপিছু আয়ের ৪টি খাত। কৃষি, শিল্প, সেবা এবং প্রবাসীদের আয় (রেমিট্যান্স)। অর্থাৎ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সঙ্গে রেমিট্যান্স যোগ করলে জাতীয় আয় পাওয়া যায়। আর জাতীয় আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুসারে দেশের প্রতি মানুষের মাথা পিছু আয় ২ হাজার ৮২৫ ডলার। প্রতি ডলার ৯০ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। এ হিসাবে গড়ে একজন নাগরিক প্রতিমাসে ২১ হাজার ১০০ টাকার উপরে আয় করেন। আজ যে শিশুটি জন্ম নিয়েছে তারও এই পরিমাণ আয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ের যে তথ্যের কথা বলা হচ্ছে, দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন সেভাবে হয়নি। কারণ কর্মসংস্থান হয়েছে কম। বিনিয়োগ প্রত্যাশিত নয়। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিও সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হার খুব কম। কৃষিতেও আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কমেছে। এসব কারণেই সরকারের অর্জনের তথ্য মাত্রাতিরিক্ত মনে হচ্ছে।

কোনো দেশের সম্পদ ও আয়ের অসমতা বোঝাতে গিনি গিনি কো ইফিশিয়েন্ট সূচক ব্যবহার করা হয়। এই সূচক যত বাড়বে, ওই দেশে বৈষম্য তত বেশি। বিবিএসে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশের গিনি কো-ইফিশিয়েন্ট ছিল শূন্য দশমিক ৪৮২, যা ২০১০ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৪৫৮।

ওই তথ্য অনুসারে ২০১৬ সালে দেশের ধনী শ্রেণির ৫ শতাংশ মানুষের আয় ছিল মোট আয়ের ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আর ২০১০ সালে যা ছিল ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে গরিব ৫ শতাংশ মানুষের আয় মোট আয়ের দশমিক ২৩ শতাংশ। কিন্তু ২০১০ সালে ৫ শতাংশ গরিবের আয় ছিল ৭৮ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ধনীদের আয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বিপরীতে কমছে গরিবের আয়। সম্পদ বৈষম্য আরও বেড়েছে।

২০১৬ সালে দেশের ধনী শ্রেণির ৫ শতাংশ মানুষের আয় ছিল, মোট আয়ের ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে দেশের মোট সম্পদের ৫১ দশমিক ৩২ ভাগ ছিল সর্বোচ্চ ধনী পাঁচ শতাংশের কাছে। আর ০.০৪ ভাগ ছিল সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচ ভাগের কাছে।

বিবিএসের হিসাব আরও বলছে, বর্তমানে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার মোট জনসংখ্যার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। এরমধ্যে অতি দরিদ্র ৭ শতাংশ। এদিকে আয় বাড়লেও কর আদায় বাড়েনি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশে টিআইএন রয়েছে ৭৩ লাখ। মাত্র ২৩ লাখ মানুষ আয়কর দেন। বর্তমানে কর আদায় জিডিপির ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় যা সবচেয়ে কম।

২০১০ সালে জিডিপিতে বড় ও মাঝারি শিল্পের অংশগ্রহণ ছিল ১৩ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু ২০১০ সালে জিডিপিতে ক্ষুদ্র শিল্পের অংশগ্রহণ ছিল ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর ২০১৮ সালে তা মাত্র ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ হয়েছে। এর অর্থ হলো, শিল্প খাত বড় ব্যবসায়ীদের দখলে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। সংস্থাটির তথ্য অনুসারে কোনো দেশের তিন বছর গড় মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬ ডলার ছাড়ালেই তা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পড়ে। এ হিসাবে বাংলাদেশ এই সীমা অনেক আগেই পার করেছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুসারে, মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬ ডলার থেকে শুরু করে যেসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার, তারা মধ্যম আয়ের দেশ। এর মধ্যে আবার আয় ১ হাজার ৪৬ ডলার থেকে ৪ হাজার ১২৫ পর্যন্ত হলে তা হবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ এবং আয় ৪ হাজার ১২৬ ডলার থেকে শুরু করে ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার হলে দেশগুলোকে বলা হয় উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। এর চেয়ে বেশি মাথাপিছু আয় হলে সেই দেশগুলোকে বলা হয় উচ্চ আয়ের দেশ। আর সংজ্ঞা অনুসারে বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

অন্যদিকে জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশে কর আদায় মাত্র ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ভারতে তা ১৮ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১৬ শতাংশ, চীনে ২৯ শতাংশ, মালদ্বীপ ২১ শতাংশ, পাকিস্তান ১৭ শতাংশ, নেপাল ১১.৫ শতাংশ, ১২ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুর ১৫ শতাংশ।

আয়ের পরিসংখ্যান প্রশ্নবিদ্ধ

বৈষম্য কমানোই বড় চ্যালেঞ্জ

জিডিপি আয় বৃদ্ধির সঙ্গে অর্থনীতির অন্যান্য সূচকের মিল নেই * আয়-সম্পদ-ভোগ ৩ খাতেই বৈষম্য রয়েছে
 মনির হোসেন 
১৪ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে। সরকারি হিসাবে এখন মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৫ মার্কিন ডলার। এটি উচ্চ মধ্যম আয়ের কাছাকাছি। গত ৫ বছরে মাথাপিছু আয় বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। তবে এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বৈষম্য। আয় বেড়েছে কিছু মানুষের। আয়, সম্পদ ও ভোগ ৩টিতেই বৈষম্য রয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যান নিয়ে প্রশ্ন তুলে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, বৈষম্য কমানোর বিকল্প নেই। তারা বলছেন, সরকার মাথাপিছু আয় ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) যে তথ্য প্রকাশ করছে, তার সঙ্গে অর্থনীতির সূচকের মিল নেই। এছাড়াও বৈষম্য কমিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) গত সপ্তাহে মাথাপিছু আয় ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে ২০২১-২২ অর্থবছর শেষে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় ২ হাজার ৮২৫ ডলার ধরা হয়েছে। আগের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় ছিল ২ হাজার ৫৯১ ডলার। করোনার মধ্যে যেখানে অর্থনৈতিক কার্যক্রম স্থবির ছিল, সেখানে আয় কীভাবে বাড়ল তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শীর্ষ স্থানীয় অর্থনীতিবিদরা।

জানতে চাইলে অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য যুগান্তরকে বলেন, ‘মাথাপিছু আয় ও জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে প্রাক্কলন করা হয়েছে, তা প্রাসঙ্গিক তথ্য দিয়ে সমর্থিত নয়।’ এ প্রাসঙ্গিক তথ্য বেসরকারি বিনিয়োগ, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন, ঋণের প্রবৃদ্ধি এবং কাঁচামাল আমদানি উল্লেখযোগ্য। এছাড়া সম্পদ বণ্টনের ক্ষেত্রে মারাত্মক ত্রুটি আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

তারমতে দেশের আয়বৈষম্য যে বেড়েছে, সেটি খুব ভালোভাবেই সরকারের মাথাপিছু আয়ের তথ্য থেকে বোঝা যাচ্ছে। আর এ জন্যই মানুষ মাথাপিছু আয়ের তথ্যের সঙ্গে নিজেদের মিল খুঁজে পাচ্ছেন না।’

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, অন্যদিকে অর্থনীতির ৯টি সূচকের মধ্যে রপ্তানি ছাড়া কোনোটিতে উল্লেখযোগ্য হয়নি। তিনি বলেন, বেসরকারি বিনিয়োগ আগের বছরের চেয়ে কমেছে। রপ্তানিতে কিছুটা প্রবৃদ্ধি হয়েছে। এটি ইতিবাচক। অন্য সূচকগুলোর ভালো অবস্থায় নেই। রেমিট্যান্স কমেছে। এছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবাহ বাড়লেও তা খুবই সামান্য।

তিনি বলেন, অর্থনীতিতে বড় সমস্যা হলো বৈষম্য। আয়ের অনুপাতে করদাতা বাড়ছে না। এখনও বাংলাদেশে কর জিডিপি রেশিও যা আছে, তা দ্বিগুণ বাড়তে পারে। আয় বাড়লে করদাতা বাড়বে।

তিনি বলেন, আয়বৈষম্য থাকলেও মাথাপিছু আয় যেভাবে আছে, তা অস্বীকার করা যাবে না। তবে এই পরিমাণ আয় বাড়লে নতুন করে কিছু লোক করযোগ্য হয়েছে।

তিনি বলেন, করদাতার চিহ্নিতের ক্ষেত্রে এনবিআরের দুর্বলতা রয়েছে।

পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান মঙ্গলবার একনেক বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মানুষের কেনাকাটা অনেক বেড়েছে। গ্রামে গেলেই দেখা যায়, মানুষ কেনাকাটা করছে। তার মানে মানুষের আয় বেড়েছে। হতে পারে কারও কম বেড়েছে কিংবা কারও বেশি। তবে আয় বেড়েছে।’

অর্থনীতিবিদ এবং বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশে বৈষম্যের কারণে এবং দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের কষ্ট বাড়ায় মাথাপিছু আয় বাড়লেও দেশের মানুষের প্রকৃত আয় কতটা বেড়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধ।

জানা গেছে, মাথাপিছু আয়ের ৪টি খাত। কৃষি, শিল্প, সেবা এবং প্রবাসীদের আয় (রেমিট্যান্স)। অর্থাৎ মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সঙ্গে রেমিট্যান্স যোগ করলে জাতীয় আয় পাওয়া যায়। আর জাতীয় আয়কে মোট জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু আয় পাওয়া যায়। সম্প্রতি প্রকাশিত তথ্য অনুসারে দেশের প্রতি মানুষের মাথা পিছু আয় ২ হাজার ৮২৫ ডলার। প্রতি ডলার ৯০ টাকা হিসাবে স্থানীয় মুদ্রায় যা ২ লাখ ৫৪ হাজার টাকা। এ হিসাবে গড়ে একজন নাগরিক প্রতিমাসে ২১ হাজার ১০০ টাকার উপরে আয় করেন। আজ যে শিশুটি জন্ম নিয়েছে তারও এই পরিমাণ আয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জিডিপি প্রবৃদ্ধি এবং মাথাপিছু আয়ের যে তথ্যের কথা বলা হচ্ছে, দেশের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন সেভাবে হয়নি। কারণ কর্মসংস্থান হয়েছে কম। বিনিয়োগ প্রত্যাশিত নয়। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিও সুবিধাজনক অবস্থানে নেই। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন হার খুব কম। কৃষিতেও আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি কমেছে। এসব কারণেই সরকারের অর্জনের তথ্য মাত্রাতিরিক্ত মনে হচ্ছে।

কোনো দেশের সম্পদ ও আয়ের অসমতা বোঝাতে গিনি গিনি কো ইফিশিয়েন্ট সূচক ব্যবহার করা হয়। এই সূচক যত বাড়বে, ওই দেশে বৈষম্য তত বেশি। বিবিএসে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে দেশের গিনি কো-ইফিশিয়েন্ট ছিল শূন্য দশমিক ৪৮২, যা ২০১০ সালে ছিল শূন্য দশমিক ৪৫৮।

ওই তথ্য অনুসারে ২০১৬ সালে দেশের ধনী শ্রেণির ৫ শতাংশ মানুষের আয় ছিল মোট আয়ের ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আর ২০১০ সালে যা ছিল ২৪ দশমিক ৬১ শতাংশ। কিন্তু ২০১৬ সালে গরিব ৫ শতাংশ মানুষের আয় মোট আয়ের দশমিক ২৩ শতাংশ। কিন্তু ২০১০ সালে ৫ শতাংশ গরিবের আয় ছিল ৭৮ শতাংশ। এর অর্থ হলো, ধনীদের আয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। বিপরীতে কমছে গরিবের আয়। সম্পদ বৈষম্য আরও বেড়েছে।

২০১৬ সালে দেশের ধনী শ্রেণির ৫ শতাংশ মানুষের আয় ছিল, মোট আয়ের ২৭ দশমিক ৮৯ শতাংশ। আলোচ্য সময়ে দেশের মোট সম্পদের ৫১ দশমিক ৩২ ভাগ ছিল সর্বোচ্চ ধনী পাঁচ শতাংশের কাছে। আর ০.০৪ ভাগ ছিল সবচেয়ে দরিদ্র পাঁচ ভাগের কাছে।

বিবিএসের হিসাব আরও বলছে, বর্তমানে দেশে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর হার মোট জনসংখ্যার ২০ দশমিক ৫ শতাংশ। এরমধ্যে অতি দরিদ্র ৭ শতাংশ। এদিকে আয় বাড়লেও কর আদায় বাড়েনি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ১৭ কোটি মানুষের দেশে টিআইএন রয়েছে ৭৩ লাখ। মাত্র ২৩ লাখ মানুষ আয়কর দেন। বর্তমানে কর আদায় জিডিপির ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। দক্ষিণ এশিয়ায় যা সবচেয়ে কম।

২০১০ সালে জিডিপিতে বড় ও মাঝারি শিল্পের অংশগ্রহণ ছিল ১৩ দশমিক ১২ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা ১৮ দশমিক ৩১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। কিন্তু ২০১০ সালে জিডিপিতে ক্ষুদ্র শিল্পের অংশগ্রহণ ছিল ৩ দশমিক ৩০ শতাংশ। আর ২০১৮ সালে তা মাত্র ৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ হয়েছে। এর অর্থ হলো, শিল্প খাত বড় ব্যবসায়ীদের দখলে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাবে বাংলাদেশ এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। সংস্থাটির তথ্য অনুসারে কোনো দেশের তিন বছর গড় মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬ ডলার ছাড়ালেই তা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশে পড়ে। এ হিসাবে বাংলাদেশ এই সীমা অনেক আগেই পার করেছে।

সংস্থাটির তথ্য অনুসারে, মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৬ ডলার থেকে শুরু করে যেসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার, তারা মধ্যম আয়ের দেশ। এর মধ্যে আবার আয় ১ হাজার ৪৬ ডলার থেকে ৪ হাজার ১২৫ পর্যন্ত হলে তা হবে নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ এবং আয় ৪ হাজার ১২৬ ডলার থেকে শুরু করে ১২ হাজার ৭৩৬ ডলার হলে দেশগুলোকে বলা হয় উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ। এর চেয়ে বেশি মাথাপিছু আয় হলে সেই দেশগুলোকে বলা হয় উচ্চ আয়ের দেশ। আর সংজ্ঞা অনুসারে বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।

অন্যদিকে জিডিপির অনুপাতে বাংলাদেশে কর আদায় মাত্র ৯ দশমিক ৪ শতাংশ। ভারতে তা ১৮ শতাংশ, মালয়েশিয়ায় ১৬ শতাংশ, চীনে ২৯ শতাংশ, মালদ্বীপ ২১ শতাংশ, পাকিস্তান ১৭ শতাংশ, নেপাল ১১.৫ শতাংশ, ১২ শতাংশ এবং সিঙ্গাপুর ১৫ শতাংশ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন