শতকোটি টাকার সম্পত্তি বেদখল
jugantor
কুষ্টিয়ায় নির্বাহী প্রকৌশলীর ভবন অবরুদ্ধ
শতকোটি টাকার সম্পত্তি বেদখল

  এ এম জুবায়েদ রিপন, কুষ্টিয়া  

২২ মে ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বেদখল

কুষ্টিয়ায় শত কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি দখল করে রেখেছে একটি প্রভাবশালী চক্র। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে শহরের জিরো পয়েন্টের রেনউইক মোড়ের প্রায় সাড়ে তিন একর সম্পত্তি দখল করে সন্ত্রাসী বাহিনীর পাহারা বসানো হয়েছে। আইনের ফাঁক গলিয়ে ভূমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কতিপয় ব্যক্তির যোগসাজশে এসব করা হচ্ছে। জালিয়াত চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল, জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী ছাড়াও বিভিন্ন পেশার অসৎ মানুষ জড়িত।

১৯৬২ সালে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মজমপুর মৌজার রেনউইক মোড়ের প্রায় সাড়ে তিন একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। অধিগ্রহণ করা সম্পত্তিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর বাসভবন এবং প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পরীক্ষাগার রয়েছে। কিন্তু এ বছর ১০ এপ্রিল সরকারি অবকাঠামো ভেঙে টিনের বেড়া দিয়ে অবরুদ্ধ করে পাহারা বসিয়েছে প্রভাবশালী চক্রটি। ৫০ বছর আগে এক নিঃসন্তান হিন্দু নারীর ওয়ারিশান সেজে আদালত থেকে রায় নিয়ে দখলবাজিতে নেমেছে চক্রটি। ওই নারীর কথিত ওয়ারিশান সুকুমার দাস ও অপূর্ব কুমার দাসকে সামনে রেখে স্থানীয় সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহিনীর হোতা রাজু মেম্বার ও মুন্না সরকারি সম্পত্তি অবরুদ্ধ করেছে।

কুষ্টিয়ায় দেওয়ানি আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) আসম আখতারুজ্জামান মাসুম জানান, জালিয়াতির বিষয়টি আদালতের নজরে এনে রায় বাতিলের আবেদন করেছি। আদালত আবেদন আমলে নিয়ে জালিয়াত চক্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তার কারণ দর্শাও নোটিশ দিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইব্রাহিম মো. তৈমুর জানান, এক নিঃসন্তান হিন্দু নারীর ওয়ারিশান সেজে আদালত থেকে রায় নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবন এবং সদ্য নির্মিত পরীক্ষাগার অবরুদ্ধ করেছে চক্রটি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, অধিগ্রহণ করা জমির মধ্যে ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো অবকাঠামো থাকার প্রশ্নই উঠে না।

সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর ও দখলের সত্যতা স্বীকার করে স্থানীয় ১নং পৌর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাঈমুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন আনুমানিক রাত সাড়ে ৮টার দিকে বেশকয়েক লোক জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবনের দেয়াল ভাঙচুর করে টিনের বেড়া দেয়। তৎক্ষণাৎ লোকজন নিয়ে সেটা প্রতিরোধের চেষ্টা করি। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করি।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ওই সম্পত্তির মালিক রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার ৫নং মাছপাড়া ইউনিয়নের বরুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুধীর কুমার দাসের স্ত্রী নিঃসন্তান সুপ্রতিবালা দাস। এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য সনৎ কুমারের সহায়তায় সুপ্রতিবালা দাসের দেবর সুপ্রভাত দাসের ছেলে সুকুমার দাস ও অপূর্ব কুমার দাস কাগজপত্র তৈরি করে ওই সম্পত্তির বৈধ ওয়ারিশ দাবি করে দেওয়ানি আদালতে মামলা করেন। মামলার এজাহারে ৫০ বছর আগে থেকে ওই সম্পত্তি সরকারি ভবন হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এসব উল্লেখ করা হয়নি। সম্পত্তিটি ‘খ’ তপশিলভুক্ত (অর্পিত সম্পত্তি) হিসাবে দাবি করে নিজেদের বাড়িঘর এবং দখলস্বত্ব বহাল আছে বলে উল্লেখ করা হয়। এ ব্যাপারে জানতে পাংশা উপজেলার বরুড়িয়ার বাড়িতে গেলে দুই ভাই সাংবাদিক পরিচয় জানার পর বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। তবে অন্য একজনের মোবাইল ফোন থেকে তাদের একজন মুন্নার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। সরকারি সম্পত্তি দখলের সঙ্গে জড়িত রাজু মেম্বার ও মুন্না মোবাইল ফোনে জানান, সম্পত্তি দখলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাসদ নেতা জিল্লুর রহমান। ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন দাবি করে সদর উপজেলার ১নং হাটশ হরিপুর ইউপি সদস্য রাজু জানান, মুন্না তার দীর্ঘদিনের বন্ধু। সেদিন ওখানে গিয়ে জানতে পারি জমি দখলের বিষয়টি। সরকারি সম্পত্তি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে একই গ্রামের মুন্না বলেন, ওই জমির মালিক নিজেই লোকজন নিয়ে দেওয়াল ভেঙে টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। জমির মালিকরা আমাকে ডাকায় আমি সেখানে গিয়েছিলাম।

কুষ্টিয়া জেলা জাসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান বলেন, ঘটনার দিন আমি ঢাকায় ছিলাম, হঠাৎ মুন্না আমাকে ফোন করে জানায় জমি সংক্রান্ত বিষয়ে নাঈমুল কমিশনার ঝামেলা করছেন। আমার কাছে তিনি সাহায্য চান। জিল্লুর রহমান আরও জানান, কমিশনার নাঈমুলকে ফোন করে বলেছিলাম, কুষ্টিয়ায় এসে সব ঠিক করে দেব। তিনি আরও বলেন, এছাড়া মুন্না যে সরকারি জমি দখল করতে গেছেন সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।

কুষ্টিয়ায় নির্বাহী প্রকৌশলীর ভবন অবরুদ্ধ

শতকোটি টাকার সম্পত্তি বেদখল

 এ এম জুবায়েদ রিপন, কুষ্টিয়া 
২২ মে ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
বেদখল
কুষ্টিয়ায় টিনের বেড়া দিয়ে দখল করা জনস্বাস্থ্য বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবন। শনিবারের ছবি -যুগান্তর

কুষ্টিয়ায় শত কোটি টাকার সরকারি সম্পত্তি দখল করে রেখেছে একটি প্রভাবশালী চক্র। ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে শহরের জিরো পয়েন্টের রেনউইক মোড়ের প্রায় সাড়ে তিন একর সম্পত্তি দখল করে সন্ত্রাসী বাহিনীর পাহারা বসানো হয়েছে। আইনের ফাঁক গলিয়ে ভূমি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কতিপয় ব্যক্তির যোগসাজশে এসব করা হচ্ছে। জালিয়াত চক্রের সঙ্গে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল, জনপ্রতিনিধি, আইনজীবী ছাড়াও বিভিন্ন পেশার অসৎ মানুষ জড়িত।

১৯৬২ সালে কুষ্টিয়া সদর উপজেলার মজমপুর মৌজার রেনউইক মোড়ের প্রায় সাড়ে তিন একর জমি অধিগ্রহণ করে সরকার। অধিগ্রহণ করা সম্পত্তিতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলীর বাসভবন এবং প্রায় ২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত পরীক্ষাগার রয়েছে। কিন্তু এ বছর ১০ এপ্রিল সরকারি অবকাঠামো ভেঙে টিনের বেড়া দিয়ে অবরুদ্ধ করে পাহারা বসিয়েছে প্রভাবশালী চক্রটি। ৫০ বছর আগে এক নিঃসন্তান হিন্দু নারীর ওয়ারিশান সেজে আদালত থেকে রায় নিয়ে দখলবাজিতে নেমেছে চক্রটি। ওই নারীর কথিত ওয়ারিশান সুকুমার দাস ও অপূর্ব কুমার দাসকে সামনে রেখে স্থানীয় সন্ত্রাসী ক্যাডার বাহিনীর হোতা রাজু মেম্বার ও মুন্না সরকারি সম্পত্তি অবরুদ্ধ করেছে।

কুষ্টিয়ায় দেওয়ানি আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) আসম আখতারুজ্জামান মাসুম জানান, জালিয়াতির বিষয়টি আদালতের নজরে এনে রায় বাতিলের আবেদন করেছি। আদালত আবেদন আমলে নিয়ে জালিয়াত চক্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না তার কারণ দর্শাও নোটিশ দিয়েছেন।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী ইব্রাহিম মো. তৈমুর জানান, এক নিঃসন্তান হিন্দু নারীর ওয়ারিশান সেজে আদালত থেকে রায় নিয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবন এবং সদ্য নির্মিত পরীক্ষাগার অবরুদ্ধ করেছে চক্রটি। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, অধিগ্রহণ করা জমির মধ্যে ব্যক্তি মালিকানাধীন কোনো অবকাঠামো থাকার প্রশ্নই উঠে না।

সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর ও দখলের সত্যতা স্বীকার করে স্থানীয় ১নং পৌর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাঈমুল ইসলাম বলেন, ঘটনার দিন আনুমানিক রাত সাড়ে ৮টার দিকে বেশকয়েক লোক জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর বাসভবনের দেয়াল ভাঙচুর করে টিনের বেড়া দেয়। তৎক্ষণাৎ লোকজন নিয়ে সেটা প্রতিরোধের চেষ্টা করি। পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে বিষয়টি অবহিত করি।

মামলা সূত্রে জানা যায়, ওই সম্পত্তির মালিক রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার ৫নং মাছপাড়া ইউনিয়নের বরুরিয়া গ্রামের বাসিন্দা সুধীর কুমার দাসের স্ত্রী নিঃসন্তান সুপ্রতিবালা দাস। এলাকার ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) সদস্য সনৎ কুমারের সহায়তায় সুপ্রতিবালা দাসের দেবর সুপ্রভাত দাসের ছেলে সুকুমার দাস ও অপূর্ব কুমার দাস কাগজপত্র তৈরি করে ওই সম্পত্তির বৈধ ওয়ারিশ দাবি করে দেওয়ানি আদালতে মামলা করেন। মামলার এজাহারে ৫০ বছর আগে থেকে ওই সম্পত্তি সরকারি ভবন হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে এসব উল্লেখ করা হয়নি। সম্পত্তিটি ‘খ’ তপশিলভুক্ত (অর্পিত সম্পত্তি) হিসাবে দাবি করে নিজেদের বাড়িঘর এবং দখলস্বত্ব বহাল আছে বলে উল্লেখ করা হয়। এ ব্যাপারে জানতে পাংশা উপজেলার বরুড়িয়ার বাড়িতে গেলে দুই ভাই সাংবাদিক পরিচয় জানার পর বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। তবে অন্য একজনের মোবাইল ফোন থেকে তাদের একজন মুন্নার সঙ্গে কথা বলতে বলেন। সরকারি সম্পত্তি দখলের সঙ্গে জড়িত রাজু মেম্বার ও মুন্না মোবাইল ফোনে জানান, সম্পত্তি দখলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন জাসদ নেতা জিল্লুর রহমান। ঘটনার সঙ্গে জড়িত নন দাবি করে সদর উপজেলার ১নং হাটশ হরিপুর ইউপি সদস্য রাজু জানান, মুন্না তার দীর্ঘদিনের বন্ধু। সেদিন ওখানে গিয়ে জানতে পারি জমি দখলের বিষয়টি। সরকারি সম্পত্তি দখলের অভিযোগ অস্বীকার করে একই গ্রামের মুন্না বলেন, ওই জমির মালিক নিজেই লোকজন নিয়ে দেওয়াল ভেঙে টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। জমির মালিকরা আমাকে ডাকায় আমি সেখানে গিয়েছিলাম।

কুষ্টিয়া জেলা জাসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জিল্লুর রহমান বলেন, ঘটনার দিন আমি ঢাকায় ছিলাম, হঠাৎ মুন্না আমাকে ফোন করে জানায় জমি সংক্রান্ত বিষয়ে নাঈমুল কমিশনার ঝামেলা করছেন। আমার কাছে তিনি সাহায্য চান। জিল্লুর রহমান আরও জানান, কমিশনার নাঈমুলকে ফোন করে বলেছিলাম, কুষ্টিয়ায় এসে সব ঠিক করে দেব। তিনি আরও বলেন, এছাড়া মুন্না যে সরকারি জমি দখল করতে গেছেন সে বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন