‘অলআউট’ অভিযানে সর্বোচ্চ সতর্কতা

একরাম হত্যার তদন্তে অগ্রগতি নেই * তালিকাভুক্ত সহস্রাধিক গডফাদার ও আড়াই হাজার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ১৩৮ * বিশেষ অভিযানে সোমবার পর্যন্ত গ্রেফতার ১৭ হাজার; অনেকেই তালিকার বাইরের * সীমান্তে বসছে সার্ভেইলেন্স ডিভাইস ও সিসি ক্যামেরা

  সিরাজুল ইসলাম ০৫ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাকবিরোধী অভিযান
ছবি: যুগান্তর

সারা দেশে মাদকবিরোধী ‘অলআউট’ অভিযানে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করা হচ্ছে। এ কারণে ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনাও কমে এসেছে। অভিযানের শুরুতে দিনে ৮-১০টি বা তার চেয়ে বেশি বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা ঘটলেও ১ জুনের পর এর সংখ্যা ২-৩ জনে নেমে আসে।

শনিবার রাত থেকে রোববার পর্যন্ত দুটি ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটেছে। রোববার রাত থেকে সোমবার পর্যন্ত সারা দেশের কোথাও কোনো ‘বন্দুকযুদ্ধের’ খবর পাওয়া যায়নি। এদিকে চলমান মাদকবিরোধী আন্দোলনকে সামাজিক অন্দোলনে রূপ দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মসজিদে জুমার নামাজের খুতবার পর মাদকবিরোধী বিশেষ বয়ানের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মন্দির ও অন্যান্য উপাসনালয়েও মাদকবিরোধী আলোচনা হবে।

মাদকের চাহিদা বন্ধ করতে পরিবার থেকে শুরু করে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বন্ধু-বান্ধব, সহকর্মী সবাইকে সচেতন করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যারা এরই মধ্যে নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, তাদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থার কথা ভাবা হচ্ছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট একাধিক দফতর সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

সংশ্লিষ্ট দফতর থেকে জানা যায়, মাদক পাচার রোধে কক্সবাজার সীমান্তের ১১ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে সার্ভাইলেন্স ডিভাইস ও সিসি ক্যামেরা বসানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। মাদক নির্মূলে জাতিসংঘের সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে সোমবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল যুগান্তরকে বলেন, মাদক নির্মূলে জাতিসংঘের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে জাতিসংঘের ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইম বিভাগ কাজও শুরু করেছে।

একাধিক সূত্র জানায়, বিশেষ অভিযানের লক্ষ্যে র‌্যাব, পুলিশ, বিজিবি, এনএসআই ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর মাদকের সহস্রাধিক গডফাদার এবং আড়াই হাজারের বেশি শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর পৃথক তালিকা তৈরি করে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগেও তালিকা হয়। এসব তালিকার সমন্বয়ে একটি সমন্বিত তালিকা তৈরি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই তালিকা অনুযায়ী গত ৪ মে থেকে বিশেষ অভিযান শুরু করে র‌্যাব।

১৪ মে র‌্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদের সংবাদ সম্মেলনে এ নিয়ে বিশেষ ঘোষণার পর এ বাহিনীর অভিযান জোরালো হয়। র‌্যাবের বিশেষ অভিযানে প্রথম ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটে ১৫ মে। এর তিন দিন পর ১৮ মে থেকে সারা দেশে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান শুরু করে পুলিশ। এরই মধ্যে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে প্রায় ৩০০ জনের একটি তালিকা দিয়ে তাদের বিরুদ্ধে ঈদের আগেই চূড়ান্ত ব্যবস্থা নিতে র‌্যাব-পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেয়া হয়।

র‌্যাব পুলিশের এ অলআউট অভিযানে তালিকায় থাকা ১৩৮ জন ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭ মে টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক নিহত হন। এ ঘটনার পর ৩১ মে একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম কক্সবাজার প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করেন।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি একরাম নিহতের ঘটনার অডিও রেকর্ড প্রকাশ করেন। এরপর ১ জুন সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের কাছে অভিযান নিয়ে বিশেষ বার্তা দেয়া হয়। এতে বলা হয়, এ মুহূর্তে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেয়া একেবারে বন্ধ করে দেয়া হলে নানা প্রশ্ন উঠবে। তাই সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করে অভিযান পরিচালনা করতে হবে।

এদিকে মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযানের কারণে তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ীদের বেশিরভাগই গা-ঢাকা দিয়েছে। তাই তালিকার বাইরে থেকে গ্রেফতার করা হচ্ছে অনেককে। সোমবার পর্যন্ত র‌্যাব ও পুলিশের হাতে প্রায় ১৭ হাজার মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবী গ্রেফতার হয়েছে। এর মধ্যে সোমবার পর্যন্ত র‌্যাব ৩ হাজার ৬৬৬ জনকে গ্রেফতার করেছে। রোববার পর্যন্ত পুলিশ গ্রেফতার করেছে ১২ হাজার ৯১২ জনকে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, টেকনাফের কাউন্সিলর ও উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি একরামুল হক নিহতের ঘটনায় তদন্তে কোনো অগ্রগতি হয়নি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি নিয়ে একটি কমিটি হয়েছে বলে শুনেছি। এর বেশি কিছু বলতে পারব না। বিস্তারিত জানতে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করুন।

পুলিশ সদর দফতরের অতিরিক্ত ডিআইজি (ইন্টেলিজেন্স অ্যান্ড স্পেশাল অ্যাফেয়ার্স) মনিরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, কাউন্সিলর একরাম নিহতের ঘটনায় পুলিশের পক্ষে এখনও কমিটি গঠন করা হয়নি। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো নির্দেশনাও আসেনি। বিষয়টি র‌্যাব দেখছে।

এক প্রশ্নের জবাবে গোয়েন্দা কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান বলেন, সীমান্তের যেসব অংশে কাঁটাতারের বেড়া নেই, সেসব অংশে দ্রুত বেড়া নির্মাণ এবং যে নদীপথ দিয়ে ইয়াবা আসে সে জায়গা সিল করে দেয়ার চিন্তা-ভাবনা চলছে।

কক্সবাজারের পুলিশ সুপার ড. একেএম ইকবাল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, একরাম নিহতের ঘটনায় মন্ত্রণালয় কোনো কমিটি গঠন করে থাকলেও তা আমি জানি না। তবে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো কমিটি করা হয়নি। চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের বিকল্প কী হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদীর ৫৪ কিলোমিটার এলাকার স্থলভাগে বাউন্ডারি দেয়ার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে।

নাফনদী এলাকার সীমান্ত যেরকম অরক্ষিত, সেরকম অরক্ষিত সীমান্ত পৃথিবীর কোথাও নেই। মাদক নিয়ন্ত্রণে কোস্টগার্ড, বিজিবিসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য সংখ্যা বাড়ানো উচিত। তিনি বলেন, ইয়াবাসহ মাদক নৌপথে চট্টগ্রাম হয়ে বরিশালে চলে যাচ্ছে। এ বিষয়ে জাতিসংঘকে এগিয়ে আসতে হবে উল্লেখ করে ড. ইকবাল হোসেন আরও বলেন, বাংলাদেশ যেমন জাতিসংঘের সদস্য, মিয়ানমারও তেমনি সদস্য। তাই জাতিসংঘের অফিস অন ড্রাগ অ্যান্ড ক্রাইমকে সম্পৃক্ত করা উচিত।

র‌্যাব আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, একরাম নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্তে উল্লেখ করার মতো কোনো অগ্রগতি হয়নি। কেবল রোববার একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির সবাই র‌্যাব সদস্য। এর বেশি কিছু এ মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তিনি বলেন, মাদক নির্মূল বা নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে চলমান অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি মোটিভেশন ও জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে মুফতি মাহমুদ খান বলেন, সীমান্ত দিয়ে মাদক আসা বন্ধ হলে অভিযানেরই আর দরকার হবে না। তিনি আরও বলেন, ক্রমাগত অভিযানের কারণে অস্ত্রধারী মাদক ব্যবসায়ীরা পালিয়ে গেছে। এ কারণে কয়েকদিন ধরে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা কম ঘটছে।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অতিরিক্ত মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মজিবুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সীমান্ত এলাকায় বাউন্ডারি নির্মাণ করা সম্ভব নয়। তবে কক্সবাজার সীমান্ত এলাকার ১১ কিলোমিটারজুড়ে অত্যাধুনিক সার্ভাইলেন্স ডিভাইস স্থাপন করার প্রক্রিয়া চলছে। এর পাশাপাশি গোটা এলাকা সিসি ক্যামেরার নিয়ন্ত্রণে আনার কথাও ভাবা হচ্ছে। এটা হলে ওই এলাকায় যে কোনো মানুষের মুভমেন্ট চিহ্নিত করা সহজ হবে। এতে কেবল মাদক নয়, নারী ও শিশু পাচার এবং অস্ত্র ও গুলি পাচারসহ যে কোনো ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সীমান্ত এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের বিষয়টি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের ব্যাপার।

অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেবল মে মাসেই সীমান্ত এলাকা থেকে বিজিবি ৭ লাখ ৬৬ হাজার ৮২৮ পিস ইয়াবা উদ্ধার করেছে। তাছাড়া একই সময়ে বিজিবি ৫ হাজার ৭৬ বোতল বিদেশি মদ, ২৭১ লিটার বাংলা মদ, ১ হাজার ৯৯৩ ক্যান বিয়ার, ২৮ হাজার ৭৩০ বোতল ফেনসিডিল, ১ হাজার ৩৯০ কেজি গাঁজা, ১ কেজি ২৫০ গ্রাম হেরোইন, ১ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬৩টি অ্যানেগ্রা ও সেনেগ্রা ট্যাবলেট এবং ৬ লাখ ২৪ হাজার ৭৩০টি নেশাজাতীয় ইনজেকশনসহ বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য উদ্ধার করেছে। এ থেকে বোঝা যায়, বিজিবি সদস্যরা দায়িত্ব পালনে যথেষ্ট তৎপর।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মজিবুর রহমান বলেন, মাদকবিরোধী বিশেষ অভিযান চালু রাখার পাশাপাশি সবাইকে মাদকের বিষয়ে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করতে হবে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিচালক তৌফিক উদ্দিন চৌধুরী বলেন, চলমান মাদকবিরোধী অভিযানের কারণে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীরা গা-ঢাকা দিয়েছে। সীমান্ত সুরক্ষা করতে বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে অধিকতর শক্তিশালী করা প্রয়োজন বলেও তিনি মনে করেন।

কোস্টগার্ডের পরিচালক আবদুল্লাহ আল মারুফ বলেন, মাদকের চাহিদা বন্ধ হলে দেশে আর মাদক আসবে না। কিন্তু চাহিদা বন্ধ করা না গেলে বাইরে থেকে মাদক আসা বন্ধ করেও লাভ হবে না। কারণ চাহিদার প্রয়োজনে দেশেও মাদক তৈরি হতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নৌপথ সুরক্ষায় কোস্টগার্ডের জনবল বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।

ঘটনাপ্রবাহ : মাদকবিরোধী অভিযান ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter