দুর্গম অঞ্চলে খাদ্য পানি ও স্বাস্থ্যসেবা সংকট
jugantor
বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি
দুর্গম অঞ্চলে খাদ্য পানি ও স্বাস্থ্যসেবা সংকট
জেগে উঠছে ভাঙাচোরা সড়ক পথঘাট, দেখা দিয়েছে নদীভাঙন * ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত রোগবালাই

  যুগান্তর ডেস্ক  

২৬ জুন ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

সংকট

সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়েছে। তবে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার চরম সংকট। বাসিন্দারা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। শিশু খাদ্যের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে তারা। এছাড়া নেই গো-খাদ্য। গবাদি পশু-পাখি নিয়েও বিপাকে পড়েছেন অনেকে। এদিকে পানি নেমে যাওয়ায় ভাঙাচোরা সড়ক-পথঘাট জেগে উঠছে। কোথাও কোথাও তীব্র নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। অনেকের ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও এখনো বসবাসের উপযোগী হয়নি। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা এখনো বিচ্ছিন্ন। এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। খাবার সংকটে হাহাকার দেখা দিয়েছে প্রত্যন্ত এলাকায়।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের মেডিকেল টিম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে যাতে পানিবাহিত রোগবালাই ছড়িয়ে না পড়ে। বন্যাপরবর্তী পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানির কারণে চর্মরোগ ও ডায়রিয়া বেশি ছড়াতে পারে। এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানায়, দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় তিস্তা অববাহিকা বাদে দেশের অভ্যন্তরে এবং উজানের বিভিন্ন অংশে ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণের সম্ভাবনা কম। এই সময়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা, ধরলা, দুধকুমার এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সব প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস অব্যাহত থাকবে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় একদিকে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও জামালপুর অন্যদিকে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের নিম্নাঞ্চলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।

ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সিলেট, গোলাপগঞ্জ ও বালাগঞ্জ : সিলেটে বন্যাদুর্গত এলাকায় এতদিন যে যার মতো করে ত্রাণ বিতরণ করলেও অবশেষে সমন্বয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বিশেষ করে যাতায়াত সুবিধাজনক এলাকার লোকজন দফায় দফায় ত্রাণ পাচ্ছিল। কিন্তু দুর্গম যাতায়াতে থাকা পানিবন্দিরা এসব ত্রাণের দেখা পাননি। শুক্রবার ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন সমন্বয় করতে উপজেলাভিত্তিক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় সিলেট বিভাগীয় প্রশাসন। সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) দেবজিৎ সিংহ এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিটি উপজেলায় ত্রাণের একটি করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সিলেট নগরীর তালতলা, জামতলা, মণিপুরি রাজবাড়ি, যতরপুর, মিরাবাজার, শাহজালাল উপশহর, মেন্দিবাগ, ছড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দাদের ঘরের পাশে বন্যার পানিতে বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা ভেসে এসে জড়ো হয়েছে। জমে থাকা পানিতে জন্ম নিয়েছে মশাসহ নানা কীটপতঙ্গ। এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ব্লিচিং পাউডার দিয়ে বাসা-বাড়ি পরিষ্কার করছেন। আসবাবপত্র ধোয়ামোছার কাজও চলছে।

বালাগঞ্জে পানিবন্দি পরিবারগুলো অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছেন। আশ্রয় কেন্দ্রে সরকারি-বেসরকারিভাবে শুকনো খাবার ও কিছু ত্রাণ সামগ্রী দেওয়া হলেও গ্রামে ত্রাণ নিয়ে কেউ যাচ্ছেন না। গ্রামের দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। পানিবন্দি লোকজন বলছেন, নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে লোক দেখানো শুকনো খাবার বিতরণের নামে ফটোসেশনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকে। যারা যৎসামান্য ত্রাণ পাচ্ছে তারা বারবার পাচ্ছে, কিন্তু আমাদের দেখতে কেউই আসছেন না। এদিকে, বন্যার পানির তোড়ে বালাগঞ্জ-তাজপুর সড়কের কাশিপুর ব্রিজের সংযোগস্থলে সড়কে ফাটল দেখা দিয়ে বেশ কিছু অংশ দেবে গেছে। যে কোনো সময় ভয়াবহ ভাঙন হতে পারে।

গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা, শরীফগঞ্জ, বুধবারীবাজার, বাদেপাশা, ভাদেশ্বর, আমুড়াসহ কয়েকটি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম এখনো পানিতে টইটুম্বুর। এসব এলাকার বহু পরিবার এখনো পানিবন্দি। বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেক জায়গায় ডায়রিয়া আমাশয়সহ বিভিন্ন রোগবালাই দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রাম : জেলায় অনেকের ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও সেগুলো বসবাসের উপযোগী হয়নি। দেখা দিয়েছে তীব্র নদী ভাঙন। গ্রামীণ ও চরের রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় যাতায়াতে ভোগান্তি বেড়েছে। সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগ বানভাসিদের দুর্ভোগ কমাতে পারেনি। অনেক চরাঞ্চলে এখনো ত্রাণ পৌঁছেনি। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার এবং গো-খাদ্যের তীব্র সংকট। বন্ধ হয়ে যাওয়া ৩২৫টি স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক আব্দুর রশিদ জানিয়েছেন, বন্যায় জেলায় প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৭ হাজার কৃষক। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা হবে।

নদী ভাঙা মানুষের বিলাপ : ব্রহ্মপুত্র নদের পেটে অবস্থিত হকের চর। নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ব্যাপক ভাঙন। দুদিনে এখানকার ৯টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। সেখানকার আমিনুল মিস্ত্রির স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, এখন হাতে কোনো কাজ নেই। নতুন চরে যাচ্ছি যদি কেউ কোনো খাওয়ন দেয় তো পেটে দানাপানি পড়বে, না হলে উপোস করা ছাড়া উপায় নেই।

উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের পেটে অবস্থিত বাবুর চর। এখানকার কৃষি শ্রমিক সাইফুলের স্ত্রী আনিছা বলেন, ‘বানের পানিত ভাইসপার নাগছি গত ১৫ দিন থাকি। একবেলা খাই একবেলা উপোস করি। ছোট তিনটা ছাওয়া নিয়া বিপদে আছি। ওমরা তো অভাব বোঝে না। খালি খাবার চায়। কিন্তু ঘরত তো খাওয়ন নাই। আইজ সকালে তিন ভাইবোন এক মুট করি পন্তা খায়া আছে। আমরা দুই মানুষ এক মুট চিরা খায়া আছি।’

হাতিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল হোসেন বলেন, অপ্রতুল ত্রাণ সহায়তার কারণে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। দুর্গম চরাঞ্চলের অবস্থা খুবই খারাপ।

জগন্নাথপুরে ত্রাণের জন্য হাহাকার : জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, জগন্নাথপুর-সিলেট সড়ক, জগন্নাথপুর-সুনামগঞ্জ সড়কসহ উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের সব সড়ক পানিতে নিমজ্জিত। কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও উপজেলার অধিকাংশ গ্রামে ৯ দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। উপজেলা সদরে পানি কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার বাড়িঘরে এখনো ঊরু থেকে হাঁটু সমান পানি। জগন্নাথপুর বাজারের বিভিন্ন গলি পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যাদুর্গতদের মাঝে খাবারের জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে।

নলুয়া হাওড়বেষ্টিত চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, শ’ শ’ পরিবার এখনো আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন। পানি কিছুটা কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই মানুষের। বন্যা দুর্গতরা প্রয়োজনীয় ত্রাণ পাচ্ছে না। অন্যদিকে ডাকাতের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।

‘সব শুকনা ধান পইচা গেছে, অহন কি খাইয়া বাচবাম’: নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, কৃষক আলাল উদ্দিন এবার ১৫০ শতক জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। গেলবারের বন্যার সময় অর্ধেক খেতের ধান কেটে ঘরে তুলতে পেরেছিলেন। বাকি ধান পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। এবারের বন্যায় ছয়দিন ধরে তার ঘরের মাচার ধান ও পুঞ্জির খড় পানিতে ডুবে ছিল। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের ওই কৃষক যুগান্তরকে বলেন, ‘এই ধান দিয়াই আমার দুই ছেলের ইস্কুলের খরচসহ সারা বছরের সংসার খরচ চলে। এবারের বন্যায় আমার সব শেষ। যে ধান কাইট্টা শুকাইয়া ঘরে তুলছিলাম, তাও শেষ। অহন এই পচা ধান, খের আর দুইডা গরু ছাড়া কিছুই নাই। অহন কি খাইয়া বাচবাম?’

জেলার দশ উপজেলার ৭৩টি ইউনিয়নে ৫ লাখ ৫৪ হাজার মানুষ বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ৩৫৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় সোয়া লাখ মানুষ আশ্রয় নেয়। পানি কমতে শুরু করায় ধীরে ধীরে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে শুরু করেছে বানভাসিরা।

ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) : টাঙ্গাইল সদর, ভূঞাপুর, নাগরপুর গোপালপুর, দেলদুয়ার, বাসাইল ও কালিহাতী উপজেলার শতাধিক গ্রামের বানভাসি মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এছাড়া জেলায় ৬ হাজার হেক্টর জমির ফসলও তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগের শিকার বহু পানিবন্দি মানুষ। খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও শিশু খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। অনেকে পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এদিকে গো-খাদ্যের সংকটে দিশেহারা চরাঞ্চলের মানুষগুলো। সরেজমিন ভূঞাপুর উপজেলার যমুনা চরাঞ্চলের গাবসারা, গোবিন্দাসী, অর্জুনা ও নিকরাইল ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে যায়, অনেকের মাটির চুলা, গবাদিপশুর রাখার স্থান, টয়লেট, টিওবওয়েল ডুবে গেছে। পরিবারগুলো আশ্রয়ের জন্য অন্যত্র চলে গেছে। আবার অনেকেই ঘরেই মাচায় বহুকষ্টে দিনপার করছেন।

কালিপুর গ্রামের আব্দুল আলীম বলেন, সপ্তাহখানেক ধরে ঘরের চারপাশে থৈ-থৈ পানি। চরাঞ্চলে শিশু খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। দোকানগুলোতে পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে। কেউ এখন পর্যন্ত খোঁজখবর নেননি। দেননি খাদ্য সহায়তা।

শেরপুর : শেরপুর সদর উপজেলার গ্রামগুলো থেকে বন্যার পানি নেমে যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি নদী ভোগাই, চেল্লাখালী, সোমেশ্বরী ও মহারশি নদীর পানিও বিপৎসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

সুনামগঞ্জ, ছাতক ও দোয়ারাবাজার : স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। শনিবার দুপুরে শহরের পুরাতন বাস স্টেশনে একটি রেস্টুরেন্টের সম্মেলন কক্ষে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। এ সময় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুল। দোয়ারাবাজারে ধীরগতিতে পানি কমছে। উপজেলার ৯ ইউনিয়নের ৫০ ভাগ মানুষের বাড়িঘর থেকে এখনো পানি নামেনি।

বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি

দুর্গম অঞ্চলে খাদ্য পানি ও স্বাস্থ্যসেবা সংকট

জেগে উঠছে ভাঙাচোরা সড়ক পথঘাট, দেখা দিয়েছে নদীভাঙন * ছড়িয়ে পড়ছে পানিবাহিত রোগবালাই
 যুগান্তর ডেস্ক 
২৬ জুন ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
সংকট
ব্রহ্মপুত্র নদের পানি কমলেও দুর্ভোগ কমেনি বানভাসি মানুষের। চলাচলে এখনো ভরসা নৌকা। শনিবার কুড়িগ্রামের উলিপুরের বাবুরচরে -যুগান্তর

সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কুড়িগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যা পরিস্থিতির আরও উন্নতি হয়েছে। তবে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। বিশেষ করে দুর্গম এলাকায় খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার চরম সংকট। বাসিন্দারা খেয়ে না খেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। শিশু খাদ্যের অভাবে অপুষ্টিতে ভুগছে তারা। এছাড়া নেই গো-খাদ্য। গবাদি পশু-পাখি নিয়েও বিপাকে পড়েছেন অনেকে। এদিকে পানি নেমে যাওয়ায় ভাঙাচোরা সড়ক-পথঘাট জেগে উঠছে। কোথাও কোথাও তীব্র নদী ভাঙন দেখা দিয়েছে। অনেকের ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও এখনো বসবাসের উপযোগী হয়নি। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা এখনো বিচ্ছিন্ন। এ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ নেই। খাবার সংকটে হাহাকার দেখা দিয়েছে প্রত্যন্ত এলাকায়।

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, আমাদের মেডিকেল টিম নগরীর বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে যাতে পানিবাহিত রোগবালাই ছড়িয়ে না পড়ে। বন্যাপরবর্তী পচা ও দুর্গন্ধযুক্ত পানির কারণে চর্মরোগ ও ডায়রিয়া বেশি ছড়াতে পারে। এ ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেন তিনি।

বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি) জানায়, দেশের সব প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস পাচ্ছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় তিস্তা অববাহিকা বাদে দেশের অভ্যন্তরে এবং উজানের বিভিন্ন অংশে ভারি থেকে অতিভারি বর্ষণের সম্ভাবনা কম। এই সময়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, গঙ্গা-পদ্মা, ধরলা, দুধকুমার এবং দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সব প্রধান নদ-নদীর পানি সমতল হ্রাস অব্যাহত থাকবে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় একদিকে কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, টাঙ্গাইল ও জামালপুর অন্যদিকে সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে শরীয়তপুর ও মাদারীপুরের নিম্নাঞ্চলে আগামী ২৪ ঘণ্টায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা সৃষ্টি হতে পারে।

ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

সিলেট, গোলাপগঞ্জ ও বালাগঞ্জ : সিলেটে বন্যাদুর্গত এলাকায় এতদিন যে যার মতো করে ত্রাণ বিতরণ করলেও অবশেষে সমন্বয় কমিটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। বিশেষ করে যাতায়াত সুবিধাজনক এলাকার লোকজন দফায় দফায় ত্রাণ পাচ্ছিল। কিন্তু দুর্গম যাতায়াতে থাকা পানিবন্দিরা এসব ত্রাণের দেখা পাননি। শুক্রবার ত্রাণ বিতরণ ও পুনর্বাসন সমন্বয় করতে উপজেলাভিত্তিক কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় সিলেট বিভাগীয় প্রশাসন। সিলেটের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) দেবজিৎ সিংহ এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রতিটি উপজেলায় ত্রাণের একটি করে কমিটি গঠন করা হয়েছে।

সিলেট নগরীর তালতলা, জামতলা, মণিপুরি রাজবাড়ি, যতরপুর, মিরাবাজার, শাহজালাল উপশহর, মেন্দিবাগ, ছড়ারপাড় এলাকার বাসিন্দাদের ঘরের পাশে বন্যার পানিতে বিভিন্ন ময়লা-আবর্জনা ভেসে এসে জড়ো হয়েছে। জমে থাকা পানিতে জন্ম নিয়েছে মশাসহ নানা কীটপতঙ্গ। এলাকার বেশ কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ব্লিচিং পাউডার দিয়ে বাসা-বাড়ি পরিষ্কার করছেন। আসবাবপত্র ধোয়ামোছার কাজও চলছে।

বালাগঞ্জে পানিবন্দি পরিবারগুলো অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছেন। আশ্রয় কেন্দ্রে সরকারি-বেসরকারিভাবে শুকনো খাবার ও কিছু ত্রাণ সামগ্রী দেওয়া হলেও গ্রামে ত্রাণ নিয়ে কেউ যাচ্ছেন না। গ্রামের দুর্দশাগ্রস্ত মানুষ নিদারুণ কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। পানিবন্দি লোকজন বলছেন, নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে লোক দেখানো শুকনো খাবার বিতরণের নামে ফটোসেশনকে গুরুত্ব দিচ্ছেন অনেকে। যারা যৎসামান্য ত্রাণ পাচ্ছে তারা বারবার পাচ্ছে, কিন্তু আমাদের দেখতে কেউই আসছেন না। এদিকে, বন্যার পানির তোড়ে বালাগঞ্জ-তাজপুর সড়কের কাশিপুর ব্রিজের সংযোগস্থলে সড়কে ফাটল দেখা দিয়ে বেশ কিছু অংশ দেবে গেছে। যে কোনো সময় ভয়াবহ ভাঙন হতে পারে।

গোলাপগঞ্জ উপজেলার বাঘা, শরীফগঞ্জ, বুধবারীবাজার, বাদেপাশা, ভাদেশ্বর, আমুড়াসহ কয়েকটি ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি গ্রাম এখনো পানিতে টইটুম্বুর। এসব এলাকার বহু পরিবার এখনো পানিবন্দি। বিশুদ্ধ পানির অভাবে অনেক জায়গায় ডায়রিয়া আমাশয়সহ বিভিন্ন রোগবালাই দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রাম : জেলায় অনেকের ঘরবাড়ি থেকে পানি নেমে গেলেও সেগুলো বসবাসের উপযোগী হয়নি। দেখা দিয়েছে তীব্র নদী ভাঙন। গ্রামীণ ও চরের রাস্তাঘাট ভেঙে যাওয়ায় যাতায়াতে ভোগান্তি বেড়েছে। সরকারের নেওয়া নানা উদ্যোগ বানভাসিদের দুর্ভোগ কমাতে পারেনি। অনেক চরাঞ্চলে এখনো ত্রাণ পৌঁছেনি। খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শৌচাগার এবং গো-খাদ্যের তীব্র সংকট। বন্ধ হয়ে যাওয়া ৩২৫টি স্কুলের পাঠদান কার্যক্রম এখনো শুরু হয়নি। কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক আব্দুর রশিদ জানিয়েছেন, বন্যায় জেলায় প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর জমির ফসল নিমজ্জিত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত প্রায় ৭ হাজার কৃষক। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষতির হিসাব নিরূপণ করা হবে।

নদী ভাঙা মানুষের বিলাপ : ব্রহ্মপুত্র নদের পেটে অবস্থিত হকের চর। নদীর পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দিয়েছে ব্যাপক ভাঙন। দুদিনে এখানকার ৯টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে। সেখানকার আমিনুল মিস্ত্রির স্ত্রী নাজমা বেগম বলেন, এখন হাতে কোনো কাজ নেই। নতুন চরে যাচ্ছি যদি কেউ কোনো খাওয়ন দেয় তো পেটে দানাপানি পড়বে, না হলে উপোস করা ছাড়া উপায় নেই।

উলিপুর উপজেলার হাতিয়া ইউনিয়নের ব্রহ্মপুত্র নদের পেটে অবস্থিত বাবুর চর। এখানকার কৃষি শ্রমিক সাইফুলের স্ত্রী আনিছা বলেন, ‘বানের পানিত ভাইসপার নাগছি গত ১৫ দিন থাকি। একবেলা খাই একবেলা উপোস করি। ছোট তিনটা ছাওয়া নিয়া বিপদে আছি। ওমরা তো অভাব বোঝে না। খালি খাবার চায়। কিন্তু ঘরত তো খাওয়ন নাই। আইজ সকালে তিন ভাইবোন এক মুট করি পন্তা খায়া আছে। আমরা দুই মানুষ এক মুট চিরা খায়া আছি।’

হাতিয়া ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান আবুল হোসেন বলেন, অপ্রতুল ত্রাণ সহায়তার কারণে মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে। দুর্গম চরাঞ্চলের অবস্থা খুবই খারাপ।

জগন্নাথপুরে ত্রাণের জন্য হাহাকার : জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি জানান, জগন্নাথপুর-সিলেট সড়ক, জগন্নাথপুর-সুনামগঞ্জ সড়কসহ উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের সব সড়ক পানিতে নিমজ্জিত। কিছু কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও উপজেলার অধিকাংশ গ্রামে ৯ দিন ধরে বিদ্যুৎ নেই। উপজেলা সদরে পানি কমতে শুরু করলেও নিম্নাঞ্চলের হাজার হাজার বাড়িঘরে এখনো ঊরু থেকে হাঁটু সমান পানি। জগন্নাথপুর বাজারের বিভিন্ন গলি পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যাদুর্গতদের মাঝে খাবারের জন্য হাহাকার দেখা দিয়েছে।

নলুয়া হাওড়বেষ্টিত চিলাউড়া হলদিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম বকুল বলেন, শ’ শ’ পরিবার এখনো আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন। পানি কিছুটা কমলেও দুর্ভোগের শেষ নেই মানুষের। বন্যা দুর্গতরা প্রয়োজনীয় ত্রাণ পাচ্ছে না। অন্যদিকে ডাকাতের অত্যাচারে মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।

‘সব শুকনা ধান পইচা গেছে, অহন কি খাইয়া বাচবাম’: নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, কৃষক আলাল উদ্দিন এবার ১৫০ শতক জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। গেলবারের বন্যার সময় অর্ধেক খেতের ধান কেটে ঘরে তুলতে পেরেছিলেন। বাকি ধান পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল। এবারের বন্যায় ছয়দিন ধরে তার ঘরের মাচার ধান ও পুঞ্জির খড় পানিতে ডুবে ছিল। নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামের ওই কৃষক যুগান্তরকে বলেন, ‘এই ধান দিয়াই আমার দুই ছেলের ইস্কুলের খরচসহ সারা বছরের সংসার খরচ চলে। এবারের বন্যায় আমার সব শেষ। যে ধান কাইট্টা শুকাইয়া ঘরে তুলছিলাম, তাও শেষ। অহন এই পচা ধান, খের আর দুইডা গরু ছাড়া কিছুই নাই। অহন কি খাইয়া বাচবাম?’

জেলার দশ উপজেলার ৭৩টি ইউনিয়নে ৫ লাখ ৫৪ হাজার মানুষ বন্যার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। জেলার ৩৫৩টি আশ্রয়কেন্দ্রে প্রায় সোয়া লাখ মানুষ আশ্রয় নেয়। পানি কমতে শুরু করায় ধীরে ধীরে আশ্রয়কেন্দ্র ছাড়তে শুরু করেছে বানভাসিরা।

ভূঞাপুর (টাঙ্গাইল) : টাঙ্গাইল সদর, ভূঞাপুর, নাগরপুর গোপালপুর, দেলদুয়ার, বাসাইল ও কালিহাতী উপজেলার শতাধিক গ্রামের বানভাসি মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এছাড়া জেলায় ৬ হাজার হেক্টর জমির ফসলও তলিয়ে যাওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। পানি কমতে শুরু করলেও দুর্ভোগের শিকার বহু পানিবন্দি মানুষ। খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও শিশু খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে। অনেকে পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এদিকে গো-খাদ্যের সংকটে দিশেহারা চরাঞ্চলের মানুষগুলো। সরেজমিন ভূঞাপুর উপজেলার যমুনা চরাঞ্চলের গাবসারা, গোবিন্দাসী, অর্জুনা ও নিকরাইল ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে যায়, অনেকের মাটির চুলা, গবাদিপশুর রাখার স্থান, টয়লেট, টিওবওয়েল ডুবে গেছে। পরিবারগুলো আশ্রয়ের জন্য অন্যত্র চলে গেছে। আবার অনেকেই ঘরেই মাচায় বহুকষ্টে দিনপার করছেন।

কালিপুর গ্রামের আব্দুল আলীম বলেন, সপ্তাহখানেক ধরে ঘরের চারপাশে থৈ-থৈ পানি। চরাঞ্চলে শিশু খাদ্যের চরম সংকট দেখা দিয়েছে। দোকানগুলোতে পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত দামে কিনতে হচ্ছে। কেউ এখন পর্যন্ত খোঁজখবর নেননি। দেননি খাদ্য সহায়তা।

শেরপুর : শেরপুর সদর উপজেলার গ্রামগুলো থেকে বন্যার পানি নেমে যাচ্ছে। সীমান্তবর্তী পাহাড়ি নদী ভোগাই, চেল্লাখালী, সোমেশ্বরী ও মহারশি নদীর পানিও বিপৎসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীতে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে ত্রাণসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

সুনামগঞ্জ, ছাতক ও দোয়ারাবাজার : স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বিএনপি। শনিবার দুপুরে শহরের পুরাতন বাস স্টেশনে একটি রেস্টুরেন্টের সম্মেলন কক্ষে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানানো হয়। এ সময় লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নূরুল ইসলাম নূরুল। দোয়ারাবাজারে ধীরগতিতে পানি কমছে। উপজেলার ৯ ইউনিয়নের ৫০ ভাগ মানুষের বাড়িঘর থেকে এখনো পানি নামেনি।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন