মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা ক্রেস্ট জালিয়াতি

৪ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি তদন্ত রিপোর্ট

কমিটির প্রধান অবসরে মামলার চার্জশিট চলতি মাসেই

  উবায়দুল্লাহ বাদল ০৯ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা ক্রেস্টের স্বর্ণ চুরি নিয়ে তৎকালীন বাণিজ্য সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে কমিটির প্রতিবেদন চার বছরেও আলোর মুখ দেখেনি। জিল্লার রহমান কমিটির রিপোর্টের পর অধিকতর তদন্তে ২০১৪ সালের ২ আগস্ট এ কমিটি হয়। কমিটি তাদের প্রতিবেদন চূড়ান্তও করে। কিন্তু এ নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষার কথা বলে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় মৌখিকভাবে প্রতিবেদন দাখিল না করার নির্দেশ দিলে সবকিছু থমকে যায়। কমিটির প্রধান হেদায়েতুল্লাহ গত বছরের অক্টোবরে অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) গেছেন। তবে এ ঘটনায় শাহবাগ থানায় করা মামলার চার্জশিট এ মাসেই দেয়া হবে বলে জানা গেছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, ‘এ নিয়ে মামলা হওয়ার পর কোনো অগ্রগতি আমাদের জানানো হয়নি। এখন পর্যন্ত জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের গঠিত অধিকতর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পাইনি। এর কোনো অগ্রগতি জানা নেই।’

জানা গেছে, মহান মুক্তিযুদ্ধে অবিস্মরণীয় অবদানের জন্য বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রনায়ক, রাজনীতিবিদ, দার্শনিক, শিল্পী-সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট নাগরিক ও সংগঠনকে সম্মাননা দেয়ার উদ্যোগ নেয় সরকার। সম্মাননা ক্রেস্টে যে পরিমাণ স্বর্ণ থাকার কথা ছিল, তা দেয়া হয়নি। আর ক্রেস্টে রুপার বদলে দেয়া হয় পিতল, তামা ও দস্তামিশ্রিত সংকর ধাতু। জাতীয় মান সংস্থা বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন (বিএসটিআই) পরীক্ষায় এসব তথ্য বেরিয়ে আসে। এরপরই ২০১৪ সালের প্রথমদিকে তৎকালীন ঢাকার বিভাগীয় কমিশনার জিল্লার রহমানকে (বর্তমানে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব) প্রধান করে তিন সদস্যের কমিটি করা হয়। কমিটি ওই বছরই ৮ মে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী এবি তাজুল ইসলাম, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সচিব কেএইচ মাসুদ সিদ্দিকীসহ ১৩ জন কর্মকর্তা এবং দুটি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে দায়ী করে প্রতিবেদন দেয়। তবে বিভাগীয় কমিশনার পর্যায়ের কর্মকর্তাকে দিয়ে তার সিনিয়র কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। পরে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় থেকে অধিকতর তদন্তের অনুরোধ জানানো হলে তৎকালীন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব হেদায়েতুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি হয়। কমিটির অন্য দুই সদস্য ছিলেন কৃষি মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন যুগ্ম সচিব মোশারফ হোসেন (বর্তমানে বিসিএস প্রশাসন একাডেমির রেক্টর) এবং পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব ফয়েজ আহম্মদ (বর্তমানে স্বাস্থ্যশিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের সচিব)। তারা প্রতিবেদন চূড়ান্ত করলেও তা গ্রহণ করা হয়নি।

গত বছরের ৪ অক্টোবর পিআরএলে যান হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন। পিআরএলে যাওয়ার আগে তিনি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে চিঠি দিয়ে বলেন, ‘অধিকতর তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন চূড়ান্ত পর্যায়ে।’ এতে বলা হয়, ক্রেস্টে স্বর্ণ কম দেয়ার অভিযোগ ওঠার পরিপ্রেক্ষিতে অধিকতর তদন্তে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বলা হয়েছিল। পরে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় বিষয়টি আরও অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল না করার মৌখিক পরামর্শ দেয়। গত বছর ২৫ জানুয়ারি তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়া হবে কি না, জানতে চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হলে তারও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

বিষয়টির সত্যতা স্বীকার কমিটির প্রধান হেদায়েতুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে বলেন, বিষয়টি তদন্ত করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি এবং দুদকের তদন্ত চলমান, তাই আমাদের কমিটির প্রতিবেদন গ্রহণ করা হয়নি। ফলে প্রতিবেদন চূড়ান্ত হওয়া সত্ত্বেও জমা দিতে পারিনি। পিআরএলে যাওয়ার আগেই বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।

দুদক সূত্র জানায়, আলোচিত এ ক্রেস্ট জালিয়াতির ঘটনায় ওই সময় সরবরাহকারী দুটি প্রতিষ্ঠানের মালিকের বিরুদ্ধে প্রতারণা ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে শাহবাগ থানায় মামলা করেছিল মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। রাজধানীর বনানীতে অবস্থিত ক্রেস্ট সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান এমিকনের মালিক মীর দাউদ আহমেদ ওরফে নাজিম এবং শান্তিনগরের মেসার্স মহসিনুল হাসানের স্বত্বাধিকারী মো. মোহসিনুল হাসান। পরে এ ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধানের দায়িত্ব নিয়ে নথিপত্র জব্দ করে। এ নিয়ে দুদকের তৎকালীন উপপরিচালক তাহসিনুল হক (বর্তমানে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত), মির্জা জাহিদুল আলম ও শেখ আবদুস সালাম (বর্তমানে পিআরএলে) পর্যায়ক্রমে অনুসন্ধান করেন। ২০১৬ সালে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন সংশোধন করা হলে মামলা সংক্রান্ত ধারা ৪০৬/৪০৯ পুলিশের আওতাভুক্ত হওয়ায় তা শাহবাগ থানায় ফেরত পাঠানো হয়। বিষয়টি এখনও তদন্ত চলছে। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানা পুলিশের এসআই ভোজন বিশ্বাস বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। প্রাথমিকভাবে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। কয়েকজনের সঙ্গে কথাও বলা হয়েছে। আরও কিছু তথ্য পাওয়ার পর চলতি মাসেই চূড়ান্ত চার্জশিট দেয়া হবে।’

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×