সারা দেশের চালচিত্র

বিবর্ণ গণগ্রন্থাগারগুলো চাকরিপ্রার্থীদের দখলে

প্রকৃত পাঠকের বড়ই অভাব * দায়ী মুখস্থ ও সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা

  হক ফারুক আহমেদ ০৯ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সারা দেশের গণগ্রন্থাগারগুলোর অবস্থা দিন দিন করুণ হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য হারিয়ে এগুলো বিবর্ণ হয়ে পড়েছে। পাঠকক্ষে লোকজনের দেখা মিললেও প্রকৃত পাঠকের সংখ্যা খুবই নগণ্য। পাঠকক্ষের টেবিল-চেয়ারগুলো চাকরিপ্রার্থীদের দখলে চলে গেছে। একসঙ্গে বসে তারা পড়া তৈরি করেন। এতে সাধারণ পাঠকের জন্য পড়ার পরিবেশ অনেকটা প্রতিকূলতার মধ্যে পড়ছে। যদিও পাঠের আগ্রহী মানুষের সংখ্যা দিন দিন কমছে।

গণগ্রন্থাগারগুলোর সার্বিক অবস্থার চিত্র পাওয়া যায় সাম্প্রতিক একটি পরিসংখ্যান থেকে। এতে সারা দেশের গণগ্রন্থাগারে পাঠকের গড় উপস্থিতি পাওয়া যায়। গণগ্রন্থাগার অফিস সূত্র জানায়, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে গড়ে দৈনিক ঢাকার সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারে ৩২৩৯ জন, পাঁচটি বিভাগীয় গণগ্রন্থাগারে ৬৯৩ জন, পাঁচটি জেলা গণগ্রন্থাগারে ২৭৬ জন, দুটি উপজেলা গণগ্রন্থাগারে ৯৭ জন, চারটি শাখা গণগ্রন্থাগারে ২০৫ জন এবং একটি বিশেষ গণগ্রন্থাগারে ৭২৩ জন উপস্থিত ছিলেন। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী সারা দেশে গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের আওতাধীন সরকারি ৭০টি গণগ্রন্থাগারে এপ্রিল মাসে গড়ে দৈনিক মাত্র ২৪০৪৯ জন পাঠক উপস্থিত ছিল। তাদের মধ্যে প্রকৃত পাঠক সংখ্যা ছিল আরও অনেক কম। অথচ ৭০টি গণগগ্রন্থাগারে বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার মতো ২৪ লাখ ৮৮ হাজার ১৪৪টি বই ছিল। ১৬ কোটির অধিক মানুষের দেশে এই পরিসংখ্যান রীতিমতো হতাশাজনক।

গণগ্রন্থাগারগুলোর প্রকৃত অবস্থা এর চেয়েও ভয়াবহ। গণগ্রন্থাগারের একটি প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী ২১ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ গণগ্রন্থাগারে বেলা ১১টায় চারজন, মুন্সীগঞ্জ গণগ্রন্থাগারে দুপুর সাড়ে ১২টায় নয়জন, চাঁদপুর গণগ্রন্থাগারে বিকাল সাড়ে ৫টায় তিনজন, ২২ জানুয়ারি ব্রাহ্মণবাড়িয়া গণগ্রন্থাগারে সকাল সাড়ে ১০টায় দুইজন, কুমিল্লা গণগ্রন্থাগারে দুপুর ১টায় পাঁচজন, ফেনী গণগ্রন্থাগারে বিকাল ৫টায় একজন, ২৩ জানুয়ারি চট্টগ্রাম গণগ্রন্থাগারে সকাল ১০টায় ২৩ জন, ৩ ফেব্রুয়ারি রাজবাড়ী গণগ্রন্থাগারে দুপুর ২টায় ছয়জন, মাগুরা গণগ্রন্থাগারে বিকাল সাড়ে ৪টায় ১৫ জন, ৪ ফেব্রুয়ারি কুষ্টিয়া গণগ্রন্থাগারে সকাল সাড়ে ১০টায় দুইজন, যশোর গণগ্রন্থাগারে বিকাল ৩টায় আটজন, খুলনা গণগ্রন্থাগারে বিকাল সাড়ে ৫টায় ১২ জন, ১১ ফেব্রুয়ারি বরিশাল গণগ্রন্থাগারে দুপুর ১২টায় সাতজন এবং পিরোজপুর গণগ্রন্থাগারে বেলা ৩টায় তিনজন পাঠক ছিলেন। এছাড়া ৩ ফেব্রুয়ারি মানিকগঞ্জ গণগ্রন্থাগারে বেলা ১১টায় একজনও পাঠকও পাঠকক্ষে ছিলেন না। এসব তথ্য প্রমাণ করে গণগ্রন্থাগারগুলোয় পাঠক মাত্রাতিরিক্ত হারে কমছে।

চলতি বছরের জানুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল, মে ও রোজার সময় রাজধানীর সুফিয়া কামাল গণগ্রন্থাগারে কয়েকদফা সরেজমিনে দেখা গেছে, সকালে গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে তরুণ-তরুণীদের ভিড় থাকে। এত মানুষ বই পড়ার জন্য জমায়েত হয়েছে দেখে নিঃসন্দেহে ভালো লাগার কথা। কিন্তু অবস্থাটা একটু ভিন্ন। পাঠকক্ষে প্রবেশ করলে প্রকৃত সত্যটা চোখে পড়ে। নানা বইয়ের থেকে জ্ঞান আহরণের চাইতে চাকরির পরীক্ষার জন্য পড়াশোনা করতে আসা ব্যক্তিদের সংখ্যা বেশি। তাদের দখলে পাঠকক্ষের চেয়ার-টেবিল। বাইরের বই ও ব্যাগ গণগ্রন্থাগারে নেয়ার নিয়ম না থাকলেও বেশিরভাগ ব্যক্তি ব্যাগ ও বই নিয়ে প্রবেশ করেন। কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স বিষয়ক বইসহ বিভিন্ন পাঠ্যপুস্তক, বিসিএস সমাধান, গণিত সমাধান নিয়ে ব্যস্ত সবাই থাকেন। গুটি কয়েক মানুষকে হয়তো সেলফ থেকে দু’একটি বই নিয়ে পড়ে দেখা যায়। চাকরিপ্রার্থীদের এতই ভিড় থাকে যে অনেক সময় সাধাারণ পাঠকরা বসার জায়গাও পান না। এ কারণে সাধারণ পাঠকরা এখন গণগ্রন্থাগারে আসতে চান না।

গণগ্রন্থাগারের নিচতলায় শিশুদের পাঠকক্ষ সারা দিন ফাঁকা পড়ে থাকে। সেখানকার দায়িত্ব পালনকারীদের অখণ্ড অবসর কাটাতে দেখা যায়। দুই একবার গিয়ে দেখা গেছে, কেউ কেউ ঘুমাচ্ছেন। গণগ্রন্থাগারের রেজিস্টার খাতার সূত্র অনুযায়ী দিনে ১০টির বেশি শিশুকে কক্ষে পাওয়া যায় না। এমনও দিন আছে একজন শিশুও আসে না। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে ই-বুক প্রকল্প চালু হলেও সেটির কোনো কার্যক্রম এখন আর নেই বলে গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। তৃতীয় তলায় সব ট্যাব বন্ধ দেখা যায়।

চাকরির পড়াশোনা করতে যারা নিয়মিত সুফিয়া কামাল গণগ্রন্থাগারে আসেন তাদের কয়েকজনের সঙ্গে এই প্রতিবেদকের কথা হয়। যশোরের একটি কলেজ থেকে স্নাতক পাস করে আসা উৎপল দত্তকে বিসিএস গাইডসহ নিজস্ব কয়েকটি বই নিয়ে পড়াশোনা করতে দেখা যায়। বই নিয়ে প্রবেশের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি বলেন, এটি ওপেন সিক্রেট। নিজের বই নিয়ে আসলে কেউ বাধা দেয় না। তিনি বলেন, এখানে চাকরির পড়াশোনার জন্য প্রয়োজনীয় বই থাকে না, তাই সবাই নিজেদের বই নিয়ে আসে। একদল ছাত্রীকে দেখা যায় গণিত সমাধান করতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ এসব শিক্ষার্থীর কাছে গিয়ে জানা যায় তারা আসলে চাকরির জন্য গণিতের সমাধান করছেন।

সুফিয়া কামাল জাতীয় গণগ্রন্থাগারে প্রায় আসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র মোহম্মদ জুনায়েদ। যুগান্তরকে তিনি বলেন, আসলে পুরো দৃশ্যপট পাল্টে গেছে। এক সময় দেশের বিশিষ্ট লেখকরা গবেষণার জন্য এখানে আসতেন। তিনি বলেন, ২০ বছর আগে এখানে শিক্ষার্থীসহ নানা বয়সের মানুষকে বিভিন্ন ধরনের বই পড়তে ও নোট নিতে দেখেছি। সোজা কথায় বললে সে সময় জ্ঞানের বা বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা হতো। এখন পাঠকক্ষের অনেকটাই চাকরিপ্রার্থীদের দখলে চলে গেছে। তবে শুধু তাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। কারণ তারা হয়তো কোনো বিকল্প খুঁজে না পেয়ে একটু ভালো পরিবেশের আশায় এখানে আসেন। তবে ঢাকার চিত্রই যদি এমন হয় তাহলে বাইরের চিত্র এর চেয়ে ভালো নয় সেটা সহজে অনুমেয়। এখানকার প্রবীণ কর্নারের জায়গাটিও খুব ছোট। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন প্রবীণ বলেন, আমাদের জায়গাটি খুবই অল্প। অনেক সাধারণ পাঠক জায়গা পাবে না বলে এখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। কারণ চাকরিপ্রার্থীরা দীর্ঘ সময় ধরে আসন দখলে রাখেন। তিনি আরও বলেন, এখানকার টয়লেটগুলোর অবস্থা খুবই খারাপ।

গণগ্রন্থাগারের সার্র্বিক বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও কথাসাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, একটা সময়ে এ দেশে পড়াশোনার মূল উদ্দেশ্য ছিল জ্ঞান অর্জন। পাঠ্যপুস্তকের বাইরে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, বিজ্ঞান, ভ্রমণ, সমালোচনা, ইতিহাস, রাজনীতিসহ নানা বিষয়ের বইয়ের পাঠ ছিল পড়াশোনার অংশ। পরিবারে ও সমাজে বইয়ের পাঠ ছিল আনন্দের খোরাক। পাঠচক্র, দ্রুত পঠন জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করত। কিন্তু এখনকার শিক্ষা হয়ে গেছে শুধু মুখস্থ করা, সার্টিফিকেট পাওয়া। আর চাকরি পাওয়ার জন্য পড়াশোনা করা। তিনি বলেন, চাকরির জন্য পড়তে হবে; কিন্তু সেটা পড়াশোনার মূল লক্ষ্য হতে পারে না। শুধু গণগ্রন্থাগার নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারেও দেখা যাবে চাকরির জন্য পড়াশোনা চলছে।

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, এই অবস্থার জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা দায়ী। আমরা হেফাজতের কথায় পাঠ্যপুস্তক থেকে গুরুত্বপূর্ণ ও জরুরি লেখা বাদ দিয়ে পড়াশোনাকে আনন্দহীন করেছি। সহায়ক বইয়ের নামে শিশুদের নোট গাইডের মুখস্থ বিদ্যায় অভ্যস্ত করে তুলেছি। তিনি আরও বলেন, বইমেলায় কিছু সংখ্যক প্রকৃত পাঠক বই কেনেন। এ ছাড়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান অনেক অনেক টাকার বই কিনে আলমারি ভর্তি করে। ব্যবসা হচ্ছে, তাই প্রকাশকরাও খুশি। কিন্তু যেভাবে চলছে এভাবে চললে একদিন হয়তো গণগ্রন্থাগারেগুলোর আর কোনো কার্যকারিতা থাকবে না। অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে এখন প্রায়ই বলি, আমাদের শিক্ষার্থীরা আজ একটা লম্বা কালো সুড়ঙ্গের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে- যার শেষে আছে শুধু একটি সার্টিফিকেট ও চাকরি।

এসব বিষয়ে গণগ্রন্থাগার অধিদফতরের মহাপরিচালক আশিষ কুমার সরকার যুগান্তরকে বলেন, চাকরিপ্রার্থীদের ভিড় বেশি এটি সত্য।

কিন্তু গ্রন্থাগার তো সবার জন্য উন্মুক্ত। তাই আমরা তো তাদের মানা করতে পারি না। তবে আমরাও চাই সব ধরনের পাঠক এখানে আসুক। এছাড়া কেউ সমস্যার কথা বললে আমরা সেটা সমাধানের চেষ্টা করি। তিনি জানান, এখানে ইতিমধ্যে ১৩ তলার একটি ভবন নির্মাণের নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। এটি বাস্তবায়ন হলে বইপ্রেমী ও অন্য পাঠকের জন্য সুবিশাল জায়গার সৃষ্টি হবে বলে মনে করি। প্রকৃত পাঠকদের আগমন ও তাদের সংখ্যা দেশের নানা গণগ্রন্থাগারে কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ টানলে মহাপরিচালক আশিষ বলেন, প্রযুক্তির এ যুগে সবাই মোবাইল ফোন সেট তথ্যের জন্য ব্যবহার করছে। তবে কাগজে ছাপা বইয়ের আবেদন অন্যরকম। সাধারণ পাঠককে বইয়ের প্রতি আরও আকৃষ্ট করতে প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে আমরা নানা কাজ করে যাচ্ছি।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×