চট্টগ্রামে অভিযানেও থামছে না মাদক ব্যবসা

  নাসির উদ্দিন রকি, চট্টগ্রাম ব্যুরো ০৯ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নগরীর হালিশহর ছোটপুল এলাকার সবচেয়ে বড় মাদক আস্তানার নিয়ন্ত্রক ছোটপুল দফাদার বাড়ির জানে আলমের ছেলে রেজাউল করিম ওরফে ডাইল করিম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকাভুক্ত শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী সে। তার বিরুদ্ধে নগরীর হালিশহর থানাসহ বিভিন্ন থানায় আছে এক ডজনের বেশি মামলা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাদকবিরোধী অভিযানেও বন্ধ হয়নি তার স্পটের মাদক ব্যবসা। এমনিভাবে নগরীর অধিকাংশ মাদক স্পটে এখনও হাত বাড়ালে মিলছে মাদক। তবে অভিযানের কারণে মাদক ব্যবসায়ীরা কিছুটা সতর্কতার সঙ্গে চালাচ্ছে এ ব্যবসা। একইভাবে থেমে নেই মাদক আসাও। প্রতিদিন সড়ক ও নৌপথে ধরা পড়ছে মাদকের চালান।

সর্বশেষ বৃহস্পতিবার মধ্যরাতেও চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার পুকুরিয়া ইউনিয়নের চানপুর এলাকা থেকে অস্ত্র ও ইয়াবাসহ মো. হুমায়ুন নামে এক মাদক ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। এ সময় তার কাছ থেকে ১টি এলজি ও ১ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। তার বিরুদ্ধে বাঁশখালী, আনোয়ারা ও নগরীর বাকলিয়া থানায় পাঁচটি মামলা আছে।

নগরীর হালিশহর থানার ছোটপোল কাঁচাবাজার সংলগ্ন ডাইল করিমের মাদক স্পটে গিয়ে দেখা যায়, বেচাকেনা চলছে ইয়াবা ও ফেনসিডিলের। স্থানীয় বাসিন্দা মো. বেলাল জানান, ডাইল করিমকে গ্রেফতার ও তার মাদক ব্যবসা বন্ধে স্থানীয় এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে থানা ও পুলিশ কমিশনারকে একাধিকবার জানানো হলেও কোনো সুফল মেলেনি। এখনও উঠতি বয়সের কিশোর থেকে শুরু করে সব বয়সী মাদকসেবী এখান থেকে মাদক কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। একাধিক অভিযানের পরও নগরীর সবচেয়ে বড় মাদকের আখড়া হিসেবে পরিচিত সদরঘাট থানার বরিশাল কলোনিতেও চলছে মাদকের ব্যবসা। ১৫ দিনের অভিযানে অর্ধকোটি টাকার হেরোইন, ১০ হাজার পিস ইয়াবা, ফেনসিডিল ও আগ্নেয়াস্ত্রসহ ১০ জন গ্রেফতার হয়েছে।

নগর পুলিশের সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, নগরীতে ২৭৭টি স্পটে ৫১৯ জন মাদক ব্যবসায়ী আছে। একইভাবে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তালিকায়ও নগরীর ৬টি জোনে মাদক ব্যবসায়ী আছে ৯৫ জন এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় চট্টগ্রাম নগরীর শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর সংখ্যা ১৯ জন। এছাড়া স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকায় মাদক ব্যবসায় সহায়তাকারী হিসেবে আছে নগরীর বর্তমান ও সাবেক ৫ থানার ওসির নামসহ অনেক পুলিশ সদস্য। মাদকবিরোধী অভিযান শুরুর পর র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ছয়জন। যারা তৃতীয় ও চতুর্থ সারির মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। তবে ধরা পড়েনি ডাইল করিমসহ শীর্ষ ১৯ মাদক ব্যবসায়ীর কেউই।

তালিকার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে রয়েছে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ইলিয়টগঞ্জ এলাকার দিনমজুর চারু মিয়ার ছেলে ইউসুফ (৩৫)। থাকেন নগরীর সদরঘাট থানা এলাকায়। নিয়ন্ত্রণ করেন নগরীর সবচেয়ে বড় মাদকের আখড়া বরিশাল কলোনি। এছাড়া তালিকায় আছে নগরীর কোতোয়ালি বিআরটিসি ফকিরা কলোনিতে বাদশা মিয়ার ছেলে ফয়সাল। বরিশাল কলোনির মাদক স্পটে মাদক ব্যবসা কিছুটা কমে এলেও জমে উঠেছে ফয়সালের মাদক স্পট। সে নিজেকে যুবলীগ নেতা পরিচয়ে দাপটের সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছে এ ব্যবসা। রাঙ্গুনিয়া রাজানগর এলাকার কবির আহমেদের ছেলে আজিজুল হক ওরফে জুলইক্যা (৫২), একই উপজেলার চন্দ্রঘোনা হাবিবের গোট্টা এলাকার আমির হোসেনের ছেলে আমজু (৪৫), লোহাগাড়ার আবুল কাশেম মেম্বার ওরফে বাইট্টা কাশেম (৪৭), চন্দনাইশের ফরিদুল আলম (৪৫), আনোয়ারার ইউসুফ ওরফে কালা মনু (৪৬), মিরসরাই বারইয়ারহাটের রেজাউল করিম খোকন, রাউজান আধার মানিক এলাকার শাহেদুল ইসলাম, হাড়পাড়া এলাকার খলিল ওরফে খইল্যা, রাঙ্গুনিয়া রাজানগরের ওয়াশিম, পোমরা এলাকার নাজিম উদ্দিন, চন্দনাইশ পৌর এলাকার মো. শাহেদ, কাঞ্চনাবাদের নুরুল ইসলাম, রাঙ্গুনিয়া মরিয়মনগরের আলতাফ ওরফে কানা আলতাফ, ভুজপুরের রুস্তম চেয়ারম্যান, পাথরঘাটা সিএন্ডবি কলোনির আবুল হোসেনের ছেলে আরমান, আকবরশাহ সিডিএ ১ নম্বর রোডে আলমগীর, উত্তর কাট্টলী কুতুববাড়ির পাশে খোরশেদ ও বাবুল, আইচ ফ্যাক্টরি রোডে চাঁন মিয়া, পটিয়া গোবিন্দর খিলের নুর আয়শা, পটিয়া দক্ষিণ গোবিন্দর খিলে মনোয়ারা বেগম ওরফে পারভিন। তালিকায় নেই কিন্তু ইয়াবা ব্যবসা করে পটিয়ার জিরি, এয়াকুবদন্ডী, হুলাইনসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দা এমন কয়েকজনের ওপর নজর আছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও র‌্যাবের। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানেও থেমে নেই তাদের মাদক ব্যবসা।

সূত্র জানিয়েছে, তালিকার বাইরেও অনেক ইয়াবা ব্যবসায়ী রাজনৈতিক নেতা ও এমপিদের ছত্রছায়ায় চালিয়ে যাচ্ছে ব্যবসা। সরকারি দলের নেতা বা জনপ্রতিনিধির তকমা লাগানো থাকায় তাদের নাম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তালিকায় যেমন আসছে না, তেমনি তাদের বিষয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখও খুলতে চান না। এমপি ও নেতাদের ঘুমে রেখে তাদের নাম ভাঙিয়ে দেদার করছে ইয়াবা ব্যবসা। এলাকার লোকজন এমনকি দলের সাধারণ নেতাকর্মীরাও তাদের সম্পর্কে জানে। কিন্তু ভয়ে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলছে না। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপপরিচালক শামীম আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ‘তালিকাভুক্ত এবং তালিকার বাইরে থাকা মাদক ব্যবসায়ীদের গ্রেফতারে অভিযান চলমান আছে। তালিকাভুক্তদের কেউ কেউ কারাগারে আর যারা বাইরে আছে, তারা আড়ালে থেকে এ ব্যবসা করছে।’

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার মো. ইকবাল বাহার বলেন, অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে চট্টগ্রাম নগরীতে ১৪৫টি মাদকের আস্তানা গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নগরবাসীর কাছে বিষফোড়ার মতো ছিল মাদকের আখড়া বরিশাল কলোনি। আমরা সেটা ধ্বংস করে দিয়েছি। আরও যেগুলো আছে, সেগুলো আমরা গুঁড়িয়ে দেব। শনিবার সকালে সিএমপি কার্যালয়ের সামনে পুলিশের জব্দ করা মাদক ধ্বংস অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, নতুন করে কেউ যেন মাদক সেবন কিংবা আড্ডা দেয়ার জন্য আস্তানা চালু করতে না পারে, সেদিকে আমরা কঠোরভাবে দৃষ্টি রাখব।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×