সাতক্ষীরায় বিচার চেয়ে স্ত্রীর সংবাদ সম্মেলন

বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে ‘বন্দুকযুদ্ধ’র নামে হত্যা

প্রকাশ : ০৯ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাতক্ষীরা প্রতিনিধি

সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন

‘আগের দিন পুলিশ বাড়িতে এসে হুমকি দিয়ে গেছে। পরদিন সন্ধ্যায় এসে তিন হাজার টাকাও নিয়ে গেছে। এর পরদিন তাকে চোখ বেঁধে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে।’ এই অভিযোগ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন নাজমা খাতুন।

তিনি বলেন, ‘আমার স্বামী আনিছুর রহমান গাজী ভাংড়ি লোহা লক্কড়ের ব্যবসা করতেন। একটি জুতার দোকানও ছিল তার। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেটি ভেঙে দেয়া হয়। এরপর থেকে তিনি নদীতে মাছ ধরে ও নিজেদের একটি ঘেরে মাছচাষ করে সংসার চালিয়ে আসছিলেন। অথচ আমার স্বামীকে ‘মাদক চোরাচালানি’ বানিয়ে বন্দুকযুদ্ধের নামে হত্যা করা হয়েছে।

আনিছুর হত্যা ঘটনার ১১ দিন পর শুক্রবার সাতক্ষীরা প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে এ কথা বলেন ২৮ মে রাতে চোরাচালানিদের দুই গ্রুপের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত কলারোয়ার পাকুড়িয়া গ্রামের আনিছুর রহমান গাজীর স্ত্রী নাজমা খাতুন।

কলারোয়া থানার ওসি বিপ্লব কুমার নাথ ঘটনার পরদিন সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, ২৮ মে রাত সোয়া ২টায় তার কাছে খবর আসে যে দেয়াড়া পিছলাপোলের মাঠে মাদক চোরাচালানিদের দুটি বিবদমান গ্রুপ মাদক ভাগাভাগি নিয়ে গোলাগুলি করছে। এ খবর পেয়ে খোরদো পুলিশ ক্যাম্পের এসআই সিরাজুল ইসলাম পুলিশ নিয়ে সেখানে পৌঁছে তাদের নিবৃত্ত করতে তিন রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছোড়ে। ওসি আরও জানান, গোলাগুলি থেমে গেলে ঘটনাস্থল থেকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়। তার নাম আনিছুর রহমান। কলারোয়ার পাকুড়িয়া গ্রামের সুরত আলির ছেলে তিনি। তার বিরুদ্ধে সাতক্ষীরা জেলায় ১০টি মাদক মামলা রয়েছে। তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি ওয়ানশুটার গান জব্দ করা হয়েছে।

কলারোয়ার খোরদো পুলিশ ক্যাম্পের এএসআই এজাজ মাহমুদ বলেন, ‘এ সম্পর্কে আমি কিছুই জানি না। আমি আনিছুরের বাড়ি যাইনি। আমি তাকে ধরিনি। এমনকি টাকাও নেইনি। পরদিন তাকে চোখ বেঁধে তুলেও আনিনি। এসব অভিযোগ সর্বৈব মিথ্যা।’

নাজমা খাতুন অভিযোগ করে বলেন, ২৭ মে খোরদো পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই এজাজ মাহমুদ তার বাড়িতে এসে বলে যান আনিছকে যেখানে পাওয়া যাবে সেখানে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। ওই দিন রাতে দেয়াড়া বাজার থেকে বাড়ি ফেরার সময় স্বামী আনিছুরের কাছ থেকে ওই এএসআই তিন হাজার টাকাও নেন এবং বলেন, বিষয়টি তিনি মিটমাট করে দেবেন। অথচ ২৮ মে সোমবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে খোড়দো পুলিশ ফাঁড়ির সেই এএসআই এজাজ মাহমুদ ও এএসআই তরিকুল ইসলামসহ ৪ জন সাদা পোশাকধারী পুলিশ মোটরসাইকেলে তাদের বাড়িতে আসেন। আনিছকে তারা হাতকড়া পরিয়ে ও চোখ বেঁধে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে চলে যায়। এই দৃশ্য খোড়দো বাজারের লোকজন এবং পাড়া প্রতিবেশীরা দেখেছেন।

সংবাদ সম্মেলনে নাজমা খাতুন দাবি করেন কোথাও ফেনসিডিল বা ইয়াবা ধরা পড়লেই পুলিশ সেই মামলার সাথে তার স্বামীকে জড়িয়ে দেয়। এসব মামলায় তিনি কমপক্ষে চারবার জেল খেটেছেন। প্রতিবার দুই থেকে আড়াই মাস পর্যন্ত জেলে ছিলেন তিনি। তিনি বিএনপির একজন সমর্থক।

তবে এ প্রসঙ্গে খোরদো পুলিশ ক্যাম্প ইনচার্জ এসআই সিরাজুল ইসলাম বলেন আনিছুর, তার স্ত্রী ও ছেলেমেয়ে সবাই ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাদের বারবার বলা হয়েছে মাদক কারবার ছাড়তে। তিনি বলেন, ‘আনিছুর কলারোয়ার কুশোডাঙ্গা ইউনিয়নের পিছলাপোল মাঠে দুই গ্রুপের বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন। এর সঙ্গে পুলিশের কোনো সম্পর্ক নেই।’

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন নিহত আনিছুরের বড় ভাই ওজিয়ার রহমান, তার স্ত্রী ফরিদা খাতুন, আনিছুরের মেয়ে রিমা ও ছেলে রিয়াজুল।