‘সবকিছুই যেন পরেরবার’
jugantor
‘সবকিছুই যেন পরেরবার’

  মোজাম্মেল হক চঞ্চল, বার্মিংহাম থেকে  

০৭ আগস্ট ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গতি-সম্রাজ্ঞীদের দেখতে হলে সকাল ৮টার মধ্যে পৌঁছতে হবে আলেকজান্ডারে। ২০০ মিটার স্প্রিন্টের সেমিফাইনাল। কে মিস করতে চায়। বৃহস্পতিবার রাতে ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। শুক্রবার সকালে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। সহকর্মী দুই সাংবাদিক তখনও ঘুমিয়ে। চারদিকে ফর্সা। মিস করলাম নাকি! সকাল সাড়ে ৬টা। অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম ৭টার। এই প্রথম সময়কে হার মানাতে পেরে ভালো লাগল। মেইন প্রেস হাবে না গিয়ে বাস ধরে সোজা আলেকজান্ডারে পৌঁছে যাই সাড়ে ৭টার মধ্যে। সুবিশাল মিডিয়া গ্যালারিতে বসে রয়েছি। একদিকে চলছে স্প্রিন্টের হিট। ওদিকে চলছে মহিলাদের হাইজাম্প, পুরুষদের শটপুট, হ্যামার থ্রো। ৩০ হাজার দর্শক। সবার দৃষ্টি থম্পসন, ওইটিদের দিকে। ফেভারিটদের সবাই হিটে উতরে গেলেন। আমাদের অ্যাথলেটরা প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নিলেন।

মন খারাপ। বিষয়টা শেয়ার করলাম পাশে বসা জ্যামাইকান সাংবাদিক জ্যানডলের সঙ্গে। জ্যামাইকান অ্যাথলেটিক্স যেখানে বিশ্ব শাসন করছে, সেখানে আমরা এই গ্রহের কোথায় অবস্থান করছি তার কোনো খবরই নেই। মন খারাপ বুঝতে পেরে জ্যানডল বললেন, ‘ও কিছু না। মন খারাপ করো না। ভিক্টোরিয়ায় তোমরা পারবে।’

জ্যানডল ঠিকই বলেছে। আমাদের সবকিছুই যেন পরেরবার।

বার্মিংহাম এসেছি প্রায় দু’সপ্তাহ হলো। ফেসবুকের কল্যাণে আমার গেমস কভারের কথা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। যে কারণে ইংল্যান্ডের নানা প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা আমার বন্ধুরা যোগাযোগ করছে। আমি যখন ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে বুঁদ তখন ফোন আসে ফিদার। একসঙ্গে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছি। ওর মা সেলিমা খাতুন আমাদের ঢাকা কলেজের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। প্রয়াত পরমাণু বিজ্ঞানী ওয়াজেদ মিয়ার ভাগ্নি সেলিমা আপা প্রধানমন্ত্রীর পিএস, বিশেষ সহকারী হয়েছিলেন। ফিদার খালাতো বোন মাহবুবা গিনি সংসদের হুইপ। একসময় ভালোমানের অ্যাথলেট ছিলেন। কলেজ জীবনের কত স্মৃতি ফিদাদের সঙ্গে। ইংল্যান্ড প্রবাসী রুশদি, পরশ, শ্যামল, ফার্মাসিস্ট মিরাজ, ডা. জাভেদ, ব্যারিস্টার মওদুদ, ব্যারিস্টার বুলবুল কিংবা শিমুলরা দেশ ছেড়ে চলে এসেছে। ওদের মতো প্রতিভাবানরা কিসের নেশায় বিদেশ বিভূঁইয়ে? প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। একজন ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করতে দেশের কত টাকা খরচ হয়? হিসাব জানা নেই। দেশে ফিরে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে।

বার্মিংহামেই দেখা পেলাম ডা. রিমার (ছদ্ম নাম)। ময়মনসিংহ মেডিকেলের ছাত্রী ছিল। আমার খুবই ভালো বন্ধু। সিটি সেন্টারে কফি খেতে খেতে রিমার সঙ্গে অনেক গল্প হলো। একবার আমাদের বন্ধু লিয়ন খুব আবেগ নিয়ে বলেছিল, ‘দোস্ত আমার বুকে ব্যথা।’ বুকের কোন পাশে ব্যথা? বাম পাশে।

রিমা বিজ্ঞের মত অনেক কথা বলল। ফুসফুস, হার্টের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক আলসার অনেক কিছু বুঝাইলো।

চরম বিরক্ত হয়ে লিয়ন বলেছিল, ‘বুকের বামপাশে ব্যথা মানে শুধু অসুখ বুঝ, কিন্তু ভালোবাসা বুঝ না।’

রিমা অবাক, ‘ওহ এই সমস্যা? সরি দোস্ত! এই ব্যাপারে কোনো হেল্প করতে পারছি না। তুই বরং ভালো দেখে একজন সাইক্রিয়াটিস্ট দেখা।’

আমরা তখন হেসেই খুন।

রিমা এখানে মস্তবড় ডাক্তার। বেশ কয়েকবার কিসব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। এক ক্লাসম্যাটকে বিয়ে করেছিল। এখন সিঙ্গেল আছে। ওর স্বপ্ন অনেক বড়। দেশে ফিরে বিশেষায়িত হাসপাতাল করতে চায়। এ নিয়ে বেশ দৌড়ঝাঁপ করছে।

রিমারা যখন এই দেশে সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে চলছেন, তখন বিপরীত চিত্রও আছে। আরেক গ্রুপ রয়েছে এখানে। উন্নত জীবনের আশায় নানা উপায়ে এসে আশ্রয় খোঁজেন অনেক বাংলাদেশি। তাদের কারও জীবন ইংল্যান্ডের জেলখানায় হলেও কেউ কেউ সরকারের অনুকম্পায় মুক্ত বাতাসে রয়েছেন। কাজ করেন। দেশে টাকা পাঠান। তাদের মধ্যে অন্য কোনো চিন্তা নেই। এসব ভেসে থাকা বাংলাদেশিদের আবার ফ্রি চিকিৎসা সহায়তা দেন রিমারা।

গেমস শেষে বাংলাদেশে ফিরব। আমেরিকা প্রবাসী আমার বাবা-মা এখন বাংলাদেশে। মায়ের প্রসঙ্গ উঠতেই রিমার চোখের কোণ ভিজে ওঠে। ওর মা-বাবা নেই। চোখের জল টপ টপ করে পড়ছে। টিস্যু এগিয়ে দিলাম। কিন্তু এই জল তো টিস্যু দিয়ে মোছার নয়!

‘সবকিছুই যেন পরেরবার’

 মোজাম্মেল হক চঞ্চল, বার্মিংহাম থেকে 
০৭ আগস্ট ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

গতি-সম্রাজ্ঞীদের দেখতে হলে সকাল ৮টার মধ্যে পৌঁছতে হবে আলেকজান্ডারে। ২০০ মিটার স্প্রিন্টের সেমিফাইনাল। কে মিস করতে চায়। বৃহস্পতিবার রাতে ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম। শুক্রবার সকালে হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায়। সহকর্মী দুই সাংবাদিক তখনও ঘুমিয়ে। চারদিকে ফর্সা। মিস করলাম নাকি! সকাল সাড়ে ৬টা। অ্যালার্ম দিয়ে রেখেছিলাম ৭টার। এই প্রথম সময়কে হার মানাতে পেরে ভালো লাগল। মেইন প্রেস হাবে না গিয়ে বাস ধরে সোজা আলেকজান্ডারে পৌঁছে যাই সাড়ে ৭টার মধ্যে। সুবিশাল মিডিয়া গ্যালারিতে বসে রয়েছি। একদিকে চলছে স্প্রিন্টের হিট। ওদিকে চলছে মহিলাদের হাইজাম্প, পুরুষদের শটপুট, হ্যামার থ্রো। ৩০ হাজার দর্শক। সবার দৃষ্টি থম্পসন, ওইটিদের দিকে। ফেভারিটদের সবাই হিটে উতরে গেলেন। আমাদের অ্যাথলেটরা প্রথম রাউন্ডেই বিদায় নিলেন।

মন খারাপ। বিষয়টা শেয়ার করলাম পাশে বসা জ্যামাইকান সাংবাদিক জ্যানডলের সঙ্গে। জ্যামাইকান অ্যাথলেটিক্স যেখানে বিশ্ব শাসন করছে, সেখানে আমরা এই গ্রহের কোথায় অবস্থান করছি তার কোনো খবরই নেই। মন খারাপ বুঝতে পেরে জ্যানডল বললেন, ‘ও কিছু না। মন খারাপ করো না। ভিক্টোরিয়ায় তোমরা পারবে।’

জ্যানডল ঠিকই বলেছে। আমাদের সবকিছুই যেন পরেরবার।

বার্মিংহাম এসেছি প্রায় দু’সপ্তাহ হলো। ফেসবুকের কল্যাণে আমার গেমস কভারের কথা সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে। যে কারণে ইংল্যান্ডের নানা প্রান্তরে ছড়িয়ে থাকা আমার বন্ধুরা যোগাযোগ করছে। আমি যখন ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে বুঁদ তখন ফোন আসে ফিদার। একসঙ্গে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেছি। ওর মা সেলিমা খাতুন আমাদের ঢাকা কলেজের প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক ছিলেন। প্রয়াত পরমাণু বিজ্ঞানী ওয়াজেদ মিয়ার ভাগ্নি সেলিমা আপা প্রধানমন্ত্রীর পিএস, বিশেষ সহকারী হয়েছিলেন। ফিদার খালাতো বোন মাহবুবা গিনি সংসদের হুইপ। একসময় ভালোমানের অ্যাথলেট ছিলেন। কলেজ জীবনের কত স্মৃতি ফিদাদের সঙ্গে। ইংল্যান্ড প্রবাসী রুশদি, পরশ, শ্যামল, ফার্মাসিস্ট মিরাজ, ডা. জাভেদ, ব্যারিস্টার মওদুদ, ব্যারিস্টার বুলবুল কিংবা শিমুলরা দেশ ছেড়ে চলে এসেছে। ওদের মতো প্রতিভাবানরা কিসের নেশায় বিদেশ বিভূঁইয়ে? প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছি। একজন ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করতে দেশের কত টাকা খরচ হয়? হিসাব জানা নেই। দেশে ফিরে গিয়ে খোঁজ নিতে হবে।

বার্মিংহামেই দেখা পেলাম ডা. রিমার (ছদ্ম নাম)। ময়মনসিংহ মেডিকেলের ছাত্রী ছিল। আমার খুবই ভালো বন্ধু। সিটি সেন্টারে কফি খেতে খেতে রিমার সঙ্গে অনেক গল্প হলো। একবার আমাদের বন্ধু লিয়ন খুব আবেগ নিয়ে বলেছিল, ‘দোস্ত আমার বুকে ব্যথা।’ বুকের কোন পাশে ব্যথা? বাম পাশে।

রিমা বিজ্ঞের মত অনেক কথা বলল। ফুসফুস, হার্টের সমস্যা, গ্যাস্ট্রিক আলসার অনেক কিছু বুঝাইলো।

চরম বিরক্ত হয়ে লিয়ন বলেছিল, ‘বুকের বামপাশে ব্যথা মানে শুধু অসুখ বুঝ, কিন্তু ভালোবাসা বুঝ না।’

রিমা অবাক, ‘ওহ এই সমস্যা? সরি দোস্ত! এই ব্যাপারে কোনো হেল্প করতে পারছি না। তুই বরং ভালো দেখে একজন সাইক্রিয়াটিস্ট দেখা।’

আমরা তখন হেসেই খুন।

রিমা এখানে মস্তবড় ডাক্তার। বেশ কয়েকবার কিসব অ্যাওয়ার্ড পেয়েছে। এক ক্লাসম্যাটকে বিয়ে করেছিল। এখন সিঙ্গেল আছে। ওর স্বপ্ন অনেক বড়। দেশে ফিরে বিশেষায়িত হাসপাতাল করতে চায়। এ নিয়ে বেশ দৌড়ঝাঁপ করছে।

রিমারা যখন এই দেশে সর্বোচ্চ সেবা দিয়ে চলছেন, তখন বিপরীত চিত্রও আছে। আরেক গ্রুপ রয়েছে এখানে। উন্নত জীবনের আশায় নানা উপায়ে এসে আশ্রয় খোঁজেন অনেক বাংলাদেশি। তাদের কারও জীবন ইংল্যান্ডের জেলখানায় হলেও কেউ কেউ সরকারের অনুকম্পায় মুক্ত বাতাসে রয়েছেন। কাজ করেন। দেশে টাকা পাঠান। তাদের মধ্যে অন্য কোনো চিন্তা নেই। এসব ভেসে থাকা বাংলাদেশিদের আবার ফ্রি চিকিৎসা সহায়তা দেন রিমারা।

গেমস শেষে বাংলাদেশে ফিরব। আমেরিকা প্রবাসী আমার বাবা-মা এখন বাংলাদেশে। মায়ের প্রসঙ্গ উঠতেই রিমার চোখের কোণ ভিজে ওঠে। ওর মা-বাবা নেই। চোখের জল টপ টপ করে পড়ছে। টিস্যু এগিয়ে দিলাম। কিন্তু এই জল তো টিস্যু দিয়ে মোছার নয়!

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন