মাদকবিরোধী অভিযানে গেলে ফায়ারিং তো হবেই

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

  যুগান্তর রিপোর্ট ১০ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, যেখানে মাদক সেখানে অবৈধ টাকা ও অস্ত্র থাকে। তাই অভিযান চালাতে গেলে ফায়ারিং তো হবেই। শনিবার রাজধানীর বিআইআইএসএস অডিটরিয়ামে ‘মাদকবিরোধী অভিযান ও সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি’- শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এ কথা বলেন। আলোচনায় অন্য বক্তারা চলমান মাদকবিরোধী অভিযান ও বন্দুকযুদ্ধের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এ অভিযান শুরুর পর অনেকে আমাকে ফোন করে প্রশংসা করেছেন। একজন স্ত্রী তার স্বামীকে ক্রসফায়ারে দেয়ার আহ্বান জানান। তবে এ অভিযানে শুধু যে বন্দুকযুদ্ধ হচ্ছে তা না। আমাদের কারাগারের ধারণক্ষমতা ৩৫ হাজার। বর্তমানে সেখানে ৮৬ হাজার ৩৩৯ বন্দি রয়েছেন, যার ৩৯ শতাংশ মাদকের সঙ্গে জড়িত। অভিযানে অনেককে গ্রেফতার করে মামলা ও সাজা দেয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, অভিযান কাউকে হত্যার উদ্দেশে নয়। বিএনপিকে কোণঠাসা করার উদ্দেশেও নয়। দেশ, মেধা ও তরুণ সমাজকে বাঁচাতেই এ অভিযান।

মন্ত্রী বলেন, আমরা অলআউট যুদ্ধে গেছি। এ যুদ্ধে জিততে হবে। আমরা বর্ডার সিল করেছি। কোস্টগার্ডকে শক্তিশালী করছি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াচ্ছি। অপরাধীদের বিচারের সম্মুখীন করছি। কাউকে মাদকের ব্যবসা করতে দেয়া হবে না।

মাদক আইনের সংস্কারের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, মাদক আইনে সিসাকে মাদক হিসেবে ধরা হয়নি। কিন্তু বর্তমানে ক্লাব-রেস্টুরেন্টগুলোতে তরুণরা গিয়ে সিসা টানছে। অনেক সময় ভেতরে হিরোইনের গুঁড়া দিচ্ছে। এই ভয়াবহতার কারণে আইন সংস্কার করে সিসাকে মাদকে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।

বাংলাদেশে ইয়াবার প্রবেশ বন্ধের প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, নাফ নদী অন্যতম একটি রুট হওয়ায় আমরা ওই নদীতে জেলেদের মাছ ধরা বন্ধ করেছি। মিয়ানমারের সঙ্গে এ বিষয়ে কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই করেছি। মিয়ানমার সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করলেও কাজ হয়নি। স্টেট কাউন্সিলর অং সান সুচিকে আমি নিজে বলেছি, মিয়ানমারে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইয়াবার ব্যবসায় হচ্ছে। আপনারা এসব বন্ধ করার উদ্যোগ নিন। কিন্তু মিয়ানমার সহযোগিতা করেনি। অভিযানে টেকনাফের কাউন্সিলর একরাম নিহতের বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, তদন্ত চলছে, ভুল করলে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক জামাল উদ্দীন আহমেদের সভাপতিত্ব অনুষ্ঠানে মেজর মো. আখতারুজ্জামান (অব.) বলেন, ‘মাদক ব্যসায়ীরা মানুষ নয়। তাদের বেঁচে থাকার অধিকার নেই। আমি মাদকবিরোধী এ অভিযানকে (বন্দুকযুদ্ধ) স্বাগত জানাই। বাংলাদেশে যাকেই জিজ্ঞেস করবেন সেই বলছে অভিযান ভালো হয়েছে। মাদক ব্যবসায়ীদের ধরলে তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী পাওয়া যায় না, কেউ সাহায্য করে না, তাহলে তাদের বিচার কিভাবে হবে?’

সংসদ সদস্য নুরজাহান বেগম মুক্তা বলেন, এ সরকার গলায় কিছু রাখে না। সবসময় ঝেড়ে কাশি দেয়। মাদক ব্যবসায়ী সংসদের ভেতরে-বাইরে যেখানেই থাকুক তাকে ধরা হবে। ইয়াবার আমদানি বন্ধে তিনি নাফ নদীতে মাছ ধরা বন্ধের পরামর্শ দেন।

পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) ড. এম এনামুল হক বলেন, মাদক সমস্যার জন্য দীর্ঘমেয়াদি সমাধান ভাবতে হবে। প্রয়োজনে সময় নিন, ট্রাইব্যুনাল গঠন করে মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করুন। একতরফাভাবে বন্দুকযুদ্ধের ঘটনা না ঘটিয়ে তাদের সুযোগ দিতে হবে। দেশে আইনের অভাব নেই, কিন্তু এর প্রয়োগ নেই। শুধু অভিযান চালালেই হবে না মূল্যায়ন করতে হবে অভিযান কেমন হল।

বিশিষ্ট মনোবিজ্ঞানী অধ্যাপক মেহতাব খানম বলেন, মাদকের বিরুদ্ধে ঘর থেকে সচেতনতা দরকার। পিতামাতাদের শিক্ষিত হতে হবে। একজন সন্তানকে জন্ম দেয়ার আগে তাদের সন্তান লালনপালনের জ্ঞান নেয়া উচিত। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে মাদক সমাজের বড় ব্যাধি হলেও ভবিষ্যতে ইন্টারনেট আসক্তি আরও ভয়াবহ হবে। একটি গবেষণা বলছে, সব বয়সী মানুষ প্রতি ৭ মিনিট পর পর একবার মোবাইল ব্যবহার করছে- যা উদ্বেগজনক। ইন্টারনেট হোক কিংবা মাদক, যে কোনো দমনের ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিকার চিন্তা করতে হবে। গুটি কয়েক মানুষ মেরে মাদক সমস্যার সমাধান উচিত নয়।

বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেন, টেকনাফের সংসদ সদস্য বদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বললেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন তার বিরুদ্ধে কোনো তথ্যপ্রমাণ নেই। আমি জানতে চাই টেকনাফের কাউন্সিলর একরাম হত্যায় তার বিরুদ্ধে মন্ত্রীর কাছে কি প্রমাণ আছে? প্রধানমন্ত্রীও তার সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতেই অভিযান চলছে। তাহলে একরামের বিরুদ্ধে এখনও পর্যন্ত কোনো তথ্য দেখাতে পারেননি কেন?

আওয়ামী লীগের আইনবিষয়ক সম্পাদক শ ম রেজাউল করিম বলেন, আগে মাদকের মামলায় নিু আদালতে জামিন না পেয়ে সবাই সুপ্রিমকোর্টে আসত। সেখান থেকে জামিন নিয়ে যেত। একটা কোর্টই ছিল যেটার নাম হয়ে গিয়েছিল ‘মাদকের কোর্ট’। আমি অবাক হই মাদকের সাড়ে ৪ হাজার মামলা পেন্ডিং কিন্তু এটার বিচারের জন্য আলাদা কোর্ট নেই। অথচ স্বামী-স্ত্রীর বিবাদ মেটাতে পরিচালিত হয় ১০টা কোর্ট। মাদকের মামলাগুলো নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ও আলাদা কোর্টের ব্যবস্থা করা দরকার।

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সরকারের এ অভিযান একটি ভুল পদক্ষেপ। কোনো মতেই বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করা উচিত না। ইয়াবা বন্ধ করা না করা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর হাতে। উনি চাইলেই বন্ধ করতে পারবেন। উনি যদি বর্ডারে সত্যিকারের ভালো লোক বসাতে পারেন তাহলেই তা বন্ধ করা সম্ভব। জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী কাজী ফিরোজ রশিদ বলেন, অভিযান নিয়ে মানবাধিকার সংস্থাগুলো অনেক কথা বলে। অথচ মাদকাসক্তরা নিজেরাও ধ্বংস হয়, তাদের সঙ্গে একটি পরিবারও ধ্বংস হয়। আমি অনেক পরিবার দেখেছি যারা মাদকাসক্তের কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন মানবাধিকার কমিশন কোথায় থাকে। আমি এ অভিযানের পক্ষে। যারা মাদক দিয়ে সমাজকে ধ্বংস করছে তাদের গুলি করতে হবে। এ অভিযান থেকে পিছপা হলে জাতিকে অনেক পিছিয়ে যেতে হবে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দীন আহমেদ বলেন, মাদকের আগ্রাসন তৃণমূলে পৌঁছে গেছে। যারা মাদক ব্যবসা করে এখন গা ঢাকা দিয়েছে, তাদের আমরা যত বেশি অস্থির রাখতে পারব অভিযানে তত বেশি সফলতা আসবে। একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বলেন, মাদক সঙ্গে না পেলে আইন কাউকে ধরতে সাপোর্ট করে না। তাই আইনের সংস্কার চলছে। নতুন আইনে মাদকের পেছনের ব্যক্তিরাও শাস্তির আওতায় আসবে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৯

converter
×