নির্বাচনী ঈদ

টাকা যাচ্ছে গ্রামে

জাকাত-ফেতরার নগদ অর্থ ও বিভিন্ন সমগ্রী নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা * জমে উঠেছে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প ব্যবসা * সরকারের উন্নয়ন প্রকল্পে খরচের ধুম

  মনির হোসেন ১৪ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

টাকা যাচ্ছে গ্রামে
রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে পণ্য উৎপাদনের ধুম পড়েছে

প্রতি ঈদে গ্রামে টাকার প্রবাহ বাড়লেও এবারে এর গতি বেড়েছে কয়েকগুণ। জাতীয় সংসদ ও বেশ কয়েক স্থানে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে সৃষ্টি হয়েছে এমন পরিস্থিতির। জাকাত, ফেতরার নগদ অর্থ ও বিভিন্ন সমগ্রী নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ছুটছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

রমজান ও ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে তাদের ছবি সংবলিত পোস্টার-ব্যানারে ছেয়ে গেছে সারা দেশের বিভিন্ন গ্রাম। এ বাবদও খরচ হচ্ছে মোটা অঙ্কের অর্থ। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে রেমিটেন্স (প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ)। এছাড়াও অর্থবছর শেষ হয়ে আসায় সরকারি বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের খরচে ধুম পড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ টাকার বড় অংশই যাচ্ছে ভোগ-বিলাসে। আর কিছু অংশ যাচ্ছে গ্রামের বিভিন্ন ক্ষুদ্র ও কুঠির শিল্পভিত্তিক উৎপাদন খাতে। টাকার প্রবাহের কারণে মূল্যস্ফীতি হয়। সবকিছু মিলে টাকার স্রোত বইছে গ্রামের দিকে।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রমজান এবং ঈদের মতো উৎসব এলেই বাড়তি টাকার প্রবাহে সচল হয়ে উঠে গ্রামের অর্থনীতি। ফলে নিু আয়ের মানুষের হাতেও টাকা যাচ্ছে।

এতে তাদের ক্রয় ক্ষমতা বাড়ছে। এটি ইতিবাচক দিক। তবে বাড়তি টাকার প্রবাহের কারণে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়। এজন্য ঈদের পরে ওই টাকা উৎপাদন খাতে নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ থাকা জরুরি।

জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি চাকরিজীদের বোনাসের একটি অংশ ইতিমধ্যে গ্রামে চলে গেছে। ঈদ ও রোজার বাড়তি খরচ মেটাতে কৃষকের ঘরে মজুদ ধান বা অন্যান্য ফসলের একটি অংশ বিক্রি শুরু হয়েছে।

বিশেষ করে রাজশাহী, দিনাজপুর অঞ্চলের আম-লিচু বিক্রির টাকাও এখন যাচ্ছে গ্রামে। অর্থবছরের শেষ সময় হওয়ায় কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যাংকগুলোকে আরও বেশি টাকা বিতরণ করতে হবে।

ঈদ শুভেচ্ছায় অর্থ খরচ : চলতি বছরের ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় নির্বাচন হওয়ার কথা। নির্বাচন সামনে রেখে গ্রামে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের তৎপরতা বাড়ছে। ঈদ শুভেচ্ছায় তারা কোটি টাকা পর্যন্ত ব্যয় করছেন। গ্রামগঞ্জের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে শোভা পাচ্ছে নেতাকর্মীদের ঈদ শুভেচ্ছার ডিজিটাল ব্যানার, পোস্টার ও বোর্ড। বিশেষ করে এবার রাজনীতির মাঠে এসেছে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নতুন মুখ।

তারা পরিচিত পেতে ঈদ শুভেচ্ছায় অঢেল টাকা ব্যয় করছেন। এছাড়া মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য গরিব, দুস্থ, এতিমদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন তারা। ধুম পড়েছে জাকাতের কাপড় বিতরণের।

গ্রামীণ কুটির শিল্প : রোজা ও ঈদকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোতে পণ্য উৎপাদনের ধুম পড়েছে। কারণ ঈদের কারণে এগুলোর বাড়তি চাহিদা তৈরি হয়েছে। টাঙ্গাইলের তাঁতের শাড়ির চাহিদা রয়েছে দেশব্যাপী।

এ চাহিদা মেটাতে ওই এলাকায় তাঁত মালিক ও তাঁতিদের ঘুম নেই। বগুড়া-সিরাজগঞ্জ অঞ্চলের লুঙ্গি ও তাঁতের কাপড় সারা দেশে ব্যাপকভাবে চলছে। ফলে এ টাকাও গ্রামে। মুন্সীগঞ্জের রুহিতপুরী তাঁতের কাপড়ের চাহিদাও তুঙ্গে।

আর ঈদের সময় চাহিদা বাড়ে গাজীপুরের কালীগঞ্জের টাওয়ালের। নরসিংদীর বাবুর হাটে তো ক্রেতার চাপ সামলাতে জেলা প্রশাসন থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছিল। একই অবস্থা নারায়গঞ্জের রূপগঞ্জে তাঁতের পাইকারি বাজারে। রূপগঞ্জের রূপসীর জামদানি শাড়ি সারা দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও চলে যাচ্ছে। তাঁতের তৈরি কাপড়ের চাহিদা বাড়ায় ঢাকাকেন্দ্রিক ফ্যাশন হাউস ও বস্ত্র ব্যবসায়ীরা এখন তাঁতিদের কাছ থেকে কাপড় সংগ্রহ করেন। এসব মিলে গ্রামীণ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পগুলোও বেশ জমজমাট ব্যবসা করেছে।

ব্যাংকিং খাত : বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, দেশের ৫৭টি ব্যাংকের ৯ হাজার শাখা রয়েছে সারা দেশে। এর মধ্যে গ্রামীণ শাখা ৫ হাজার ৪৯টি। যা মোট শাখার ৫৭ দশমিক ১১ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকিং খাতে শহুরে শাখার চেয়ে গ্রামীণ শাখাই বেশি।

ব্যাংকগুলোতে গ্রামের আমানতের পরিমাণ ২ লাখ কোটি টাকা এবং ঋণের পরিমাণ ৮০ হাজার কোটি টাকা। রোজা ও ঈদ উপলক্ষে এ টাকার একটি অংশও গ্রামে খরচ হবে। এছাড়া এনজিও ও গ্রামীণ ব্যাংক থেকেও টাকার প্রবাহ বাড়বে। গ্রামীণ ব্যাংক তাদের সদস্যদের চাহিদা অনুযায়ী টাকার জোগান দিতে ইতিমধ্যে প্রস্তুতি নিয়েছে।

রেমিটেন্স : রোজায় প্রতি বছরই রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়ে। রমজান ও ঈদে বাড়তি খরচের জন্য প্রবাসীরা তাদের স্বজনদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ পাঠান। এর বড় অংশই যাচ্ছে গ্রামে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, মে মাসে ১৪৯ কোটি ডলার রেমিটেন্স এসেছে। আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে যা ২১ কোটি ডলার বেশি। আর জুনে রেমিটেন্স আরও বাড়বে। স্বাভাবিক প্রতি বছরই ঈদের মাসে রেমিটেন্স বাড়ে।

জাকাত : ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইর হিসাবে প্রতি বছর জাকাত ও ফিতরা বাবদ খরচ হচ্ছে প্রায় ৭০ হাজার কোটি টাকা। এ টাকার বড় অংশই চলে যায় গ্রামে। এছাড়া রোজা ও ঈদে নানা কর্মসূচিতে শহরের চাকরিজীবীরা গ্রামে যাচ্ছেন। যে কারণে টাকার প্রবাহ বাড়ছে। এছাড়া গ্রামের দরিদ্র মানুষের সহায়তায় শহরের লোকজন সাধ্য অনুযায়ী অর্থের জোগান দিচ্ছেন।

মৌসুমি ফল বিক্রির টাকা : কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্যমতে, রাজশাহী ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ বছর আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ৫ লাখ টন। এর মধ্যে রাজশাহীতে ২ লাখ ৬০ হাজার টন এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২ লাখ ৮০ হাজার টন। উৎপাদিত আমের মূল্য প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা। এছাড়াও লিচু, কাঁঠাল, জাম, আনারস এবং জামরুলসহ সব মৌসুমি ফল বিক্রির টাকাও গ্রামে যাচ্ছে। এতে করে ওইসব অঞ্চলের অর্থনীতি এখন চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

কৃষি ঋণ : চলতি ২০১৭-১৮ অর্থবছরে সরকারের কৃষিঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ২০ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। জুলাই থেকে মার্চ পর্যন্ত ৯ মাসে বিতরণ করা হয়েছে ১৬ হাজার কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ৮০ শতাংশ। ফলে জুনের মধ্যে আরও ২০ শতাংশ ঋণ বিতরণ করতে হবে। এ হিসাবে টাকার পরিমাণ দাঁড়ায় ৪ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। আর বাড়তি ঋণ বিতরণের জন্য ব্যাংকগুলো চাপে রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কৃষি ঋণের উল্লেখযোগ্য একটি অংশ চলে যায় ভোক্তা খাতে।

সরকারি বরাদ্দ : চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচন খাতে বরাদ্দ ২০ হাজার ৭০১ কোটি টাকা। এসব অর্থ ব্যয় হচ্ছে, ভিক্ষাবৃত্তির অবসান, মাতৃত্বকালীন ভাতা, বয়স্কভাতা, মুক্তিযোদ্ধা ভাতা, বিধবা ভাতা, এতিম শিশুদের জন্য বরাদ্দ, উপবৃত্তি, একটি বাড়ি একটি খামার, অতি দরিদ্রদের কর্মসংস্থান, ভিজিডি, ভিজিএফ, কাবিখা ইত্যাদি খাতে। এর সুবিধাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৩ কোটি। এ টাকার বড় অংশই ব্যয় গ্রামে। ফলে রমজান এবং ঈদে গ্রামে এর প্রভাব পড়ে।

মূল্যস্ফীতি : গত বছরও রমজান ছিল জুনে। ফলে বাড়তি টাকার প্রবাহের কারণে মূল্যস্ফীতি হয়েছে। মে-তে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ। রমজান ও ঈদের কারণে জুন মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশে উন্নীত হয়। তবে জুলাইয়ে তা কমে ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশে নেমে আসে। চলতি বছরের মে মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে, এ বছরও জুনে আরও মূল্যস্ফীতি হবে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.