বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকটের ভয়াবহ চিত্র
jugantor
পানি শুনানি
বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকটের ভয়াবহ চিত্র

  রাজশাহী ব্যুরো  

০১ অক্টোবর ২০২২, ০০:০০:০০  |  প্রিন্ট সংস্করণ

বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকটের ভয়াবহ চিত্র

বরেন্দ্র অঞ্চলের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে বিশুদ্ধ খাবার পানির চরম সংকটে ভুগছেন। এ অঞ্চলে প্রতি বছর পানিস্তর নেমে যাচ্ছে। হস্তচালিত নলকূপ তো দূরের কথা গভীর নলকূলেও পানি উঠছে না ঠিকমতো। বছরের অধিকাংশ সময় পানির অন্যতম উৎস্য পুকুর-জলাশয়েও পানি থাকছে না। ফলে বরেন্দ্র এলাকার মানুষের পানির কষ্ট সারা বছরের। ২১ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা পৌর এলাকায় দুটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আয়োজনে ‘পানি শুনানি’ অনুষ্ঠিত হয়। নানা দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে শুনানিতে আসেন স্থানীয়রা এবং তাদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন।

পানি শুনানির বিবরণ থেকে জানা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের মধ্যখানে অবস্থিত মুন্ডুমালা পৌরসভার আয়তন ৩১ দশমিক ৪৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার। পৌরসভায় পরিবারের সংখ্যা ৫ হাজার ৫৪১টি। কাগজে-কলমে পানি সরবরাহে হস্তচালিত নলকূপের সংখ্যা ১৮০টি। ‘তারা’ টিউবওয়েলের সংখ্যা ২০টি। পৌর এলাকায় বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ পরিচালিত গভীর নলকূপ আছে ৬০টি। পানি সরবরাহ লাইনের দৈর্ঘ্য ৬০ কিলোমিটার। পানি রিজার্ভার ৩৬০টি। তবে অধিকাংশ টিউবওয়েল প্রায় অকেজো। পানিস্তর নিচে চলে যাওয়ায় এসব টিউবওয়েলে পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

মুন্ডুমালা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বারসিক ও বরেন্দ্র যুব সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত পানি শুনানিতে বেশি সংখ্যায় আসেন এলাকার আদিবাসী নারীরাই। শুনানিতে অংশ নেওয়া ক্রিস্টিনা হেমব্রম (৫০) জানান, তার বাড়ির আশপাশে কোনো টিউবওয়েল নেই। বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয় এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরের গভীর নলকূপ থেকে। একদিন পানি আনতে গিয়ে পিছলে পড়ে ক্রিস্টিনা কোমরে গুরুতর আঘাত পান। কিন্তু টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি। ফলে তিনি বেশ কিছুদিন অন্যের মাধ্যমে খাবার পানি সংগ্রহ করেছেন।

পিরানপুকুর গ্রামের আঙুরি বেগম (৪০) পানি শুনানিতে তুলে ধরেন ভয়াবহ চিত্র। তিনি জানান, তার বাড়ির আশপাশে পানির কোনো উৎসই নেই। অনেক কষ্ট করে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। পানির অভাবে তার তিনটা ছাগল মারা গেছে। পানি সংকটের কারণে তারা পশুপালন করতে পারে না। পশুপালনের জন্য পুকুরের পানি তাদের একমাত্র ভরসা ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরের খরা ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে পুকুরগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এখন কোথাও পানি নেই।

শুনানিতে মুন্ডুমালার মিশনপাড়ার সুজল্লা মার্ডি বলেন, পানির অভাবে আমার একমাত্র সম্বল একটি গরু মারা গেছে। আদিবাসী নারী আলকিসকু হেমব্রেম (৪৬) জানান, তারা বছরব্যাপী শুধু খাবার পানি সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন। পানি সংকটের কারণে একদিন পর পর গোসল করেন। ইচ্ছা থাকলেও গরু-ছাগল পালন করতে পারেন না। বাড়ির আশপাশে কিছু ফাঁকা জায়গা থাকলেও সেখানে শাকসবজি চাষ করতে পারেন না।

জানা গেছে, মুন্ডুমালায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচলের জন্য জলবায়ু তহবিল থেকে প্রায় ৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় সাবমার্সিবল পাম্প বসানো হয়েছিল। পুকুর খনন করা হয়েছিল। কিন্তু এসব সাবমার্সিবল পাম্প এখন অকেজো। পুকুর খননের কাজ ঠিকমতো না হওয়ায় সেগুলোও পানিশূন্য।

পানি শুনানিতে অংশ নিয়ে মুন্ডুমালা পৌরসভার মেয়র সাইদুর রহমান জানান, তার আমলে ২৫০টি সাবমার্সিবল পানির পাম্প বসানো হয়েছে। কিন্তু পাম্পগুলো এখন অকেজো হয়ে পড়েছে। মুন্ডুমালা পৌরসভা এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিস্তর ১২০ ফুটেরও নিচে চলে গেছে। ফলে গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না। মেয়র অন্য এলাকা থেকে ড্রেন অথবা পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের দাবি করেন।

পানি শুনানিতে গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলে অনাবৃষ্টি, তীব্র দাবদাহসহ কিছু কিছু এলাকায় পানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শুনানিতে কৃষি খাতে পানি সংকটের চিত্র তুলে ধরেন বরেন্দ্র অঞ্চল জনসংগঠন ফোরামের সভাপতি কৃষক নূর মোহাম্মদ।

পানি শুনানি

বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকটের ভয়াবহ চিত্র

 রাজশাহী ব্যুরো 
০১ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ
বরেন্দ্র অঞ্চলে পানি সংকটের ভয়াবহ চিত্র
ফাইল ছবি

বরেন্দ্র অঞ্চলের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে বিশুদ্ধ খাবার পানির চরম সংকটে ভুগছেন। এ অঞ্চলে প্রতি বছর পানিস্তর নেমে যাচ্ছে। হস্তচালিত নলকূপ তো দূরের কথা গভীর নলকূলেও পানি উঠছে না ঠিকমতো। বছরের অধিকাংশ সময় পানির অন্যতম উৎস্য পুকুর-জলাশয়েও পানি থাকছে না। ফলে বরেন্দ্র এলাকার মানুষের পানির কষ্ট সারা বছরের। ২১ সেপ্টেম্বর রাজশাহীর তানোর উপজেলার মুন্ডুমালা পৌর এলাকায় দুটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার আয়োজনে ‘পানি শুনানি’ অনুষ্ঠিত হয়। নানা দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে শুনানিতে আসেন স্থানীয়রা এবং তাদের ভোগান্তির কথা তুলে ধরেন।

পানি শুনানির বিবরণ থেকে জানা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলের মধ্যখানে অবস্থিত মুন্ডুমালা পৌরসভার আয়তন ৩১ দশমিক ৪৫ বর্গকিলোমিটার। জনসংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার। পৌরসভায় পরিবারের সংখ্যা ৫ হাজার ৫৪১টি। কাগজে-কলমে পানি সরবরাহে হস্তচালিত নলকূপের সংখ্যা ১৮০টি। ‘তারা’ টিউবওয়েলের সংখ্যা ২০টি। পৌর এলাকায় বরেন্দ্র কর্তৃপক্ষ পরিচালিত গভীর নলকূপ আছে ৬০টি। পানি সরবরাহ লাইনের দৈর্ঘ্য ৬০ কিলোমিটার। পানি রিজার্ভার ৩৬০টি। তবে অধিকাংশ টিউবওয়েল প্রায় অকেজো। পানিস্তর নিচে চলে যাওয়ায় এসব টিউবওয়েলে পানি পাওয়া যাচ্ছে না।

মুন্ডুমালা আদিবাসী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা বারসিক ও বরেন্দ্র যুব সংগঠনের উদ্যোগে আয়োজিত পানি শুনানিতে বেশি সংখ্যায় আসেন এলাকার আদিবাসী নারীরাই। শুনানিতে অংশ নেওয়া ক্রিস্টিনা হেমব্রম (৫০) জানান, তার বাড়ির আশপাশে কোনো টিউবওয়েল নেই। বিশুদ্ধ খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয় এক থেকে দেড় কিলোমিটার দূরের গভীর নলকূপ থেকে। একদিন পানি আনতে গিয়ে পিছলে পড়ে ক্রিস্টিনা কোমরে গুরুতর আঘাত পান। কিন্তু টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারেননি। ফলে তিনি বেশ কিছুদিন অন্যের মাধ্যমে খাবার পানি সংগ্রহ করেছেন।

পিরানপুকুর গ্রামের আঙুরি বেগম (৪০) পানি শুনানিতে তুলে ধরেন ভয়াবহ চিত্র। তিনি জানান, তার বাড়ির আশপাশে পানির কোনো উৎসই নেই। অনেক কষ্ট করে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়। পানির অভাবে তার তিনটা ছাগল মারা গেছে। পানি সংকটের কারণে তারা পশুপালন করতে পারে না। পশুপালনের জন্য পুকুরের পানি তাদের একমাত্র ভরসা ছিল। কিন্তু গত কয়েক বছরের খরা ও কম বৃষ্টিপাতের কারণে পুকুরগুলো শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। এখন কোথাও পানি নেই।

শুনানিতে মুন্ডুমালার মিশনপাড়ার সুজল্লা মার্ডি বলেন, পানির অভাবে আমার একমাত্র সম্বল একটি গরু মারা গেছে। আদিবাসী নারী আলকিসকু হেমব্রেম (৪৬) জানান, তারা বছরব্যাপী শুধু খাবার পানি সংগ্রহে ব্যস্ত থাকেন। পানি সংকটের কারণে একদিন পর পর গোসল করেন। ইচ্ছা থাকলেও গরু-ছাগল পালন করতে পারেন না। বাড়ির আশপাশে কিছু ফাঁকা জায়গা থাকলেও সেখানে শাকসবজি চাষ করতে পারেন না।

জানা গেছে, মুন্ডুমালায় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা সচলের জন্য জলবায়ু তহবিল থেকে প্রায় ৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এই প্রকল্পের আওতায় সাবমার্সিবল পাম্প বসানো হয়েছিল। পুকুর খনন করা হয়েছিল। কিন্তু এসব সাবমার্সিবল পাম্প এখন অকেজো। পুকুর খননের কাজ ঠিকমতো না হওয়ায় সেগুলোও পানিশূন্য।

পানি শুনানিতে অংশ নিয়ে মুন্ডুমালা পৌরসভার মেয়র সাইদুর রহমান জানান, তার আমলে ২৫০টি সাবমার্সিবল পানির পাম্প বসানো হয়েছে। কিন্তু পাম্পগুলো এখন অকেজো হয়ে পড়েছে। মুন্ডুমালা পৌরসভা এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিস্তর ১২০ ফুটেরও নিচে চলে গেছে। ফলে গভীর নলকূপেও পানি উঠছে না। মেয়র অন্য এলাকা থেকে ড্রেন অথবা পাইপ লাইনের মাধ্যমে পানি সরবরাহের দাবি করেন।

পানি শুনানিতে গবেষক পাভেল পার্থ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলে অনাবৃষ্টি, তীব্র দাবদাহসহ কিছু কিছু এলাকায় পানি সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। শুনানিতে কৃষি খাতে পানি সংকটের চিত্র তুলে ধরেন বরেন্দ্র অঞ্চল জনসংগঠন ফোরামের সভাপতি কৃষক নূর মোহাম্মদ।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন