বিচারকের নামে ঘুষ নিলেন আদালতের কর্মচারী

ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর জাল করে প্রসেস সার্ভার * তদন্তে আইনজীবী ও কর্মচারীর অপরাধ প্রমাণিত * অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ

  হাসিব বিন শহিদ ১৪ জানুয়ারি ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাজনৈতিক সহিংসতার মামলায় এক আসামিকে জামিন করাতে গিয়ে ঘুষ লেনদেনে জড়িয়ে পড়লেন আইনজীবী ও আদালতের এক কর্মচারী (প্রসেস সার্ভার)। জামিন করানোর জন্য বিচারকের কথা বলে আসামির আইনজীবীর কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নেন ওই কর্মচারী। তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের স্বাক্ষর জাল করে আসামিকে গ্রেফতারি পরোয়ানা ফেরতের কপিও সরবরাহ করেন। বিভাগীয় তদন্তে ঘুষ লেনদেনের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। ঘুষ দেয়ার জন্য আইনজীবী এবং ঘুষ নেয়ার জন্য কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করছে এ বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটি।

ওই আইনজীবীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের সচিব বরাবর চিঠি দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ওই কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঢাকা মহানগর দায়রা জজ বরাবর লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আলাদাভাবে চিঠি দুটি দিয়েছেন। এ বিষয়ে তদন্তের জন্য ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম শেখ হাফিজুর রহমান, অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মো. জসিম উদ্দিনকে দিয়ে এক সদস্যের কমিটি করে দেন। আদালত সূত্র যুগান্তরকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।

ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সহসভাপতি আবু বকর ফরহাদ এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, এ ধরনের অবৈধ কাজে বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতদের যুক্ত হওয়া লজ্জাজনক। এতে আদালতের মর্যাদা ক্ষুণœ হয়। পাশাপাশি সাধারণ বিচারপ্রার্থী মানুষ আদালতের প্রতি আস্থা হারাবে। পেশাগত অসদাচারণের জন্য তারা দু’জনই (আইনজীবী ও প্রসেস সার্ভার) সাজা পাওয়ার যোগ্য। আইনজীবীর পেশাগত অসদাচরণের কারণে বার কাউন্সিল ট্রাইব্যুনাল গঠন করে তার বিচার করতে পারে। ট্রাইব্যুনাল ওই আইনজীবীর সনদ বাতিল অথবা স্থগিত করে জরিমানা কিংবা সাজা দিতে পারে। তিনি বলেন, ঘুষ নেয়া এবং দেয়া- দুটিই সমান অপরাধ।

যুগান্তরের অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালের ডিসেম্বরে রাজনৈতিক সহিংসতায় রাজধানীর ডেমরা থানায় একটি মামলা দায়ের হয়। মামলার নম্বর ০৫(১২)১২। এ মামলায় পলাতক আসামি মো. আনোয়ার হোসেন। আদালত তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেন। তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করতে চাইলে তার আইনজীবী ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী গত বছরের ২০ জুন মামলার নথি দেখতে সংশ্লিষ্ট আদালতে যান। নথি দেখার পর কোর্টের প্রসেস সার্ভার (কর্মচারী) বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে কথা বলেন। বাচ্চু মিয়া ওই আইনজীবীকে বলেন, ম্যাজিস্ট্রেট স্যার সরাসরি আপনার আসামিকে হাজতে পাঠাবেন। তবে টাকা দিলে সবকিছু সমাধান হয়ে যাবে। কত দিতে হবে জানতে চাইলে বাচ্চু মিয়া বলেন, স্যারের জন্য ২০ হাজার, তার নিজের জন্য ২ হাজার ও পাবলিক প্রসিকিউরের (পিপি) জন্য ২ হাজার টাকা দিতে হবে।

আইনজীবী ফারুক পরদিন ২১ জুন কোর্টে এসে বাচ্চু মিয়ার কাছে ২০ হাজার টাকা দেন। এরপর আসামি আনোয়ার হোসেনকে সংশ্লিষ্ট কোর্টে আত্মসমর্পণ করান। কোর্ট থেকে পরে আদেশ হবে বলে জানানো হয়। ওই দিন বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে বাচ্চু মিয়া আইনজীবী ফারুকের মোবাইল ফোনে জানান আসামির জামিন হয়ে গেছে। তিনি পরোয়ানা ফেরতের কপি নিয়ে যেতে বলেন। আইনজীবী ফারুক আসামি আনোয়ার হোসেনকে প্রসেস সার্ভার বাচ্চু মিয়ার কাছে পাঠিয়ে দেন। আইনজীবীর কথা মতো আনোয়ার সেখানে জামিননামা জমা দিয়ে পরোয়ানা ফেরতের কপি সংগ্রহ করেন। এর কয়েক দিন পর বাচ্চু মিয়া আসামি আনোয়ার হোসেনকে ফোন দিয়ে একাধিকবার কোর্টে আনেন। স্বাক্ষর নিয়ে ছোট্ট একটা সমস্যা হয়েছে বলে বাচ্চু মিয়া আসামিকে জানান। সর্বশেষ গত বছরের ১৬ অক্টোবর বাচ্চু মিয়া আইনজীবী ফারুককে না জানিয়ে আসামি আনোয়ারকে ফোন করে কোর্টে আনেন। ওই দিন বাচ্চু মিয়া আসামি আনোয়ার হোসেনকে কোর্টে আত্মসমর্পণ করিয়ে অপরিচিত এক আইনজীবী দিয়ে জামিন শুনানি করান। কিন্তু ঢাকা মহানগর হাকিম মাহমুদা আক্তার আসামির জামিন নাকচ করে কারাগারে পাঠান।

আদালত সূত্র জানায়, পরে আইনজীবী ফারুক ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম শেখ হাফিজুর রহমানের বরাবর এ বিষয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। এর দু’দিন পর প্রসেস সার্ভার বাচ্চু মিয়া এ ঘটনায় ঘুষ হিসেবে নেয়া পুরো অর্থ ওই আইনজীবীকে ফেরত দেন। শেখ হাফিজুর রহমানের নির্দেশে অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম মা. জসিম উদ্দিন ঘুষ লেনদেনের অভিযোগটি তদন্ত করেন। তদন্ত শেষে গত বছরের ২৭ নভেম্বর ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম বরাবর তিনি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে অতিসম্প্রতি শেখ হাফিজুর রহমান অভিযুক্ত ওই আইনজীবী ও প্রসেস সার্ভারের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ বার কাউন্সিল ও ঢাকা মহানগর দায়রা জজ বরাবর লিখিতভাবে জানিয়েছেন।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রসেস সার্ভার বাচ্চু মিয়া আসামি আনোয়ার হোসেনের জামিন করিয়ে দেয়ার নামে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছেন। একই সঙ্গে আদালতের নাম ব্যবহার করে বাচ্চু মিয়া নিজেই সংশ্লিষ্ট আইনজীবী এবং আসামিকে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। এর সঙ্গে আদালত কিংবা আদালতের অপর কোনো স্টাফের বিন্দুমাত্র সংশ্লিষ্টতা নেই। প্রসেস সার্ভার বাচ্চু মিয়া আদালতের নাম ব্যবহার করে অনৈতিকভাবে ২০ হাজার টাকা গ্রহণ করেছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জামিন শুনানি না হওয়া সত্ত্বেও আইনজীবীকে আদেশ পরে হবে বলে ফাঁকি দিয়েছেন এবং বিভ্রান্ত করেছেন। বাচ্চু মিয়া কোর্ট স্টাফ হয়েও আসামির নিযুক্ত আইনজীবীর অনুমতি ছাড়া তার স্বাক্ষরিত দরখাস্তে অপর আইনজীবী দিয়ে শুনানি করিয়েছেন। তদন্ত কমিটি প্রসেস সার্ভার বাচ্চু মিয়ার বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ১৯৮৫ এর বিধি ৩-এর(বি) এবং (ডি) অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার সুপারিশ করে। আইনজীবী ফারুক আহমেদ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের বিধি অনুসারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত

 

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter