ইন্টারনেটে ভ্যাট কমাতে মোবাইল অপারেটরদের টালবাহানা

এখনও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে * এনবিআরের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে অ্যামটব

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান

আইনের মারপ্যাঁচে ফেলে মোবাইল অপারেটররা ইন্টারনেটের ভ্যাট (মূল্য সংযোজন কর) হার কমাচ্ছে না। এখনও গ্রাহকের কাছ থেকে ইন্টারনেট প্যাকেজে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে। অথচ ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণের পথে আরও একধাপ এগুতে চলতি ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বাজেটে ভ্যাট ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। এতে দাম কমে আসার কথা থাকলেও মোবাইল অপারেটরগুলো আইনের মারপ্যাঁচে ফেলে গ্রাহকদের আগের দামেই ইন্টারনেট কিনতে বাধ্য করছে।

মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটব বলছে, বাজেটে ইন্টারনেট সংস্থার ওপর ভ্যাট কমানো হয়েছে, যার সেবা কোড এস ০১২.১৪। এ সেবার কোডের ভ্যাট হার ১৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করা হয়েছে। আর মোবাইল অপারেটরগুলো টেলিকমিউনিকেশন সেবা হিসেবে সেবা কোড ০১২.১০ এর আওতাভুক্ত। এ সেবা কোডে ভয়েস কলের ওপর ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও সারচার্জ এবং ইন্টারনেটের ওপর ভ্যাট দিয়ে আসছে। সরকার ০১২.১৪ সেবা কোডের ভ্যাট কমিয়েছে। তাই ইন্টারনেট সেবার বিপরীতে ৫ শতাংশ ভ্যাট আদায়ের যৌক্তিকতার বিষয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তাছাড়া মোবাইল অপারেটরগুলো ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার (আইএসপি) হিসেবে বিটিআরসির লাইসেন্সপ্রাপ্ত নয় এবং গ্রাহকের সংযোগের মাধ্যমে ইন্টারনেট সরবরাহ করে না। মোবাইল অপারেটরগুলো হ্যান্ডসেটে সিম কার্ড বা রিম কার্ড ব্যবহারের বিপরীতে গ্রাহকদের ডাটা সার্ভিস বা ইন্টারনেট সার্ভিস দেয়। আবার মোবাইল অপারেটরগুলো ইন্টারনেট সংস্থার সংজ্ঞাতেও পড়ে না।

ইন্টারনেট সংস্থার ব্যাখ্যায় বলা আছে, টেলিফোন, টেলিপ্রিন্টার, টেলেক্স, ফ্যাক্স বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে যোগাযোগ স্থাপন, তথ্য বা উপাত্ত আদান-প্রদানের ব্যবস্থাকারী কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংস্থা। সম্প্রতি এই দুটি আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে অ্যামটব থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি দেয়া হয়েছে। এ চিঠিতে ইন্টারনেট সেবার ওপর ৫ না ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায়যোগ্য- তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। আর এ সুযোগে আগের হারেই গ্রাহকদের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে।

অ্যামটবের মহাসচিব টিআইএম নূরুল কবির যুগান্তরকে বলেন, মোবাইলে ইন্টারনেট সেবার বিপরীতে ৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপ নিয়ে আইনি জটিলতা আছে। তাই এনবিআরের কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে। এনবিআর যদি মোবাইল অপারেটরদের ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট কাটার নির্দেশনা দেয়, তাহলে সে অনুযায়ী গ্রাহকদের কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করা হবে।

যদিও এনবিআরের একটি সূত্র বলছে, মোবাইলে ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট আদায়ে আইনি জটিলতা নেই। অপারেটরগুলোই আদায় করছে না। কারণ বর্তমানে স্মার্টফোন ব্যবহারকারীরা ইন্টারনেটের মাধ্যমে ভাইবার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইমো ও ফেসবুক ম্যাসেঞ্জারের মতো অ্যাপস ব্যবহার করে ফ্রি কল, ভিডিও কল করছেন। এ কারণে ভয়েস কলের সংখ্যা কমে গেছে, যা মোবাইল অপারেটরদের রাজস্বের ওপর বিরাট প্রভাব ফেলছে।

সরকার ভ্যাট কমানোয় ইন্টারনেটের ব্যবহার বাড়বে, সঙ্গে অ্যাপসভিত্তিক কলের সংখ্যাও বাড়বে। তাই মোবাইল অপারেটররা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে পারে। অ্যামটব থেকে যে যুক্তি দেখানো হয়েছে, সেটি পুরোপুরি সঠিক নয়। কারণ ইন্টারনেট সংস্থার ব্যাখ্যায় স্পষ্টভাবে ‘টেলিফোন’ শব্দটি বলা আছে।

যদিও ৪ জুলাই অর্থমন্ত্রী সচিবালয়ে এক অনুষ্ঠানে ভ্যাট কমানোর ব্যাপারে মোবাইল অপারেটরদের হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, বাস্তবায়ন না করলে তাদের (মোবাইল অপারেটর ও ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান) বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেয়া হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে।

এক হিসাবে দেখা গেছে, গত অর্থবছরে মোবাইল অপারেটরগুলো ১৫ শতাংশ হারে ইন্টারনেট সেবার বিপরীতে প্রায় সাড়ে ৪শ’ কোটি টাকা ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দিয়েছে। অর্থাৎ গড়ে দৈনিক ১ কোটি ২৩ লাখ টাকা জমা হয়েছে। ৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিলে গড়ে দৈনিক ৪১ লাখ টাকা জমা হওয়ার কথা। কিন্তু আগের হারেই ভ্যাট নেয়ায় গ্রাহককে গড়ে দৈনিক ৮২ কোটি টাকা বেশি দিতে হচ্ছে।

মোবাইল ফোন অপারেটরদের আন্তর্জাতিক সংগঠন জিএসএমএ’র তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটি ৫০ লাখ। এ হিসাবে বাংলাদেশে প্রতি পাঁচজনে একজন ইন্টারনেট ব্যবহার করেন। অবশ্য সরকারি হিসাবে দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বর্তমানে ৮ কোটি ৮ লাখ। এর মধ্যে বেশিরভাগ তরুণ। এরা মোবাইলে ও মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে মডেমের মাধ্যমে ইন্টারনেট ব্যবহার করে।

এদিকে রাজধানীসহ মফস্বল এলাকায় তারের মাধ্যমে বাসা-বাড়িতে সংযোগ দেয়া সেবাদাতা ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানগুলোও ভ্যাট কমায়নি। যদিও ব্যবসায়ীরা বলছেন তারা ভ্যাট কমিয়েছেন। ভ্যাটের কারণে ব্যান্ডউইথের দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্রাহক পর্যায়ে তা সমন্বয় করা হয়েছে।

ইন্টারনেট সার্ভিস প্রোভাইডার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএসপিএবি) সভাপতি মোহাম্মদ আমিনুল হাকিম বলেন, সংকুচিত ভিত্তিমূল্যে ইন্টারনেটের ওপর ভ্যাট ৫ শতাংশ ধার্য করায় ব্যবসায়ীরা রেয়াত নিতে পারছেন না। এ কারণে ব্যান্ডউইথের দাম বেড়ে গেছে। এ বর্ধিত দাম সমন্বয় করা হচ্ছে, কিন্তু গ্রাহকরা মনে করছেন আগের হারে ভ্যাট নেয়া হচ্ছে। তারপরও গ্রাহকদের কাছ থেকে ৫ শতাংশ ভ্যাট আদায়ে সদস্যদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।