আজ বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস: বিশ্বে মানবাধিকারবঞ্চিত ২১ কোটি ৪০ লাখ নারী

দেশে ৫৯ ভাগ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে * বাড়িতে সন্তান প্রসব ৬২ ভাগ নারীর

প্রকাশ : ১১ জুলাই ২০১৮, ১২:১৭ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রাশেদ রাব্বি

বাংলাদেশের জনসংখ্যা। ফাইল ছবি

বর্তমান বিশ্বে ২১ কোটি ৪০ লাখ (২১৪ মিলিয়ন) নারী তাদের অতি প্রয়োজনীয় জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ব্যবহারের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ফলে তারা অনকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের শিকার হচ্ছেন।

প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে পরিবার পরিকল্পনা মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তবে এখনও এ মানবাধিকার সর্বস্তরে বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বের অন্যসব দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ (১১ জুলাই) বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস পালিত হতে যাচ্ছে।

দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য- ‘পরিকল্পিত পরিবার, সুরক্ষিত মানবাধিকর’। দিবসটি উপলক্ষে জনসংখ্যা ও উন্নয়নবিষয়ক বক্তৃতা, র‌্যালি, সেমিনার ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের তথ্যমতে, দেশে এখনও ৫৯ ভাগ মেয়ের বিয়ে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে হয়। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী বিবাহিত নারীর মধ্যে ৩১ ভাগ প্রথম বা দ্বিতীয়বার গর্ভবতী হন।

এই বয়সী কিশোরীদের পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি ব্যবহারের হার ৪৭ শতাংশ। আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের হার ৫৪ দশমিক ১ ভাগ এবং ড্রপ আউটের হার ৩০ শতাংশ। এখনও ৬২ ভাগ নারীর সন্তান প্রসব হয় বাড়িতে।

জানা গেছে, দেশে এখনও পরিবার থেকে কন্যাশিশুর বিয়ের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এমনকি বিয়ের পর সন্তান নেয়ার ক্ষেত্রে তাদের কোনো ভূমিকাও থাকে না। ফলে বাল্যবিয়ে, শিশু বিবাহ, সন্তান গ্রহণ, মাতৃমৃত্যু, শিশুমৃত্যু ইত্যাদি ক্ষেত্রে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

একই সঙ্গে এটি মানবাধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। অথচ যে কোনো দম্পতির সন্তান গ্রহণ, দুই সন্তানের মাঝে বিরতি ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার শুধু তাদের। এটি নিশ্চিত করতে পারলে খুব সহজে জনসংখ্যা সম্পর্কিত বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করা সম্ভব বলে মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের।

এ প্রসঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. কাজী মোস্তফা সারোয়ার যুগান্তরকে বলেন, সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত একটি মানবাধিকার। প্রতিটি পরিবার পরিকল্পিত হোক।

সব দম্পতি যেন স্বাধীনভাবে সন্তান গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিতে পারে, তাদের ওপর যেন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া না হয়, সেটা নিশ্চিত করতে এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ হয়েছে- ‘পরিকল্পিত পরিবার, সুরক্ষিত মানবাধিকর’।

কোনো দম্পতি কখন সন্তান গ্রহণ করবে, কয়টি সন্তান গ্রহণ করবে, দুটি সন্তানের বয়সের পার্থক্য কত থাকবে- সেই সিদ্ধান্ত অন্য কেউ চাপিয়ে দিতে পারবে না।

অর্থাৎ পরিবার পরিকল্পনা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত বাবা-মা, শ্বশুর-শাশুড়ি চাপিয়ে দিতে পারবে না। তাহলে মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে। রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য এই মানবাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, ৫০ বছর আগে মানবাধিকার সংক্রান্ত প্রথম আন্তর্জাতিক সম্মেলনে পরিবার পরিকল্পনাকে একটি মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়।

অনেক অধিকারের ভিত্তি হিসেবে পরিবার পরিকল্পনা সেবাকে বিবেচনা করা হয়, যা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও কনভেশন দ্বারা সমর্থিত। ১৯৬৯ সালের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের স্মারক ২৫৪২ (১৯) ধারার ৪ উপধারায় বলা হয়, বাবা-মা মুক্ত ও স্বাধীনভাবে সন্তান গ্রহণ এবং বিরতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।

১৯৯৪ সালে কায়রোতে অনুষ্ঠিত জনসংখ্যা ও উন্নয়ন সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সম্মেলনের ঘোষণাপত্রের ধারা ৮-এ বলা হয়, সন্তান সংখ্যা, দুই সন্তানের মাঝে বিরতি দেয়ার বিষয়টি ব্যক্তির অধিকার।

এ প্রসঙ্গে পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের আইইএম ইউনিটের উপপরিচালক জাকিয়া আখতার যুগান্তরকে বলেন, পরিবার পরিকল্পনা সেবা গ্রহণের সুযোগ নারীদের পছন্দমতো সন্তান গ্রহণের সুযোগ করে দেয়, যা নারী ও নবজাতক উভয়ের কল্যাণ বয়ে আনে।

পাশাপাশি মাতৃমৃত্যু ঝুঁকি হ্রাস করে, নারীর প্রজনন স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করে। তিনি বলেন, আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোয় কিশোরী মাতৃত্ব সামাজিক ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে বড় বাধা। তাই কিশোরী প্রজনন স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবার পরিকল্পনা সেবা নিরবচ্ছিন্ন করতে হবে।

পরিবার পরিকল্পনা অধিদফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের জনসংখ্যা ১৬ কোটি ৪০ লাখ (১৬৪ দশমিক ৬৭ মিলিয়ন)। এ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৯ কোটি ৪৫ লাখ কর্মক্ষম। যাদের মধ্যে ২৯ ভাগের বয়স ১৫ থেকে ২৪-এর মধ্যে, যা মোট জনগোষ্ঠীর ৩১ শতংশ।

এ অবস্থা ২০৩০ সাল পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দেশের দ্রুত উন্নয়ন সম্ভব। তবে বাল্যবিয়ে, কিশোরীদের গর্ভবতী হওয়া, পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণের হার বাড়ানো, ড্রপআউট বন্ধ করাসহ বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

এ বিষয়ে পরিকল্পনা অধিদফতরের মহাপরিচালক ডা. কাজী মোস্তফা সারোয়ার যুগান্তরকে বলেন, এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সাতটি অপারেশনাল প্ল্যান হাতে নেয়া হয়েছে।

এর মধ্যে রয়েছে আধুনিক পরিবার পরিকল্পনা ব্যবহারের হার ৭০ ভাগে উন্নীত করা। জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রান্তিক পর্যায়ে মেলার আয়োজন করা, গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রচার ইত্যাদি। এছাড়া দেশের জনসংখ্যা অনুপাতে জনবল নিয়োগ, প্রথম প্রসব বিলম্বিত করতে স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগসহ বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নেয়া হয়েছে।