বরিশাল সিটি নির্বাচন

আ’লীগ-বিএনপিসহ তিন মেয়র প্রার্থীকে শোকজ

জাতীয় পার্টির ভোটে থাকা, না থাকা নিয়ে গুঞ্জন * সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে সংশয়ে ৬ প্রার্থী

  শেখ মামুনূর রশীদ ও আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল থেকে ২৩ জুলাই ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন
বরিশাল সিটি কর্পোরেশন। ছবি-সংগৃহীত

বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের প্রচারে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ তিন মেয়র প্রার্থী ও দু’জন সরকারি কর্মকর্তাকে কারণ দর্শানোর (শোকজ) নোটিশ দিয়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তার দফতর।

এদিকে ভোটযুদ্ধে জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী মাঠে থাকছেন কিনা, তা নিয়ে রোববার প্রায় সারাদিন গুঞ্জন ছিল নগরবাসীর মধ্যে।

যদিও তাপস বলছেন, নির্বাচনী মাঠে তিনি থাকবেন। আর ৩০ জুলাই সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কিনা, এমন শঙ্কা প্রকাশ করেছেন ছয় মেয়র প্রার্থী। শুধু আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সাদিক আবদুল্লাহ বলেছেন নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকার কথা। কোনো রকম ভয়ভীতিতে ভীত না হয়ে ভোটারদের নিশ্চিন্তে ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

গত বুধবার বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজের অডিটোরিয়ামে একটি নির্বাচনী সভা করেন আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ। ওই সভায় অংশ নেন মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের বিভিন্ন পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

এ ঘটনা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ এবং রিটার্নিং কর্মকর্তার দফতরে অভিযোগ দাখিল হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি সম্পর্কে প্রাথমিক খোঁজখবর নিয়ে সত্যতা পাওয়ার পর সাদিক আবদুল্লাহকে কারণ দর্শানোর নেটিশ দেয় রিটার্নিং কর্মকর্তার দফতর।

একইভাবে নোটিশ দেয়া হয় শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক ডা. বাকির হোসেন এবং কলেজের অধ্যক্ষ ভাস্কর সাহাকে। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে কেন তারা এ ধরনের সভা করলেন তার ব্যাখ্যা চাওয়া হয় তাদের কাছে।

এ ছাড়া চরমোনাই পীরের রাজনৈতিক দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র মেয়র প্রার্থী মাওলানা ওবায়দুর রহমান মাহবুবকে শোকজ করা হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণায় ধর্মীয় অনুভূতি ব্যবহার করার অভিযোগে। এ ছাড়া আচরণবিধি লঙ্ঘন করে মিছিল-প্রচারণা চালানোর অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারকে।

দু’দিন আগে ওই নোটিশ দেয়া হয়। বরিশালের সিনিয়র জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা এবং সহকারী রিটার্নিং অফিসার হেলালউদ্দিন খান বলেন, ‘নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাদের নোটিশের জবাব দিতে বলা হয়েছে। ব্যর্থ হলে বা জবাব সন্তোষজনক না হলে প্রার্থিতা বাতিল কিংবা অন্য যেকোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে তাদের বিরুদ্ধে।’

বেশ জোরেশোরে নির্বাচনী মাঠে নামা জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস শেষ পর্যন্ত ভোটের মাঠে থাকছেন কিনা, তা নিয়ে গতকাল প্রায় সারা দিন গুঞ্জন ছিল নগরবাসীর মধ্যে। আওয়ামী লীগকে সমর্থন জানিয়ে জাতীয় পার্টি বরিশালের নির্বাচনী মাঠ থেকে সরে যাচ্ছে- এ ধরনের আলোচনা ছিল নগরবাসীর মধ্যে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আজ সোমবার বরিশালে আসছেন জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ। এখানে এসে আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে বসবেন তিনি। এর পরই হয়তো ঘোষণা আসবে জাতীয় পার্টির নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বরিশালে আসছেন স্বীকার করলেও প্রার্থিতা প্রত্যাহার করা বা না করা বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি ফিরোজ রশীদ।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে এই দলের মেয়র প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, ‘প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেবে দল- এমন কিছু আমার জানা নেই। বহু বছর পর এখানে নতুন উদ্যমে জেগে উঠেছে জাতীয় পার্টি। তা ছাড়া ভোটের মাঠেও আমরা শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। এখানে আমার প্রার্থিতা প্রত্যাহারে আওয়ামী লীগের তো কোনো উপকার হবে না। তাহলে তারা কেন আমার প্রত্যাহারের বিষয়টি নিয়ে ভাববে? দলীয় প্রতীক না থাকলে বরিশালে জাতীয় পার্টির কর্মী সমর্থকরা মূলত ধানের শীষে ভোট দেয়। সে ক্ষেত্রে সরকারি তরফ থেকে এরকম কোনো প্রস্তাব আসতেই পারে না। হয়তো ভেতরে কোনো ষড়যন্ত্র হচ্ছে। তা ছাড়া দল চাইলেই যে নির্বাচন থেকে সরে যাব, সেটা ভাবাও ঠিক নয়। যে পর্যন্ত এসেছি, সেখান থেকে ফিরে যাওয়ার পথ নেই। আমি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে থাকব।’

আচরণবিধি লঙ্ঘনের ছোটখাটো কিছু ঘটনা ছাড়া বরিশালে নির্বাচনী পরিবেশ প্রশ্নে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটেনি।

জামায়াতের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার বিষয়ে বিএনপি নানা অভিযোগ করলেও পরিচয় গোপন রাখার শর্তে মহানগর পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘এটি আসলে বরিশাল সিটি নির্বাচন কেন্দ্রিক কোনো বিষয় নয়। জামায়াতের বিরুদ্ধে অঘোষিত অভিযান সারা দেশেই চলছে। বরিশালও তারই একটা অংশমাত্র।’

জামায়াতের নেতাকর্মীদের গ্রেফতার এবং ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ ছাড়া বিএনপিও এখন পর্যন্ত এই নির্বাচন নিয়ে বড় ধরনের কোনো অভিযোগ করেনি। বারবারই তারা বলছে, প্রশাসনের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের কথা।

এ ক্ষেত্রে তারা বলছেন, আচরণবিধি লঙ্ঘনের পরও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে কোনো রকম ব্যবস্থা নেয়া না হওয়া প্রসঙ্গে। অবশ্য সেই অভিযোগ থেকে কিছুটা হলেও রেহাই পেয়েছে নির্বাচন কমিশন। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহকে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে তারা।

তবে এত কিছুর পরও কোথায় যেন একটা অস্বস্তি আর শঙ্কার ছায়া দেখতে পাচ্ছেন আওয়ামী লীগ ছাড়া বরিশালের অন্য ছয় মেয়র প্রার্থী। ৩০ জুলাই সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কিনা তাই নিয়ে সংশয়ে তারা।

বিএনপির মেয়র প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ারের সঙ্গে এ ব্যাপারে আলাপকালে তিনি বলেন, পুলিশি হয়রানি আর গ্রেফতার অভিযান শুরু হয়েছে এরই মধ্যে। নির্বাচনে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নেই’। প্রশাসন আমাদের বিপক্ষে কাজ করছে। কর্মকর্তারা যাই বলুক, সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে আমাদের সংশয় রয়েছে। আমরা দাবি জানিয়েছি ব্যালট বাক্স এবং ব্যালট পেপার ভোটের দিন সকালে কেন্দ্রে নেয়ার। ভোট কেন্দ্র গুলোতে সেনা মোতায়েনের দাবিও জানিয়েছি আমরা। এই সরকারের আমলে যত নির্বাচন হয়েছে তার কোনোটিই সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়নি। সর্বশেষ গাজীপুর ও খুলনার নির্বাচন যার জ্বলন্ত উদাহরণ। আমরা শঙ্কার মধ্যে আছি যে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে কিনা।

জাতীয় পার্টির প্রার্থী ইকবাল হোসেন তাপস বলেন, শহরে একটা নতুন স্লোগান শোনা যাচ্ছে, ‘সুষ্ঠু হবে নির্বাচন, ভোট দেবে প্রশাসন’। ভোটের দিন ভোটাররা ভোট কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারবে কিনা তা নিয়ে আমরা ভয়ের মধ্যে আছি। এখানকার প্রশাসন যে নিরপেক্ষ নয়, তার প্রমাণ তো আমরা এরই মধ্যে পেয়েছি। ভোটাররা যাতে কেন্দ্রে গিয়ে না দেখে যে, তাদের ভোট দেয়া হয়ে গেছে- সে ব্যাপারে ভূমিকা রাখার জন্য আমি সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ’র প্রার্থী মাওলানা ওবায়দুর রহমান মাহবুব বলেন, ‘খুলনা এবং গাজীপুর মার্কা নির্বাচন আমরা বরিশালে চাই না। যার ভোট সে দেবে, যাকে খুশি তাকে দেবে- এটাই আমাদের দাবি। বরিশালে সুষ্ঠু নির্বাচন হবে কিনা সে বিষয়ে আমরা আমাদের উদ্বেগের কথা ইতিমধ্যেই জানিয়েছি।’

এ ছাড়া বাসদের প্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তী, সিপিবির প্রার্থী অ্যাডভোকেট একে আজাদ এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী বশির আহম্মেদ ঝুনুও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন।

নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা প্রশ্নে বাধা, পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা এবং নির্বাচনী মাঠে অবাধে কালো টাকার ব্যবহারসহ নানা অভিযোগ জানিয়ে তারা প্রায় একই সুরে বলেন, ‘৩০ জুলাই সাধারণ ভোটাররা তাদের ভোট সঠিকভাবে দিতে পারবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা রয়েছে। যে কোনো উপায়ে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে আমরা সরকারের কাছে দাবি জানাচ্ছি।’

ছয় প্রার্থীর এসব বক্তব্য সম্পর্কে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লাহ বলেন, ‘বরিশালের নির্বাচনী পরিবেশ পুরোপুরি শান্ত। সরকারি দলের ধুয়া তুলে যারা এই পরিবেশকে অশান্ত করতে চাইছে তারাই আসলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায় না। ভোটারদের প্রতি আমি অনুরোধ জানাব, ভোটের দিন নির্ভয়ে কেন্দ্রে গিয়ে তাদের ভোট দিতে। কোনো প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনে আমি মেয়র হতে চাই না।’

ঘটনাপ্রবাহ : রাজশাহী-বরিশাল-সিলেট সিটি নির্বাচন ২০১৮

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter