চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতার অভাব

বাড়ছে জাহাজ দুর্ঘটনা

বছরের প্রথম নয় মাসে ২৩টি জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার * সতর্কবার্তা জারি করেছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পিঅ্যান্ডআই * প্রতিকূল আবহাওয়ায় আরও বড় দুর্ঘটনার শঙ্কা * মাশুল গুনছেন ব্যবসায়ীরা

  কাজী জেবেল ৩০ ডিসেম্বর ২০১৭, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ
চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ। ফাইল ছবি

চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙর এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজ দুর্ঘটনার হার বেড়েছে। জাহাজ নোঙরের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকাসহ ছয় কারণে এক জাহাজের সঙ্গে আরেক জাহাজের সংঘর্ষ হয়। চলতি ২০১৭ সালের প্রথম নয় মাসে ২৩টি জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে। এর মধ্যে মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫ মাসে ২১টি জাহাজ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পিঅ্যান্ডআই (প্রটেকশন অ্যান্ড ইনডেমনিটি) ক্লাব সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে সংঘর্ষের বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে। এসব দুর্ঘটনা রোধে এখনই ব্যবস্থা নেয়া না হলে প্রতিকূল আবহাওয়ায় বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। ওই প্রতিবেদন নৌমন্ত্রী, নৌ সচিব ও চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানকে দেয়া হয়েছে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, কয়েক বছর আগের তুলনায় বন্দরের সার্বিক সক্ষমতা বাড়লেও তা চাহিদার তুলনায় এখনও অপ্রতুল। এ বন্দর দিয়েই মূলত দেশের ৯২ শতাংশ পণ্য আমদানি ও রফতানি হয়। এ কারণে বন্দরে জট কমবেশি লেগেই থাকে। এর পাশাপাশি জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার হলে বন্দরে পণ্য খালাসেও গতি কমে যায়। জাহাজ দুর্ঘটনা ও পণ্য খালাসে দীর্ঘসূত্রতার পুরো মাশুল গুনতে হয় ব্যবসায়ীদের। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের সুনাম ক্ষুণœ হয়।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের (সিপিএ) চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল যুগান্তরকে বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাঝে মধ্যে দুর্ঘটনা ঘটছে। সেখানে স্রোত বেশি থাকে। মাঝে মধ্যে ঝড়-বাতাস বা ঘন কুয়াশার মতো বৈরী আবহাওয়া বিরাজ করে। তবে আমাদের দুর্ঘটনা মোকাবেলা করার মতো সামর্থ্য রয়েছে। ভেসেল ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট ইনফর্মেশন সিস্টেম (ভিটিএমআইএস) ও রেডিও কন্ট্রোলের মাধ্যমে সব জাহাজ মনিটরিং করা হচ্ছে।

জানা গেছে, প্রধান এ সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে দেশের মোট আমদানি-রফতানি পণ্যের ৯২ শতাংশ এবং ৯৮ শতাংশ কনটেইনার পরিবাহিত হয়। বিগত বছরগুলোয় আমদানি ও রফতানি পণ্য পরিবহন যেমন বেড়েছে, তেমনি জাহাজের আগমন ও বহির্গমনও বেড়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৩ হাজার ৩৫০টি বাণিজ্যিক জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দর ও বহির্নোঙরে আগমন করে। বন্দরে জাহাজের আনাগোনার পাশাপাশি দুর্ঘটনার হারও বেড়েছে। মূলত ছয় কারণে বাণিজ্যিক জাহাজ দুর্ঘটনা ঘটছে। সেগুলো হচ্ছে- ১. বহির্নোঙরে বাণিজ্যিক জাহাজের নোঙরের জায়গা কম থাকা। ২. চট্টগ্রাম বন্দরে পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজের আগমন, যেগুলোয় আধুনিক সরঞ্জামাদি না থাকা। ৩. জনবল সংকটের কারণে ভিটিএমআইএস অনেকটা অকার্যকর থাকা। ৪. বন্দর ভবনের রেডিও কন্ট্রোল অপারেটর স্বল্পতা ও অনভিজ্ঞ জনবল দিয়ে পরিচালনা করা। ৫. পাইলটের স্বল্পতা ও অনভিজ্ঞ পাইলট দিয়ে জাহাজ পরিচালনা করা। ৬. বন্দরের টাগ বোটের স্বল্পতা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, চলতি বছর ২৩টি বাণিজ্যিক জাহাজ দুর্ঘটনার সব ক’টিই বহির্নোঙর এলাকায় হয়েছে। সেপ্টম্বরে বহির্নোঙরের ‘এ’ ও ‘বি’ এলাকায় সাতটি জাহাজ দুর্ঘটনা ঘটে। এর আগের মাস আগস্টে বহির্নোঙরের ৩নং বয়া, ‘এ’, ‘বি’ ও সিমেন্ট জেটিতে সাতটি জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার হয়। জুলাই মাসে পতেঙ্গা সিবিচ সংলগ্ন ও বহির্নোঙরের ‘বি’ এলাকায় তিনটি দুর্ঘটনা ঘটে। এ ছাড়া জুন, মে ও জানুয়ারি মাসে ২টি করে মোট ৬টি দুর্ঘটনা ঘটে। তবে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বহির্নোঙর এলাকায় দুর্ঘটনা হয়নি। মে থেকে দুর্ঘটনার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পিঅ্যান্ডআই জাহাজের সংঘর্ষের বিষয়ে সতর্কবার্তা জারি করে।

আরও জানা গেছে, চট্টগ্রামে আসা বাণিজ্যিক জাহাজগুলো বন্দরে প্রবেশের আগে পতেঙ্গা লাইট হাউস থেকে ৭ নটিক্যাল মাইল ব্যাসার্ধে ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ এলাকায় নোঙর করে। জাহাজের সঙ্গে জাহাজের সংঘর্ষের অন্যতম কারণ পর্যাপ্ত পোর্ট লিমিট এলাকা না থাকা। সর্বশেষ ২০১১ সালে পোর্ট লিমিট এলাকা ঘোষণা করা হয়। ওই সময়ে দৈনিক ১০০টি বাণিজ্যিক জাহাজ বহির্নোঙরে নোঙরের ব্যবস্থা রেখে এ পোর্ট লিমিট ঘোষণা করা হয়। প্রতিটি জাহাজের জন্য ৫০০ মিটার জায়গা নির্ধারণের উল্লেখ ছিল। ওই বছর ২ হাজার ২৪৮টি জাহাজ বন্দরে আসে। বর্তমানে বহির্নোঙরে অবস্থানকারী জাহাজের সংখ্যা দ্বিগুণ। ২৮ সেপ্টেম্বর বহির্নোঙরে ১০০টি জাহাজের নোঙরের স্থানে ২০২টি জাহাজ অবস্থান করে। বর্তমানে তাই একেকটি জাহাজ ৫০০ মিটার জায়গার পরিবর্তে ২৫০-২৭০ মিটার জায়গা পাচ্ছে নোঙরে। এ কারণে বর্ষা, বৈরী আবহাওয়া ও ঘন কুয়াশার সময় বাণিজ্যিক জাহাজ দুর্ঘটনার শিকার হয়।

চট্টগ্রাম বন্দরে আসা জাহাজের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ ও জাহাজের সঙ্গে তাৎক্ষণিক যোগাযোগের অভাবেও দুর্ঘটনা ঘটছে। জাহাজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে ভিটিএমআইএস ও দুটি কন্ট্রোল স্টেশন বসানো হলেও তা থেকে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না। ২০১৪ সালে ৪৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ভিটিএমআইএস স্থাপন করা হয় এবং ২০১৬ সালে আরও ১২ কোটি টাকা ব্যয় করে পতেঙ্গা লাইট হাউস থেকে বহির্নোঙরের কভারেজ বাড়াতে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরত্বসম্পন্ন ১০টি ক্যামেরা বসানো হয়। অথচ জনবল সংকট ও দক্ষ জনবল না থাকায় এসব প্রযুক্তি অনেকটা অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ৩ নারীসহ ৭ ভিটিএমআইএস অপারেটর নিয়োগ দেয়া হলেও তারা সে পদে নেই। তাদের কয়েকজনকে বন্দরের বিভিন্ন বিভাগে নিয়োজিত রাখা হয়েছে এবং নারী সদস্যদের একজন বিদেশে অবস্থান করছেন। একইভাবে অপারেটর স্বল্পতা ও অনভিজ্ঞ জনবল দিয়ে চলছে রেডিও কন্ট্রোল সিস্টেম। রেডিও কন্ট্রোল সিস্টেমে ১০ জনের পদ থাকলেও রয়েছে মাত্র চারজন। রেডিও কন্ট্রোল স্টেশন থেকে জাহাজের ক্যাপ্টেন বা ক্রুদের সঙ্গে গাইড করার কারণেও দুর্ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনার জন্য বাণিজ্যিক জাহাজের মালিক ও শিপিং এজেন্টরাও দায়ী। কম ভাড়ায় পণ্য পরিবহনের জন্য পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ বন্দরে আসছে। এসব জাহাজের ইঞ্জিন, গিয়ার বক্স ও জেনারেটর বিকল হয়েও দুর্ঘটনা ঘটেছে।

এখনই ব্যবস্থা নেয়া না হলে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে। এতে বলা হয়েছে, প্রতিকূল আবহাওয়ায় যে কোনো সময় বাণিজ্যিক জাহাজের বড় দুর্ঘটনা ঘটা অস্বাভাবিক নয়। অন্যদিকে চ্যানেল বন্ধ বা কোনো প্রতিবন্ধকতা সৃৃষ্টি হলে দেশের আমদানি-রফতানি বাণিজ্যের ওপর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া পোর্ট লিমিট বাড়ানো, ভিটিএমআইএস ও রেডিও কন্ট্রোল কার্যকর করতে পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ, টাগ বোটের সংখ্যা বাড়ানো ও দক্ষ পাইলট নিয়োগের সুপারিশ করা হয়েছে ওই প্রতিবেদনে। এতে দেশের সুবিধাজনক স্থানে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এম খালেদ ইকবাল বলেন, যেসব জাহাজের কারণে বন্দর এলাকায় দুর্ঘটনা ঘটছে সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ জাহাজ বন্দরে আসার বিরুদ্ধে আমরা কঠোর অবস্থানে রয়েছি।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.