করদাতাদের অনীহাসহ ৪ কারণ

রিটার্ন দাখিলের বাইরে ৬৩ লাখ টিআইএন

রিটার্ন থেকে আয়কর আদায় হয়েছে ৫৯০১ কোটি টাকা * এনবিআর কাঠামোসহ তিন সংস্কারে রাজস্ব বাড়বে-মাহবুব আহমেদ
 মিজান চৌধুরী 
১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২:০০ এএম  |  প্রিন্ট সংস্করণ

টিআইএন নম্বরধারী প্রায় এক কোটি হলেও রিটার্ন দাখিলের বাইরে আছেন ৬৩ লাখ। চলতি (২০২৩-২৪) অর্থবছর রিটার্ন দাখিল করেছেন ৩৬ লাখ ৬২ হাজার জন। বিপরীতে আয়কর আদায় হয়েছে ৫ হাজার ৯০১ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগের সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে আসছে এসব তথ্য।

বেশিসংখ্যক রিটার্ন দাখিল না করার পেছনে ওই প্রতিবেদনে চারটি কারণ শনাক্ত করা হয়। সেগুলো হচ্ছে-করদাতাদের ই-রিটার্ন দাখিলের ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব, করদাতাদের অনীহা, কর সংস্কৃতির চর্চা অপ্রতুল এবং জনসচেতনতার অভাব। সংশ্লিষ্ট সূত্রে পাওয়া গেছে এসব তথ্য।

এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি শ্রেণির করদাতাদের কাছ থেকে ট্যাক্স রিটার্নের মাধ্যমে ৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আদায় হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৮ শতাংশ বেশি। ওই অর্থবছরে (২০২২-২৩) অর্থবছরের শেষ নাগাদ রিটার্ন জমা হয়েছিল ৩৫ লাখ ২৯ হাজার ২৬৩।

টিআইএনধারীর সংখ্যার বিবেচনায় যে সংখ্যক রিটার্ন জমা পড়েছে, তাকে সন্তোষজনক বলে মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহমুব আহমেদ যুগান্তরকে জানান, দেশের অর্থনীতির সার্বিক বিবেচনায় সরকার আয় বাড়াতে যে কোনোভাবে কর রাজস্ব বাড়াতে হবে। তবে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ছাড়া আয় বাড়ানোর অন্য কোনো উৎসে এ সুযোগ নেই। কিন্তু এনবিআরে তিন ধরনের সমস্যা আছে সেগুলো ঠিক করতে হবে। সেগুলো হচ্ছে- আইনগত, প্রযুক্তিগত এবং কাঠামোগত। এক্ষেত্রে আইনগত সংস্কার এবং প্রযুক্তিগত কিছু পদক্ষেপ নিতে হবে। এছাড়া কাঠামোগত সংস্কারে আসতে পারে এনবিআর এবং অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ। এক্ষেত্রে পৃথকভাবে দুজন দায়িত্বপালন করবেন। এছাড়া প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের জন্য দুটি বোর্ড দরকার। সেখানে রাজস্ব বোর্ড একজন প্রতিমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে থাকা দরকার। তাহলে ভবিষ্যতে আরও গতিশীল আসবে। এতে রাজস্বও বাড়বে।

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বরধারীর (টিআইএন) সংখ্যা ১ কোটি ছুঁই ছুঁই। অর্থাৎ টিআইএনধারীর দুই-তৃতীয়াংশই ট্যাক্স রিটার্ন জমা দেননি। এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মতে, যারা রিটার্ন দেওয়ার যোগ্য কিন্তু দিচ্ছেন না, তাদের মধ্যে অনেকে মনে করেন, রিটার্ন দিয়ে বিপদ ডেকে আনব কিনা। আয়, সম্পদের তথ্য দিতে গিয়ে হয়রানির (ট্যাক্সম্যানদের) মধ্যে পড়েন কিনা-এমন আশঙ্কায় তারা রিটার্ন দিতে চান না।

জাতীয় সংসদ সূত্রে জানা গেছে, আজ সোমবার সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে যোগ দেবেন অর্থমন্ত্রী। ২০ সংসদ সদস্য অর্থনীতির বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করবেন অর্থমন্ত্রীকে। সে প্রশ্ন প্রস্তুত করে ইতোমধ্যে পাঠানো হয়েছে অর্থ বিভাগের কাছে। তবে প্রশ্নের একটি বড় অংশজুড়ে আছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড এবং কৃষি ঋণ বিতরণসংক্রান্ত। সংসদ সদস্যদের প্রশ্নে জানতে চেয়েছেন এ পর্যন্ত কত টাকা রাজস্ব আহরণ হয়েছে, প্রকৃত টিআইএনধারীর সংখ্যা কত, সুদমুক্ত কৃষি ঋণ বিতরণ হবে কিনাসহ আরও বেশি কিছু প্রশ্ন করা হয়েছে। এসব প্রশ্নের উত্তরে অর্থ বিভাগ ওই প্রতিবেদন তৈরি করে জাতীয় সংসদে প্রেরণ করা হয়। যা আজ সংশ্লিষ্ট সংসদ-সদস্যদের উত্তর হিসাবে গণ্য হবে এবং এটি পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী নিজেই।

অর্থ বিভাগের প্রতিবেদনে টিআইএনধারী রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা কমে যাওয়ার পেছনে কারণের বাইরে ভিন্ন কারণও আছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের প্রকৃত আয় কমেছে এবং নতুন আইন সম্পর্কে মানুষের মধ্যে সঠিক তথ্যের অভাবও আছে। এর প্রভাবে অনেকে ট্যাক্স রিটার্ন কম জমা দিচ্ছেন।

জানা গেছে, কোম্পানির জন্য রিটার্ন জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ১৫ জানুয়ারি থেকে বাড়িয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি করা হয়েছে। ফলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এ খাতে আয় ও সংখ্যা আরও বাড়বে।

সংসদে উপত্থাপনের জন্য অর্থ বিভাগের তৈরি প্রতিবেদনে রাজস্ব আদায় প্রসঙ্গে বলা হয়, চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে প্রায় ১ লাখ ৬৫ হাজার ৬৩০ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করেছে এনবিআর, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৪ শতাংশ বেশি।

গত ২০২২-২৩ অর্থবছরের একই সময়ে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৪৫ হাজার ৪৩১ কোটি টাকা। অর্থাৎ এবার প্রায় ২০ হাজার ১৯৯ কোটি টাকা বেশি আদায় হয়েছে।

কৃষি ঋণ বিতরণ প্রসঙ্গে বলা হয় কৃষি উৎপাদন বাড়াতে চলতি অর্থবছরে কৃষকদের জন্য ৩৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ বরাদ্দ রেখেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। এই বরাদ্দ গত অর্থবছরের চেয়ে ১৩.৬০ শতাংশ বেশি। গত অর্থবছর কৃষিঋণের লক্ষ্য ছিল ৩০ হাজার ৮১১ কোটি টাকা। তবে চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বরে) ব্যাংকগুলো কৃষি খাতে ঋণ বিতরণ করেছে ১৮ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় ৯.৯ শতাংশ বেশি। প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বল্প সুদে কৃষকদের ঋণ দেওয়া হচ্ছে।

যুগান্তর ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন