গণপরিবহন কাড়ছে প্রাণ, পুড়ছে স্বপ্ন

সাড়ে ৩ বছরে ২৫ হাজারের বেশি জনের মৃত্যু * হতাহতদের বেশির ভাগই শিশু, শিক্ষার্থী, তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি * ৯০ শতাংশ দুর্ঘটনা চালকের বেপরোয়া মনোভাবের কারণে * ক্ষতিপূরণ পায় না পরিবার

  শিপন হাবীব ০৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সড়ক দুর্ঘটনা

কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতসহ নানা প্রয়োজনে গণপরিবহন মানুষের নিত্য অনুষঙ্গ। কিন্তু সেই গণপরিবহনই এখন হয়ে উঠেছে ঘাতকের আরেক নাম। প্রতিদিনই কাড়ছে প্রাণ, মেরে ফেলছে স্বপ্ন। নিঃস্ব করছে বহু পরিবারকে। বাংলাদেশ যাত্রীকল্যাণ সমিতি ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়ক দুর্ঘটনা ইন্সটিটিউটের (এআরআই) হিসাবে, গত সাড়ে তিন বছরে দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছেন ২৫ হাজার ১২০ জন মানুষ। এই সময়ে আহত হয়েছেন ৬২ হাজার ৪৮২ জন। এসব দুর্ঘটনার ৯০ শতাংশ ঘটেছে চালকের বেপরোয়া মনোভাব ও অতিরিক্ত গতির কারণে। আর হতাহতদের বেশির ভাগই শিশু, শিক্ষার্থী, তরুণ ও কর্মক্ষম ব্যক্তি। যারা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ ও অর্থনীতির মূল শক্তি।

সড়কে একের পর এক প্রাণ হারালেও দু-একটি ঘটনা ছাড়া কোনোটিরই কখনও কোনো বিচার হয়নি। একইভাবে কেউ ক্ষতিপূরণও পাননি। অথচ অধিকাংশ ক্ষেত্রে কর্মক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে পথে বসেছে পরিবারগুলো। যারা আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থেকে মারা গেছেন বা পঙ্গু হয়ে গেছেন, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদের পরিবারও হয়ে গেছে নিঃস্ব। কিন্তু সড়ক নিরাপদ করতে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি, বরং নানা প্রশ্রয়ে দিন দিন বেপরোয়া থেকে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন পরিবহন মালিক, চালক ও শ্রমিকরা। ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের শিক্ষার্থী দিয়া খানম মিম ও আবদুল করিম রাজিব নিহত হয়। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর পর থেকে ঢাকাসহ সারা দেশে শিক্ষার্থীদের যে কঠোর আন্দোলন শুরু হয়, সেটি হৃদয়ে জমে থাকা দীর্ঘ ক্ষোভের বিস্ফোরণ। এতে তাই সমর্থন জানান সাধারণ মানুষও।

মিম ও রাজিবের সঙ্গেই সেদিন গুরুতর আহত হয়েছিল আরও ছয় শিক্ষার্থী। দুই ছাত্রের হাত ও পা ভেঙে গেছে, এর একজনের চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দুই ছাত্রীর মাথায় এবং বাকি দুজনের হাত-পায়ে আঘাত লাগে। সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই শিক্ষার্থী শনিবার যুগান্তরকে জানায়, তারা ব্যাকুল হয়ে আছে সহপাঠীদের মতো নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনে নামতে। কিন্তু এখনও যে বেশ অসুস্থ! আর সেদিন যে ভয়াবহ দৃশ্য দেখেছে তারা, চোখ বন্ধ করলেই ভেসে ওঠে মনে। ঘুমাতে পারে না তারা।

মিমের বাবা জাহাঙ্গীর ফকির শনিবার দুপুরে যুগান্তরকে বলেন, ‘ভাই কি আর বলব, আমার প্রাণটাই (মিম) নাই। টাকা-পয়সা দিয়ে কী হবে! আমার কলিজার টুকরাকে তো ফিরে পাব না। প্রধানমন্ত্রী আমাকে সান্ত্বনা দিয়েছেন। তিনি আমার কষ্ট-ব্যথা বুঝেছেন। এখন আমরা একটা নিরাপদ সড়ক চাই।’ বলতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

জাহাঙ্গীর আলম অন্তত ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন, কিন্তু বহু মৃত্যুর বিষয়ে এভাবে আন্দোলন হয় না, রাজপথে নামে না কেউ। যেমন, ২৬ জুলাই রাজধানীর বাড্ডায় বকুল মিয়া নামের রিকসা চালক, ১৪ জুলাই যাত্রাবাড়ীতে মহির উদ্দিন নামের দিনজমুর, ২৯ এপ্রিল রোজিনা আক্তার নামের গৃহকর্মীর মৃত্যু হয় বাসচাপায়। কী পেয়েছে এদের পরিবার?

দীর্ঘ ২৭ বছরেও ক্ষতিপূরণ পাননি সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর স্ত্রী রওশন আক্তার। তিনি জানালেন, ১৯৮৯ সালে তার স্বামী মতিঝিলে বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজের গাড়ির ধাক্কায় নিহত হন। ওই গাড়ির চালক তার স্বামীকে ‘হত্যা’ করেছেন। ১৯৯১ সালে তিনি ক্ষতিপূরণ চেয়ে মামলা করেন। ২৫ বছর পর ২০১৪ সালে ২০ জুলাই তিন কোটি ৫২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নিু আদালতের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। কিন্তু এখনও তিনি সেই অর্থ পাননি। রওশন বলেন, প্রিয়জন হারানোর যন্ত্রণার সঙ্গে ক্ষতিপূরণের কোনো অঙ্ককেই মেলানো যাবে না। ক্ষতিপূরণ ও বিচার চাওয়া স্বজন হারানোদের অধিকার।

২০১১ সালে ১৩ আগস্ট ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীরসহ পাঁচজন মারা যান। ৯ কোটি ৯৪ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ চেয়ে আদালতে যান তারেক মাসুদের স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ। ২০১৬ সালে আদালত চার কোটি ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪৫২ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বলে। এখনও টাকা পাননি ক্যাথরিন।

মিশুক মুনীরের স্ত্রী মঞ্জুলী কাজীর সঙ্গে শনিবার কথা হয় যুগান্তরের। তিনি বলেন, ‘স্বামীকে হারিয়ে আজও আমি এক পথহারা মানুষ।’ মঞ্জুলী বলেন, ক্ষতিপূরণ কিংবা অর্থ দিয়ে কখনও শূন্যস্থান পূরণ করা যায় না। তবে এটা অধিকার। আদালত পাঁচ কোটি ৮০ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কবে পাব জানি না। তিনি প্রশ্ন করেন, শত শত প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে চালকরা। কয়টা ঘটনার বিচার কিংবা ক্ষতিপূরণ মিলছে।

দুই বাসের রেষারেষিতে ৩ এপ্রিল হাত হারানো রাজীব ১৭ এপ্রিল মারা যান। শুক্রবার তার খালা জাহানারা পারভীন বলেন, ‘এখন বুঝতে পারছি, আন্দোলন হলেই ক্ষতিপূরণ কিংবা অর্থ পাওয়া যায়। রাজীবকে হারিয়ে তার ছোট্ট দুই ভাই ব্যাকুল। রাজীব হাসপাতালে থাকার সময় জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ বলেছিলেন, আমাকেসহ রাজীবের দুই ভাইকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করাবেন। সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি এখনও। রাজীবের মৃত্যুর ঘটনায় আদালত এক কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে বললেও এখনও কিছুই পাইনি আমরা।’

যাত্রীকল্যাণ সমিতির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালে দেশে চার হাজার ৯৭৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় সাত হাজার ৩৯৭ জন নিহত ও ১৬ হাজার ১৯৩ জন আহত হয়েছে। তবে ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)-এর গবেষণা বলছে, ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা পাঁচ হাজার ৬৪৫ জন। এআরআই’র তথ্য বলছে, দেশে সড়ক দুর্ঘটনা এবং এর প্রভাবে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। এসব দুর্ঘটনার কারণে বছরে মোট জাতীয় উৎপাদনের (জিডিপি) ২ থেকে ৩ শতাংশ হারাচ্ছে বাংলাদেশ। ২৫ জুন মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পাঁচটি নির্দেশনা দেন। নির্দেশনা বাস্তবায়ন এবং এর অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান ও নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খানকে দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু এতদিন পার হলেও এ তিন মন্ত্রী কোনো বৈঠকই করেননি। যাত্রীকল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী জানান, যে দেশে মানুষকে বকা দিলে মানহানির মামলায় অজামিনযোগ্য ৫৭ ধারায় ১০ বছরের জেল হয়, সে দেশে মানুষ হত্যার দায়ে জামিন ও আপসযোগ্য মামলায় জেল হয় মাত্র তিন বছর!। নিরাপদ সড়ক মানেই চাঁদাবাজি, দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাওয়া। ফলে নিরাপদ সড়ক হোক, এমনটা চায় না স্বার্থান্বেষী মহল।

নিরাপদ সড়ক চাই দাবিতে আন্দোলনরত কয়েকজন শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের সঙ্গে কথা হয় শনিবার। তারা বলেন, নিরাপদ সড়ক মানুষের অধিকার। এটি না করে যদি গণপরিবহনের লাইসেন্স বাতিল করে দেয়া হয়, ক্ষতিপূরণের টাকাও দেয়া হয়, তবে হারানো মানুষগুলো ফিরে আসবে?

ঘটনাপ্রবাহ : সড়ক দুর্ঘটনা,বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter