ট্রাফিক সপ্তাহেও সড়কে চলছে নৈরাজ্য

৬ দিনে দেড় লাখ মামলা

জরিমানা প্রায় ৪ কোটি টাকা * কাউকে ছাড় নয়, তদবির শুনছে না ট্রাফিক পুলিশ

  নুরুল আমিন ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

নিরাপদ সড়ক চাই

বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থীর নির্মম মৃত্যুর ঘটনায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে শিক্ষার্থীরা। তাদের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে সারা দেশে ট্রাফিক সপ্তাহ ঘোষণা করে পুলিশ। শুক্রবার ছিল ট্রাফিক সপ্তাহের ষষ্ঠ দিন। সড়কে নৈরাজ্য ঠেকাতে সারা দেশে এই ছয় দিনে যানবাহন ও চালকের বিরুদ্ধে দেড় লাখের উপরে মামলা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছে প্রায় চার কোটি টাকা। পুলিশ সদর দফতর সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, ট্রাফিক সপ্তাহের প্রথম দিন সারা দেশে যানবাহনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে ১৯ হাজার ৪৮৬টি। চালকের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুই হাজার ৯৫২টি, যানবাহন আটক হয়েছে ৪৬৯টি। জরিমানা আদায় হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ টাকা। দ্বিতীয় দিন যানবাহন ও চালকের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে প্রায় ২৭ হাজার। জরিমানা আদায় হয়েছে ৬৭ লাখ টাকা। যানবাহন আটক করা হয়েছে ৮০০টি। তৃতীয় দিন মামলা হয়েছে প্রায় ২৪ হাজারটি। জরিমানা আদায় হয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ টাকা। যানবাহন আটক হয়েছে ৫৭৭টি। চতুর্থ দিনে মামলা হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার। জরিমানা আদায় হয়েছে প্রায় ৬০ লাখ টাকা। পঞ্চম দিন প্রায় ২২ হাজার মামলা এবং জরিমানা আদায় হয়েছে প্রায় ৬৫ লাখ টাকা। এদিন ২৮৯টি যানবাহন আটক করা হয়।

ট্রাফিক পুলিশের কর্মকর্তারা বলছেন, কেউ কেউ আইন ভাঙছে। আমরাও মামলা দিচ্ছি। কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না। মানুষ সচেতন হলে মামলার সংখ্যা কমে আসবে বলেও জানান তারা।

এদিকে, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সচেতনতার জন্য সারা দেশে ট্রাফিক পুলিশ পোস্টার ও বিলবোর্ডের মাধ্যমে প্রচারণা চালাচ্ছে। রাজধানীর মোড়ে মোড়ে ট্রাফিক চেকপোস্টে চালকের লাইসেন্স ও গাড়ির কাগজপত্র কড়াকড়িভাবে পরীক্ষা করা হচ্ছে। ট্রাফিক আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কারও তদবির শুনছেন না তারা।

রাজধানীর মিরপুর, ফার্মগেট, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার, পল্টন গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রতিটি সিগন্যালে ট্রাফিক পুলিশের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন সাধারণ পুলিশ সদস্য ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে কাজ করছেন। তাদের সঙ্গে কাজ করছেন রোভার স্কাউটের সদস্যরা। মামলা দেয়ার পাশাপাশি তারা সচেতনতা তৈরিতে কাজ করে যাচ্ছেন। ‘খোকাবাবু যায়, হেলমেট কোথায়?’ ‘অযথা হর্ন বাজাবেন না’, ‘চলন্ত গাড়িতে ওঠানামা করবেন না’, ‘নির্ধারিত স্থান ছাড়া বাস থামাবেন না’, ‘যত্রতত্র রাস্তা পারাপার হবেন না’- রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার ট্রাফিক পুলিশ বক্স থেকে পথচারী ও যানবাহনের চালকদের উদ্দেশে এসব সচেতনতামূলক বার্তা প্রচার করা হচ্ছে।

পল্টন মোড়ে দেখা গেছে, ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা যানবাহনের নিবন্ধন, লাইসেন্স, ফিটনেস, বীমার কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করছিলেন। পাশেই রাখা হয়েছে পুলিশের রেকার। সার্জেন্টরা কাগজপত্র পরীক্ষা করে মামলা দিচ্ছিলেন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, মোটরসাইকেলের চালকের হেলমেট থাকলেও আরোহীর হেলমেট নেই। এসব ক্ষেত্রে আরোহীর জন্য হেলমেট রাখতে সতর্ক করার পাশাপাশি মামলা দেয়া হচ্ছে।

ডিএমপি ট্রাফিক পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, ট্রাফিক সপ্তাহের প্রথম দিনে মামলা হয় সাত হাজার ৮১টি, জরিমানা আদায় হয় ৪২ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টাকা। ওই দিন ৫৭টি গাড়ি ডাম্পিং ও ৭০৮টি গাড়ি রেকার করা হয়। দ্বিতীয় দিন সাত হাজার ৩১৯টি মামলা হয় ও ৪৬ লাখ ৬৭ হাজার ৭২ টাকা জরিমানা হয়। এ সময় ১৪২টি মোটরসাইকেল আটকসহ ৮৩৭টি গাড়ি ডাম্পিং ও রেকার করা হয়। তৃতীয় দিনে ৯ হাজার ৪৭০টি মামলা ও ৫৪ লাখ ২৫ হাজার ৭৫০ টাকা জরিমানা করা হয়। ৯৯৯টি গাড়ি ডাম্পিং ও রেকার করা হয়। চতুর্থ দিনে ৯ হাজার ৯৭৪টি মামলা ও ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ২০ টাকা জরিমানা হয়। এ সময় ১ হাজার ৫৭টি গাড়ি ডাম্পিং ও রেকার করা হয়। পঞ্চম দিনে ৪ হাজার ৪৮৪টি মামলা হয়। অন্যদিকে রাজধানী ও আশপাশের এলাকায় বিআরটিএ’র ৩টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেছেন। বৃহস্পতিবার মোটরযান আইনে ৫৩টি মামলায় ১ লাখ টাকা জরিমানা ও ১৯ জন দালালকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়েছে বিআরটিএ।

রাজধানীতে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট আসলাম হোসেন যুগান্তরকে বলেন, প্রতিদিন মামলার সংখ্যা বাড়ছে। যেখানে প্রতিদিন গড়ে ৩ হাজার মামলা হতো। এখন হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি। শিক্ষার্থীদের আন্দোলন ও কাগজপত্র যাচাই কার্যক্রমের পর মানুষ আগের থেকে সচেতন হয়েছেন। বৈধ কাগজপত্র নিয়েই রাস্তায় চলাচল করছেন। এক ধরনের বদঅভ্যাস থেকে কিছু চালক উল্টোপথে গাড়ি চালান বলে মনে করেন তিনি। তবে নিয়মিত মামলা করার কারণে এসব কমে এসেছে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রবিউল ইসলাম নামের এক যাত্রী যুগান্তরকে বলেন, দীর্ঘদিনের এ নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি একদিনে কিংবা এক সপ্তাহে বদলানো যাবে না। তবে শিক্ষার্থীরা যে নাড়া দিয়েছে, এখন পুলিশ যদি ধারাবাহিকভাবে অভিযান অব্যাহত রাখে তাহলে পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো কঠিন কিছু নয়। আরেক যাত্রী মোস্তাফিজুর রহমান সুমন বলেন, মানুষের মধ্যে সচেতনতা বেড়েছে। তবে বাসচালকদের অসুস্থ প্রতিযোগিতা এখনও থামেনি। এ বিষয়ে তাদের সচেতন করতে হবে। প্রয়োজনে কাউন্সেলিং করতে হবে। না হলে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে সড়কে দুর্ঘটনা অনেকাংশে কমবে। পাশাপাশি পথচারীদেরও সচেতন হতে হবে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে, ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মীর রেজাউল করিম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের ফলে পুলিশের নৈতিক ভিত্তি জোরদার হয়েছে। আগে যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা যেত না, তাদের বিরুদ্ধেও মামলা করা হচ্ছে। ট্রাফিক সপ্তাহের মাধ্যমে আমরা জনগণকে সচেতন করতে চাই। জনগণের মধ্যে আইন মানার মানসিকতা গড়ে তুলতে চাই।

ঘটনাপ্রবাহ : বিমানবন্দর সড়কে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যু

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter