সেশনজট-মেয়াদোত্তীর্ণদের অবস্থান

জাবিতে তীব্র সিট সংকট

দুর্ভোগে নবীন শিক্ষার্থীরা * প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তায় সংকট বাড়ছেই

প্রকাশ : ১১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  রাহুল এম ইউসুফ, জাবি

তীব্র সিট সংকটের কবলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। ভর্তি হওয়ার পর হলে জায়গা হচ্ছে না নবীনদের; যদিও বিশ্ববিদ্যালয়টি আবাসিক। নবীনদের জায়গা করে দেয়ার বিপরীতে নিজের স্থান পাকাপোক্ত করতে ব্যস্ত মেয়াদোত্তীর্ণ তথা সিনিয়ররা। সেশনজট, বেকারত্ব, সদিচ্ছার অভাব, ছাত্র রাজনীতি প্রভৃতি কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েদের ৮টি করে আবাসিক হল রয়েছে। হলগুলোয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই-তৃতীয়াংশ শিক্ষার্থী আবাসিক সুবিধা পান। মেয়েদের হলে প্রশাসনের কর্তৃত্ব থাকায় সেখানে সিট সংকট তুলনামূলক কম। কিন্তু সিট নিয়ে ছেলেদের হলে প্রশাসনের কর্তৃত্ব শূন্যের কোঠায়। ফলে এসব হলে সিট সংকট ও সিট বণ্টনে নৈরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে।

মীর মশাররফ হোসেন হলে সাড়ে ৭শ’, শহীদ সালাম বরকত হলে ৪শ’ এবং আল বেরুনী হলে আড়াইশ সিট রয়েছে। কিন্তু এ হল তিনটিতে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। ছেলেদের প্রতিটি হলেই এ অবস্থা। ছেলেদের ৮ হলে মোট সিট ৫ হাজারের মতো। কিন্তু এই হলগুলোয় ৪১ থেকে ৪৭ পর্যন্ত ৭টি ব্যাচের প্রায় সাড়ে ৮ হাজার শিক্ষার্থীর সিট বরাদ্দ রয়েছে। এ ছাড়া ৪০, ৩৯ ও অন্যান্য ব্যাচের কয়েকশ’ শিক্ষার্থী এখনও অবস্থান করছেন। ছেলেদের হলগুলোর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ রুম মেয়াদোত্তীর্ণ ছাত্রদের দখলে। সিনিয়র শিক্ষার্থীরা সিঙ্গেল সিট ধরে রাখায় ভোগান্তিতে পড়ছেন প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থীরা।

প্রতিটি হলেই প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীদের জন্য গণরুম রয়েছে। ওই রুমে গাদাগাদি করে মানবেতর জীবনযাপন করেন শিক্ষার্থীরা। একজনের জায়গায় কম করে হলেও ৪ জন শিক্ষার্থী থাকতে বাধ্য হন। ফলে গণরুমে পড়াশোনা করা একেবারেই কঠিন। এ ছাড়া ২য় বর্ষে দু’জনের রুমে থাকতে হয় ৬-৮ জনকে। এমন দুরবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চললেও উত্তোরণের কোনো উপায় খুঁজছে না বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় প্রতিটি বিভাগেই ৬ মাস থেকে ১ বছরের সেশনজট রয়েছে। তাই ইচ্ছা থাকলেও শিক্ষার্থীরা হল ছাড়তে পারেন না। এদিকে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের ২১৬ সদস্যবিশিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির অর্ধেক পদধারীর ছাত্রত্ব শেষ হলেও তারা হলে অবস্থান করছেন। আবার তাদের সুপারিশে মেয়াদোত্তীর্ণ অনেক শিক্ষার্থী হলে অবস্থান করছেন। এ কাতারে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকও রয়েছেন। অনেকে বেকারত্বের অজুহাত দিয়ে হল ছাড়তে বিলম্ব করছেন। আবার বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন এমন অনেকে সিটে আছেন। ৩৬তম বিসিএসে গেজেটে নাম আসা ও ৩৭তম বিসিএসে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিতদের বেশ কয়েকজন এখনও হলে অবস্থান করছেন।

সদ্য স্নাতকোত্তর পাস করা বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, পরিবার থেকে আর্থিক সাপোর্ট না পাওয়ায় বাহিরের ভাড়া মেসে থেকে চাকরির জন্য পড়াশোনা করা কঠিন। মেসে পড়াশোনা ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা কম। এ জন্যই তারা একটু দেরিতে হল ছাড়েন।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক এসএম সুফিয়ান চঞ্চল যুগান্তরকে বলেন, অচিরেই ছাত্রলীগের ব্যাপারটা সমাধান করে নেব। বাকিদের ব্যাপারে হল প্রশাসন সিদ্ধান্ত নেবে। হল প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে এমন দুরবস্থা বলে তিনি অভিযোগ করেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট কমিটির সভাপতি অধ্যাপক ড. সোহেল আহমেদ বিশ্ববিদ্যালয়ে তীব্র সিট সংকটের কথা স্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, এটা শুধু হল প্রশাসনের দুর্বলতা না, শিক্ষার্থীদেরও দায়বদ্ধতা রয়েছে। পাস করা শিক্ষার্থীরা অফিসিয়ালি হল ছেড়ে দিয়ে এক সপ্তাহ পরে আবার বন্ধু কিংবা ছোট ভাইদের রুমে ওঠে। তাছাড়া অনেকে র‌্যাগের (শিক্ষা সমাপনী অনুষ্ঠান) অজুহাতে হল ছাড়ে না। ৪০ ব্যাচের র‌্যাগ অনুষ্ঠিত হলেও তাদের অনেকেই এখনও হল ছাড়েনি। তাই সিট সংকট নিরসনে শিক্ষার্থীদেরও সদিচ্ছা থাকা আবশ্যক।

সিট সংকটের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলাম বলেন, অচিরেই আমরা ১২শ’ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প পাব। এ প্রকল্পের অধীনে ছেলে ও মেয়েদের ৩টি করে হল নির্মাণ করা হবে। তাতে ৬ হাজার শিক্ষার্থী আবাসন সুবিধা পাবে। এর ফলে সিটের সংকট থাকবে না।