চরম অর্থ সংকটে চামড়া খাত

রফতানিকারকরা রিফান্ড পাচ্ছেন না

কোডসংক্রান্ত জটিলতায় মিলছে না ড্র-ব্যাক ও প্রত্যর্পণ

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান

অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভুলে রফতানিকারক ও বিদেশি সংস্থাগুলো ড্র-ব্যাক ও প্রত্যর্পণ পাচ্ছে না। মূলত বাজেটে শুল্ক রেয়াত ও প্রত্যর্পণ অধিদফতরের (ডেডো) অনুকূলে দেয়া অর্থনৈতিক কোডের ওলট-পালটের কারণেই এ জটিলতা দেখা দিয়েছে। ফলে রফতানিকারকরা পুঁজি সংকটে পড়েছেন। বেশি সমস্যায় পড়েছেন চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা। আসন্ন কোরবানির ঈদে চামড়া ক্রয়ে অর্থের জোগান পেতে তারা রিফান্ডের দিকে তাকিয়ে আছেন।

সূত্র বলছে, প্রতিদিনই ডেডোতে রফতানিকারকদের আবেদন জমা পড়ছে। ফাইলের স্তূপ হলেও প্রত্যর্পণ দেয়া যাচ্ছে না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রক্রিয়াগত এ ত্রুটির বিষয়টি বোঝাতে হচ্ছে। চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন, সেখানেও আসন্ন ঈদে চামড়া সংগ্রহে অর্থ সংকটের বিষয়টি উঠে এসেছে। ইউনিসেফেরর মতো বিদেশি সংস্থাও ড্র-ব্যাক ও প্রত্যর্পণ সমস্যায় ঝুলছে। ইউনিসেফ রোহিঙ্গাদের জন্য স্থানীয় কেনাকাটার বিপরীতে দেয়া ভ্যাট ফেরত চাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহীন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, চামড়া খাতের ব্যবসায়ীরা চরম অর্থ সংকটে। ব্যাংকগুলোও চাহিদামাফিক ঋণ দিচ্ছে না। ডেডো থেকে বলা হচ্ছে, অর্থ বিভাগ টাকা বরাদ্দ না দেয়ায় তারা প্রত্যর্পণও দিতে পারবেন না। এ অবস্থায় চামড়া ব্যবসায়ীরা উভয় সংকটে পড়েছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে ডেডো সমস্যার সমাধান না হলে অর্থের অভাবে চামড়া সংগ্রহ দুরূহ হয়ে পড়বে। ফলে চামড়া পাচারের সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে রফতানিকারক ও সর্বোপরি দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

ডেডো মূলত বিদেশি সংস্থা ও রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানকে রিফান্ড দেয়া এবং বন্ডেড প্রতিষ্ঠানের সহগ নির্ধারণ করে থাকে। যেসব রফতানিমুখী প্রতিষ্ঠানের বন্ড লাইসেন্স নেই, সেসব প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানির সময় কাস্টমসে জমা দেয়া শুল্ক-কর ডেডো ফেরত দেয়। এ জন্য রফতানিকারকদের বেশকিছু শর্ত মানতে হয়। আমদানি করা কাঁচামাল দিয়ে তৈরি পণ্য বিদেশে রফতানির সপক্ষে কাগজপত্র (যেমন বিল অব এক্সপোর্ট, শিপিং বিল ও পিআরসি) ডেডোতে জমা দিয়ে রিফান্ডের জন্য আবেদন করতে হয়। যাচাই-বাছাই শেষে ডেডো অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া অর্থ রফতানিকারকদের রিফান্ড হিসেবে ফেরত দেয়।

জানা গেছে, প্রতিবছর বাজেটের পর অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিটি সরকারি দফতরে অফিস খরচ বাবদ অর্থ দেয়। তেমনি এনবিআরের অধীন দফতরগুলোকে রাজস্ব আদায়ের কোড দেয়া হয়। যেমন আয়কর ও ভ্যাট কমিশনারেট ভেদে কর দেয়ার জন্য আলাদা কোড থাকে। ঝামেলার শুরু এখানেই। ডেডোকে ড্র-ব্যাক ও প্রত্যর্পণের কোডের পরিবর্তে চলতি বাজেটে রাজস্ব আদায়ের কোড দেয়া হয়। কোডসংক্রান্ত এ জটিলতার কারণে ডেডো এখন ডিউটি ড্র-ব্যাক ও প্রত্যর্পণ দিতে পারছে না।

এসব জটিলতার কথা তুলে ধরে সম্প্রতি ডেডো থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি দেয়া হয়েছে। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, অর্থ বিভাগ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছরের জন্য প্রণীত বাজেট বইয়ে ডেডোর জন্য যে নতুন কোড সংযোজন করা হয়েছে সেগুলোতে ভ্যাট ও রাজস্ব আদায়ের কোড। ড্র-ব্যাক ও প্রত্যর্পণের কোড নয়। এ কারণে যেসব সমস্যার উদ্ভব হয়েছে তাও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

বলা হয়েছে, কূটনৈতিক মিশন এবং জাতিসংঘের সংস্থাগুলোকে তাদের স্থানীয় কেনাকাটার বিপরীতে আন্তর্জাতিক চুক্তি মোতাবেক ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক ফেরত দেয়া যাচ্ছে না। এতে আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, রফতানিকারকদের পরিশোধিত শুল্ক-কর আইন অনুযায়ী ফেরত দেয়া যাচ্ছে না। এর ফলে রফতানিকারকদের মধ্যে ক্ষোভ ও উত্তেজনার সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডেডোর মহাপরিচালক ওয়াহিদা রহমান চৌধুরী যুগান্তরকে বলেন, পদ্ধতিগত কিছু জটিলতার কারণে রফতানিকারক ও বিদেশি সংস্থাগুলোকে ড্র-ব্যাক ও প্রত্যর্পণ দেয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি এনবিআরকে জানানো হয়েছে। জটিলতার নিরসন হলে আগের মতোই রফতানিকারক ও বিদেশি সংস্থাগুলোকে রিফান্ড দেয়া হবে।

জানা গেছে, ডেডো থেকে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯৭ কোটি টাকা, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৪৩ কোটি এবং সর্বশেষ ২০১৭-১৮ অর্থবছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৬৪ কোটি টাকা প্রত্যর্পণ দেয়া হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ডেডো থেকে ২৭০ কোটি টাকা অর্থ বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ভ্যাট বাবদ ১৭০ কোটি টাকা, শুল্ক বাবদ ৮৫ কোটি, সম্পূরক শুল্ক ১০ কোটি এবং আবগারি শুল্ক বাবদ ৫ কোটি টাকা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনও নতুন কোড সৃষ্টি করে বাজেট বরাদ্দ দেয়া হয়নি। সব দিক বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত সমস্যা সমাধানে ৮ আগস্ট এনবিআর থেকে অর্থ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়।