অভিযানে নিহত ২৩৩ গ্রেফতার ৪৮ হাজার

ধরন পাল্টে দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে মাদক

হোম ডেলিভারি পদ্ধতি, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মোবাইল ফোনে ক্রেতা ডেকে বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা * গ্রেফতারদের অধিকাংশই জামিনে বাইরে * ধরা পড়েনি জেনেভা ক্যাম্পের গডফাদার ইশতিয়াক

  নুরুল আমিন ও হাসিব বিন শহিদ ২৬ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

মাদক

সারা দেশে মাদকবিরোধী অভিযানকালে ২৩৩ জন নিহত এবং ৪৮ হাজার গ্রেফতার হয়েছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও অভিযান চলছে। এরপরও বন্ধ হয়নি মাদক বেচাকেনা। কৌশল পাল্টে দুর্বৃত্তরা কেনাবেচা চালিয়ে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে দাম নেয়া হচ্ছে দ্বিগুণেরও বেশি।

রাজধানীর তেজগাঁও রেলস্টেশন বস্তি ও মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে এখনও ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদক বিক্রি হচ্ছে বলে একাধিক সূত্রে জানা গেছে। তবে আগের মতো হাঁকডাক দিয়ে নয়, পরিচিত গ্রাহকদের কাছে বিক্রি হচ্ছে মাদক। মোবাইল ফোনে কিংবা ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে অর্ডার করলে গ্রাহকের বাসায় ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদক পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। পুলিশ, র‌্যাব যাতে ক্রেতা সেজে ফাঁদে ফেলতে না পারে, সেজন্য এ পদ্ধতি চালু করেছে মাদক বিক্রেতারা। এদিকে মাদকের মামলায় গ্রেফতার অধিকাংশ আসামি জামিনে বের হয়ে যাওয়ায় মাদক নির্মূলে সরকারের উদ্যোগের সফলতা নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জানিয়েছেন, অভিযানে ইয়াবার বড় বড় চালান ধরা পড়ছে। এতেই বোঝা যাচ্ছে, মাদক বিক্রি বন্ধ হয়নি। তবে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। মাদকের সহজলভ্যতা অনেক কমেছে। মাদক বিক্রি বন্ধে ভিন্ন কৌশল নিয়ে কাজ করছেন তারা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ঢাকা মেট্রোর উপপরিচালক মকুল জ্যোতি চাকমা জানান, অভিযানের কারণে মাদক বিক্রি কমেছে। তবে বন্ধ হয়নি। কৌশল পাল্টে চলছে মাদক কেনাবেচা।

তিনি বলেন, ‘হোম ডেলিভারি ও মোবাইল ফোনে প্রায় দ্বিগুণ দামে ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। এক্ষেত্রে মোবাইল নম্বর ও কণ্ঠস্বর অপরিচিত হলে তাদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে না। অপরিচিত কারও কাছে মাদক বিক্রি করলেও কয়েকটি জায়গায় ঘুরিয়ে লোকজন দিয়ে যাচাই-বাছাই করে বিশ্বস্ত মনে হলে তারপর ওই গ্রাহকের কাছে মাদক বিক্রি করছে তারা। তিনি আরও বলেন, সাঁড়াশি অভিযানের কারণে তালিকাভুক্তরা গা-ঢাকা দিয়েছে। তবে তাদেরই নিয়োগ করা কিছু নতুন মুখ মাদক বিক্রি করছে।

রাজধানীর কারওয়ানবাজার রেললাইন বস্তি অনেকের কাছে মাদকের হাট। কোনো আড়াল-আবডালে নয়, এখানে প্রকাশ্যে চলত মাদক কেনাবেচা। তবে চলমান অভিযানের কারণে চিত্র পাল্টে গেছে। এখানে প্রকাশ্যে মাদক বিক্রি না হলেও বস্তির বিভিন্ন ঘরে মাদক কেনাবেচা ও সেবন হয়। ১০ আগস্ট বেলা ১১টার দিকে বস্তির রেলপথ দিয়ে হাঁটছিলেন এই প্রতিনিধি। কিছু দূর যেতেই চোখে পড়ে জটলা।

খুপরি ঘরের সামনে বসে কলকিতে করে গাঁজা সেবন করেছে কিছু লোক। পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই এক তরুণ বলে, মামা সিদ্ধি লাগবে। কত বলতেই ঘরের ভেতর থেকে কাগজে মোড়ানো গাঁজা এনে বলে, একশ টাকা দেন। ইয়াবা পাওয়া যায় না? জিজ্ঞাস করতেই সন্দেহের চোখে তাকায়। বলে, ‘বাবা বিক্রি করি না, আমি শুধু গাঁজা বিক্রি করি।’ তেজগাঁও লেভেলক্রসিংয়ের পাশের এক ডিম বিক্রেতা যুগান্তরকে বলেন, ‘ইয়াবা বিক্রি হচ্ছে। তবে আগের মতো প্রকাশ্যে নয়। এখন ফোনে ফোনে বিক্রি হচ্ছে মাদক।’

রাজধানীর মাদকের বড় আখড়া হল মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প। এদিন বেলা ২টায় জেনেভা ক্যাম্পে গিয়ে একই চিত্র দেখা যায়। অভিযানে র‌্যাবের হাতে ক্যাম্পের দেড় শতাধিক মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতারের পর পাল্টে গেছে এখানকার চিত্র।

বিশেষ করে র‌্যাবের হাতে ক্যাম্পের মাদকসাম্রাজ্ঞী পাপিয়া স্বামীসহ গ্রেফতার এবং পরবর্তী সময়ে বন্ধুকযুদ্ধে ইয়াবা গডফাদার নাদিম ওরফে পঁচিশ নাদিম নিহতের পর প্রকাশ্যে এখানে মাদক বিক্রি হচ্ছে না। তবে নতুন কিছু তরুণ এখানে মাদক বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ীরা আত্মগোপনে থেকে এসব তরুণকে দিয়ে মোবাইল ফোনে হোম ডেলিভারি পদ্ধতিতে রাজধানীর বিভিন্ন বাসা ও অ্যাপার্টমেন্টে ইয়াবা সরবরাহ করছে।

মোহাম্মদপুর জেনেভা ক্যাম্প এলাকার এক বিরিয়ানি ব্যবসায়ী যুগান্তরকে বলেন, মূল গডফাদার ইশতিয়াক এখনও গ্রেফতার হয়নি। তবে পাপিয়া ও তার স্বামী ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা যাওয়ায় মাদক কেনাবেচা কমেছে। জেনেভা ক্যাম্প এলাকায় মোবাইল ফোনে ইয়াবা বিক্রেতা এক যুবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলে, ‘ব্যবসা আগের মতো নেই। বিভিন্ন সংস্থার লোকজন সব সময় ছদ্মবেশে ঘোরাঘুরি করে। এখন পরিচিত ছাড়া কারও কাছে ইয়াবা বিক্রি করি না। এমনকি কণ্ঠস্বর অপরিচিত হলেও যাই না।’

জানতে চাইলে তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার মো. ওহিদুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, ‘জেনেভা ক্যাম্পে মাদকের ছাড়ছড়ি আগের মতো নেই। এখানকার মাদকের মূল গডফাদার ইশতিয়াক এখনও গ্রেফতার হয়নি। তাকে গ্রেফতার করা গেলে ক্যাম্পকেন্দ্রিক মাদক ব্যবসা বন্ধ করা যাবে।’

২৬ মে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্পে মাদকবিরোধী অভিযান চালায় র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)। অভিযানে ১৫৩ জন আটক হয়। এর মধ্যে ৭৮ জনের বিরুদ্ধে পৃথক ৯টি মামলা করা হয়। বাকিদের র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়।

মামলাগুলোর মধ্যে মোহাম্মদপুর ১৪২(৫)১৮ নম্বর মামলায় মোট আসামি ১০ জন। এর মধ্যে ৯ জনই বর্তমানে জামিনে আছে। মামলাটির তদন্ত অধ্যাবধি শেষ হয়নি। ২৯ আগস্ট এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য রয়েছে। মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছে- মো. সাদিক, মো. আবদুল সালাম, মো. মহিদুল ইসলাম, মো. মেরাজ, মো. আকাশ, মো. সাজু, মাসুম, মো. গুড্ডু মিয়া, মো. মাসুম ও মো. ইমরান হোসেন। এ মামলায় শুধু মো. ইমরান হোসেনের কাছ থেকে ৮৫ পিস ইয়াবা উদ্ধার দেখানো হয়েছে। বর্তমানে সে কারাগারে আছে। বাকি ৯ আসামিই জামিনে বাইরে আছে।

মোহাম্মদপুর ১৩১(৫)১৮ নম্বর মামলায় আসামি তিনজন। তারা হল- মো. চোসতা সেলিম, মো. মামুন ও মো. রিপন। আসামিদের মধ্যে হেরোইনসহ গ্রেফতার সেলিম এখনও কারাগারে রয়েছে। ২৫ পিস ইয়াবাসহ রিপন ও গাঁজাসহ গ্রেফতার দেখানো মামুন জামিনে আছে। শুধু এ দুটি মামলাই নয়, মোহাম্মদপুর থানায় দায়ের করা ৯টি মামলার মধ্যে বর্তমানে ৭টি মামলার তদন্ত কাজ চলছে। বাকি দুটি মামলায় চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দেয়া হয়েছে। চার্জশিট দাখিলকৃত মামলা দুটি বদলি ও বিচারের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে।

জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের রাষ্ট্রপক্ষের অতিরিক্ত কৌঁসুলি তাপস কুমার পাল যুগান্তরকে বলেন, ‘যদি কোনো আসামি উচ্চ আদালত কিংবা নিু আদালত থেকে জামিন পেয়ে থাকে আর যদি আসামি জামিনের মিস ইউস না করে, তাহলে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আসামির জামিন বাতিলের আবেদন করা হয় না। আর যদি আসামি জামিনের মিস ইউস করে, তাহলে জামিন বাতিলের আবেদন করা হয়। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে তদন্তাধীন মামলায় আসামিদের জামিন পাওয়া অপেক্ষাকৃত সহজ। তাই হাতেনাতে মাদকসহ গ্রেফতার মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত করে চার্জশিট দেয়া উচিত।’

র‌্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান যুগান্তরকে বলেন, ‘অভিযানের ফলে মাদকের সহজলভ্যতা কমেছে। পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আসছে। তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। মাদক বিক্রি বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত র‌্যাবের অভিযান অব্যাহত থাকবে। তিনি বলেন, ইয়াবা দেশে আনার রুটগুলো র‌্যাবের নজরদারিতে রয়েছে। এ কারণে রিরুট করে নতুন নতুন কৌশলে ঢাকায় মাদক নিয়ে আসছে চক্রের সদস্যরা। গত এক সপ্তাহে র‌্যাবের অভিযানে ইয়াবার বড় দুটি চালান (৪ লাখ পিসের ওপরে) ধরা পড়েছে।’

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) যুগ্ম কমিশনার শেখ নাজমুল আলম বলেন, ‘নতুন কৌশলে মাদক বিক্রির পদ্ধতি আটকাতে কাজ চলছে। নিয়মিত অভিযানের পাশাপাশি যদি মাদকের উৎস বন্ধ করা যায়, তাহলে দ্রুত পরিস্থিতির আরও উন্নতি হবে।’

পুলিশ সদর দফতর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পুলিশের বিভিন্ন ইউনিটের অভিযানে ৪২ হাজার ৮০৫ জন মাদক ব্যবসায়ী ও সেবনকারী গ্রেফতার হয়েছে। মামলা হয়েছে ৩৩ হাজারের ওপরে। র‌্যাব সদর দফতরের তথ্যমতে, ৪ মে থেকে বিশেষ অভিযানে সারা দেশে র‌্যাব ৩ হাজার ৩১৭টি অভিযান পরিচালনা করেছে।

অভিযানকালে ৬৫ মাদক ব্যবসায়ী ও সেবী ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে ৪ হাজার ৫৪৬ জন। অভিযানে ১৩৮ কোটি টাকার ১৩ লাখ টাকার বিভিন্ন ধরনের মাদক জব্দ করা হয়েছে। এ সময় র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালত ৭ হাজার ৮৭২ জনকে গ্রেফতার করেন। তাদের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

ঘটনাপ্রবাহ : মাদকবিরোধী অভিযান ২০১৮

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter