পাচারসহ নানা ঝুঁকিতে অনাথ রোহিঙ্গা শিশুরা

প্রকাশ : ২৬ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  যুগান্তর রিপোর্ট

মা-বাবা হারানো রোহিঙ্গা শিশুদের চোখে-মুখে এখনও আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। এক বছর আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও স্থানীয় লোকজনের অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়ে তারা মাতৃভূমি রাখাইন ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।

পরিবার-পরিজন হারিয়ে অনাথ হয়ে পড়া এসব শিশু এখন পাচার, বাল্যবিবাহ ও নানা ধরনের নির্যাতনের ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। তারা মানবতাবিরোধী অপরাধেরও শিকার হচ্ছে। কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে অভিভাবকহীন প্রায় ৩০ হাজার শিশু রয়েছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের সর্বশেষ গবেষণা থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।ক্যাম্পগুলোতে এসব শিশু পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপন করলেও তাদের মনে কোনো আনন্দ ছিল না। এ সময় তাদের স্মৃতিপটে ভেসে উঠে ভয়ানক সব ঘটনা। মা-বাবাকে হারানোর বেদনাদায়ক স্মৃতি। মা-বাবা হারা, মা অথবা বাবা হারা শিশুরা দিনটিতে চোখের জল ধরে রাখতে পারেনি। তারা অঝোরে কেঁদেছে। তাদের চোখে-মুখে আজও আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট হয়ে আছে।

সেভ দ্য চিলড্রেনের গবেষণায় বলা হয়, কক্সবাজারে আশ্রয় নেয়া প্রতি দু’জনের মধ্যে একজন শিশু ভয়াবহ সহিংসতার কারণে মাকে হারিয়েছে ও পরিবারহীন হয়েছে। এতে বলা হয়, এসব শিশু আজও সেই ভয়ংকর স্মৃতি বয়ে বেড়াচ্ছে। তারা খাদ্যাভাব, শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকিতে রয়েছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের কক্সবাজারের মিডিয়া ও কমিউনিকেশন কো-অর্ডিনেটর ফারজানা সুলতানা জানান, ১৩৯টি অভিভাবকহীন রোহিঙ্গা শিশু নিয়ে তারা গবেষণা করেছেন। মিয়ানমারের সহিংসতার পর শিশুদের নিয়ে এটি সবচেয়ে বড় গবেষণা। নৃশংস ঘটনায় ৬৩ শতাংশ শিশু অভিভাবককে হারিয়েছে। বাংলাদেশে আসার পথে ৯ শতাংশ শিশু পরিবার ও অভিভাবককে হারিয়েছে। ৫০ শতাংশ শিশু বলেছে, অভিভাবক ও পরিজনদের হত্যা করা হয়েছে। তাদের অনেকে আবার হত্যাকাণ্ডের প্রত্যক্ষদর্শী।

সেভ দ্য চিলড্রেনের বাংলাদেশ কান্ট্রি ডিরেক্টর মার্ক পিয়ারস বলেন, শুরুতে এ শিশুরা ছিল দুর্দশাগ্রস্ত, ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত। তাদের কথা বলার শক্তিটুকুও ছিল না। আমরা তাদের জন্য জায়গা তৈরি করছি। এক বছর পর এটা মোটামুটি পরিষ্কার তারা এখন অনাথ। পৃথিবীতে তারা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে। পরিবারের সদস্য ছাড়া তাদের মধ্যে নতুন এক অস্তিত্ব তৈরি হয়েছে। ক্যাম্পের এসব শিশু পাচার, বাল্যবিবাহ ও নানা ধরনের নির্যাতনের ঝুঁকিতে রয়েছে। ক্যাম্পে অবস্থানরত শিশুরা ভয়ানক মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হচ্ছে। সেভ দ্য চিলড্রেনের গবেষণায় বলা হয়, ১২ মাসে ৩ লাখ ৫০ হাজার রোহিঙ্গা শিশুকে সেবা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে একটি বড় সংখ্যা হল অনাথ ও পরিবারহীন শিশু। সংস্থাটি এ পর্যন্ত ১০০টি শিশু ও নারীবান্ধব কেন্দ্র স্থাপন করেছে। কেন্দ্রগুলোতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টি, খাদ্য, পানি ও স্যানিটেশনের সুযোগ পাচ্ছে শিশুরা।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন যুগান্তরকে জানান, রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে মা-বাবা হারা প্রায় আট হাজার শিশু এবং মা অথবা বাবা হারা ২২ হাজার শিশু রয়েছে। ঈদের আমেজ রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতেও ছিল। কিন্তু সেই আমেজ বিশেষ করে অভিভাবকহীন শিশুদের মনে লাগেনি। তিনি বলেন, এসব অনাথ শিশুদের কল্যাণে সরকার যথাযথ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে মা-বাবা হারা আট হাজার এবং মা অথবা বাবা হারা ২২ হাজার শিশুকে দুই হাজার টাকা করে অর্থ সহায়তা দেয়া হচ্ছে। প্রতি মাসে তাদের ছয় কোটি টাকা দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু অনাথ শিশুদের নয়, সব শিশুর অধিকার নিশ্চিত করতে সরকার কাজ করছে।