চীনের সঙ্গে বাণিজ্য

ডব্লিউটিও’র প্রটোকলেই থাকছে বাংলাদেশ

আপটা সাময়িক স্থগিত * এফটিএ চুক্তির প্রক্রিয়া চলছে

  শাহ আলম খান ২৭ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ডব্লিউটিও’র প্রটোকলেই থাকছে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত

বড় অর্থনীতির দেশ চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ মুক্তবাণিজ্য চুক্তির (এফটিএ) দিকেই গড়াচ্ছে। বর্তমানে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এতদিন এ বিপুল পরিমাণ বাণিজ্য চলত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পৃথক দুই বাণিজ্য সুবিধার প্রটোকলের আওতায়।

এর একটি হচ্ছে, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্য চুক্তি (আপটা); অপরটি হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও)। সম্প্রতি এতে পরিবর্তন আনা হয়েছে বলে দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, বাড়তি সুযোগ ও স্বার্থসংশ্লিষ্টতা বিষয়ক বাংলাদেশের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে আপটার আওতায় পাওয়া শুল্কমুক্ত বাণিজ্য সুবিধা সাময়িক সময়ের জন্য স্থগিত করা হয়েছে।

এ লক্ষ্যে দুই দেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ইতিমধ্যে লেটার অব ইনডেন্ট চুক্তি স্বাক্ষর করেছেন। অন্যদিকে চীনের বাজারে বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গন্তব্য এফটিএ হলেও-সমঝোতার ভিত্তিতে দুই দেশের সরকারের মধ্যে এ চুক্তি স্বাক্ষর না হওয়া পর্যন্ত ডব্লিউটিও’র প্রটোকলে থাকা চলমান শুল্কমুক্ত সুবিধাই বহাল থাকছে।

জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব শুভাশীষ বসু যুগান্তরকে বলেন, বাংলাদেশের প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতে সাময়িকভাবে ‘আপটা’ স্থগিত করেছে চীন। একইভাবে উন্নয়নশীল দেশে চূড়ান্ত উন্নতি না হওয়া পর্যন্ত চীনের বাজার থেকে ডব্লিউটিও’র প্রটোকলে থাকা শুল্কমুক্ত সুবিধা প্রাপ্তির প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। চীন বাংলাদেশের প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছে।

কবেনাগাদ চীনের সঙ্গে এফটিএ স্বাক্ষর হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য সচিব বলেন, একটা প্রক্রিয়া চলছে। সেটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে এফটিএ’র মতো চুক্তি স্বাক্ষরে যাতে বাংলাদেশ কোনোভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সে বিষয়টিই পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিচার বিশ্লেষণ করা হবে।

একইভাবে ক্ষতি হলে বিকল্প উপায়ে কিভাবে তার চেয়ে বেশি সুবিধা আদায় করা যায় তা কম্প্রিহেনসিভ সমীক্ষা চালিয়ে দেখতে এফটিএ সংক্রান্ত ওয়ার্কিং কমিটির ১৩ সদস্য কাজ করছেন। তাদের সার্বিকভাবে সহযোগিতা দিচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। তিনি বলেন, চুক্তি হবে। তবে সেটা ধীরে-সুস্থে, শতভাগ দেশের স্বার্থ বজায় রেখেই হবে।

তবে কবেনাগাদ হতে পারে সেটা এখনই বলা যাচ্ছে না।

বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের মতো বড় বাজারের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি করা হলে দেশীয় বাজার চীনা পণ্যে সয়লাবের মতো ঝুঁকি রয়েছে। তবে ঝুঁকিমুক্ত থাকার বিকল্প পথও খোলা রয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সেটি নির্ভর করবে বাংলাদেশের দরকষাকষির সক্ষমতার ওপর।

এফটিএ শুধু পণ্যভিত্তিক আমদানি-রফতানির মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে যদি এতে বাণিজ্যের পাশাপাশি বিনিয়োগ, সেবা, জনশক্তি, তথ্যপ্রযুক্তিসহ অর্থনৈতিক বৃহত্তর অংশীদারিত্বমূলক বিভিন্ন বিষয় অন্তর্ভক্ত করা যায়।

এসব বিষয়ে চীন সরকারের সম্মতি আদায়ে যদি দায়িত্বশীল দরকষাকষি করা যায় তাহলে এফটিএ থেকে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক লাভ নেয়ার সুযোগ তৈরি হবে। দায়িত্বশীলদের এসব বিবেচনায় রেখেই এগোতে হবে।

কেন এফটিএর মতো পদক্ষেপ : ২০২৪ সালে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের চূড়ান্ত ধাপে পৌঁছলে ২০২৭ সালের পর অন্যান্য দেশের মতো চীনের বাজারেও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) শুল্কমুক্ত সুবিধা আর থাকবে না।

ডব্লিউটিওর বাইরে আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তি আপটা থেকেও খুব একটা লাভবান হওয়া যাচ্ছে না। অন্যদিকে স্বল্পোন্নত দেশ থেকে প্রাথমিক উত্তরণের পর বাংলাদেশের সামনে এখন বিশাল বিনিয়োগ দরকার। এক্ষেত্রে চীন বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক পরাশক্তি।

দেশটিতে অনেক দূরদর্শী, সাহসী ও সফল উদ্যোক্তা রয়েছেন। এফটিএ চুক্তির আওতায় তারা যদি বাংলাদেশে উচ্চহারের বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে আসেন- তাহলে একদিকে বিনিয়োগের মন্দা দূর হবে, অন্যদিকে নতুন নতুন শিল্পায়ন হবে। এতে রফতানিমুখী পণ্যের বহুমুখীকরণ ঘটবে; যা রফতানির ঝুলিকে আরও সমৃদ্ধ করবে। তাছাড়া বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হবে।

চীনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) পরিমাণ বিশ্বের মোট অর্থনীতির ১৬ শতাংশের সমান। দেশটি শুধু রফতানিই করে না। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারকও চীন। ভবিষ্যতে বিসিআইএম ইকোনমিক করিডোর, বিবিআইএন ও ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড- এসব সুবিধা দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের খরচ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে। এসব লক্ষ্যকে সামনে রেখেই দেশটির সঙ্গে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট বা মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে (এফটিএ) যাচ্ছে বাংলাদেশ।

যে কারণে আপটা সাময়িক স্থগিত ও ডব্লিউটিওতে থাকার পক্ষে : বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, এশিয়া প্রশান্ত মহাসাগরীয় বাণিজ্য চুক্তি (আপটা) ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) দুই জোটেরই সদস্য বাংলাদেশ।

ডব্লিউটিও’র বিধান অনুযায়ী চীনের কাছ থেকে স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্যে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত সুবিধা পাওয়ার কথা। এর আওতায় ৭ হাজার ৮০০ রফতানিযোগ্য পণ্য রয়েছে।

এর থেকে বাংলাদেশ শুল্কমুক্ত সুবিধা পাচ্ছে মাত্র ৪ হাজার ৭০০টি পণ্যের। কিন্তু আঞ্চলিক বাণিজ্যকে গুরুত্ব দিয়ে বাংলাদেশ এতদিন চীনের সঙ্গে আপটা চুক্তির প্রটোকলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে চালিয়ে আসছে। আপটার তালিকায় শুল্কমুক্ত পণ্যের সংখ্যা ৪ হাজার ৬৪৮টি, যার থেকেও আবার ৬০ শতাংশের বেশি পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে না।

তাছাড়া সাম্প্রতিক এক পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চীনের বাজার থেকে আপটা চুক্তির আওতায় যে শুল্ক সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে, তা সেদেশে রফতানি সম্প্রসারণের জন্য সহায়ক নয়। কারণ এ চুক্তির প্রটোকলে শুল্ক সুবিধার যেসব পণ্য তালিকাভুক্ত রয়েছে তা রফতানিতে বাংলাদেশের সক্ষমতা অনেক কম।

শুল্কমুক্ত পণ্যের তালিকাও তুলনামূলক ছোট এবং ছাড়কৃত পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধাভোগেও রয়েছে নানা জটিলতা। এসব বাস্তবতা বিবেচনায় রেখেই বাংলাদেশ আপাতত ডব্লিউটিওতেই থাকতে চায়।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশনের চেয়ারম্যান জহির উদ্দিন আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ডব্লিউটিও’র শুল্কমুক্ত সুবিধা স্থগিত হওয়ার আগপর্যন্ত চীনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে ডব্লিউটির প্রটোকলেই থাকাটাই বাংলাদেশের বেশি লাভজনক হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান ঠিকই আছে।

ডব্লিউটিওর শুল্কমুক্ত সুবিধা উঠে গেলে এবং চীনের সঙ্গে এফটিএ শেষপর্যন্ত না হলে আপটায় কোনো প্রভাব পড়বে কি-না, জানতে চাইলে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) মো. শফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, দেশ উন্নয়নশীলের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছলে ডব্লিউটিও’র শুল্কমুক্ত সুবিধা উঠে যাবে এটাই বাস্তবতা।

তখন আমাদের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এফটিএতে যেতে হবে। চীনের সঙ্গে বর্তমানে এফটিএ সংক্রান্ত যে তৎপরতা চলছে, এটা তারই প্রস্তুতির অংশ। তবে শেষপর্যন্ত এফটিএ যদি না-ই হয়, তাহলে আমরা আবার আপটার বাণিজ্য সুবিধায় ফিরে যাব। আপটা তো সাময়িক স্থগিত করা হয়েছে। আমরা তো একবারে বের হয়ে যাইনি।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter