জনতা ব্যাংকে সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতি

ক্রিসেন্টের বিরুদ্ধে মামলার সিদ্ধান্ত

অ্যানন টেক্স পাবে আরও ঋণসুবিধা

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  দেলোয়ার হুসেন

ছবি: সংগৃহীত

দেশের দুটি শিল্প গ্রুপের সাড়ে ১০ হাজার কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় দুই ধরনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে জনতা ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। এর মধ্যে ক্রিসেন্ট গ্রুপের বিরুদ্ধে ঋণ জালিয়াতির দায়ে মামলা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। অন্যদিকে অ্যানন টেক্স গ্রুপের বিরুদ্ধে আপাতত কোনো মামলা না করে তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য এলসির সীমা বাড়িয়ে সীমিত আকারে পরোক্ষ ঋণসুবিধা দেয়ার পক্ষে ব্যাংক। সম্প্রতি ব্যাংকের পর্ষদ সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জনতা ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের একজন নির্বাহী জানান, দুটি গ্রুপকে নিয়েই তারা খুব অস্বস্তিতে আছেন। ঋণ আদায়ের জন্য পর্ষদ থেকে নিয়মিত তদারকি হচ্ছে। প্রধান কার্যালয় ও শাখা থেকেও গ্রাহকদের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। যেসব রফতানি বিল কেনা হয়েছে সেগুলোর সঠিকতা যাচাই করে অর্থ দেশে আনার জন্য বিদেশি ব্যাংকের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে।

এদিকে এ দুটি গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির ঘটনা তদন্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংক জনতা ব্যাংককে বেশ কিছু নির্দেশনা দিয়েছে। সম্প্রতি জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) কাছে পাঠানো পৃথক দুটি চিঠিতে এসব নির্দেশনা দেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে- দুটি গ্রুপের সমুদয় ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করা, ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত নেয়া এবং ঋণ নিয়মিতভাবে আদায় নিশ্চিত করা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এ নির্দেশনার পর ইতিমধ্যে ক্রিসেন্ট গ্রুপের ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করেছে জনতা ব্যাংক। এর বিরুদ্ধে ক্রিসেন্ট গ্রুপ আদালতে রিট করে স্থগিতাদেশ পায়। ব্যাংক ওই স্থগিতাদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে আদালত স্থগিতাদেশ বাতিল করে। এখন ঋণটি আবার খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করেছে ব্যাংক। ফলে গ্রাহক (ক্রিসেন্ট গ্রুপ) আর নতুন কোনো ঋণ পাচ্ছে না।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ক্রিসেন্ট গ্রুপের কর্ণধার এমএ কাদেরকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। তবে জনতা ব্যাংকে দেয়া এক চিঠিতে তিনি জানিয়েছেন, তাকে একটু সময় দিলে ব্যবসা পরিচালনা করে তিনি সব ঋণ শোধ করতে চান। তিনি টাকা নিয়ে কারখানা করেছেন। অন্য কোনো খাতে ব্যবহার করেননি।

উল্লেখ্য, জনতা ব্যাংক থেকে ক্রিসেন্ট গ্রুপকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে নগদ ঋণ দেয়া হয়েছে ২ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। ভুয়া রফতানি বিল বিক্রি করে নিয়েছে ১ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা, আর রফতানি আয়ের বিপরীতে সরকারের দেয়া বিকল্প নগদ সহায়তার অর্থ বাবদ নিয়েছে ১ হাজার ৭৫ কোটি টাকা। রফতানি না করেই এ খাতে ভর্তুকির অর্থ নেয়ার কারণে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা জনতা ব্যাংকের হিসাব থেকে ৪০৮ কোটি টাকা কেটে সরকারের কোষাগারে জমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাকি অর্থের বিষয়ে তদন্ত হচ্ছে।

অন্যদিকে অ্যানন টেক্স জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার ঋণ সুবিধা নিয়েছে। এর মধ্যে নগদ ঋণ নিয়েছে ৩ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা এবং পরোক্ষ ঋণ নিয়েছে ১ হাজার ১৩০ কোটি টাকা। এর মধ্যে তারা ৮০০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে।

অ্যানন টেক্সের ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশের পর এখনও তা করেনি জনতা ব্যাংক। কেননা ঋণ খেলাপি হিসেবে চিহ্নিত না করতে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ব্যাংকের ওপর চাপ রয়েছে। উল্টো অ্যানন টেক্সের পক্ষে আরও নতুন ঋণ চেয়ে জনতা ব্যাংক ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। এ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় জনতা ব্যাংক কর্তৃপক্ষের সঙ্গে একটি বৈঠকও করেছে। তবে জনতা ব্যাংককে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নির্দেশনা দেয়া হয়নি।

এ বিষয়ে জনতা ব্যাংকের পর্ষদে সম্প্রতি আলোচনা হয়েছে। এতে তারা অ্যানন টেক্সকে ব্যবসা পরিচালনার জন্য তাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা এলসির সীমা বাড়িয়ে কিভাবে সীমিত আকারে নতুন ঋণ সুবিধা দেয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হয়। এ বিষয়ে শাখা থেকে গ্রুপের সার্বিক অবস্থা নিয়ে আরও বিস্তারিত তথ্য তলব করা হয়েছে।