আপিল বিভাগে বাড়ছে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা

বিচারপতি নিয়োগ কবে?

বিচারপতি নিয়োগ দেয়া উচিত-রেজিস্ট্রার জেনারেল * জ্যেষ্ঠতা ও দক্ষতা বিবেচনায় নিয়োগ দিতে হবে-ব্যারিস্টার শফিক

প্রকাশ : ০১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  আলমগীর হোসেন

সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা ব্যাপক হারে কমে যাওয়ায় বাড়ছে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা। ৩১ মার্চ পর্যন্ত আপিল বিভাগে বিচারাধীন মামলা ছিল ১৮ হাজার ২৪৬টি। ৩০ জুন পর্যন্ত মামলার সংখ্যা বেড়ে ১৯ হাজার ৪৯৩টিতে গিয়ে ঠেকেছে।

জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চ পর্যন্ত তিন মাসে মামলা নিষ্পত্তির সংখ্যা ছিল ১ হাজার ৪৮৫টি। ৩০ জুন পর্যন্ত পূর্ববর্তী তিন মাসে মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৯৭৪টি। সুপ্রিমকোর্টের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এ তথ্য উঠে এসেছে।

বর্তমানে আপিল বিভাগে ৪ জন বিচারপতি রয়েছেন। প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে ওই বেঞ্চে তিনজন সদস্য রয়েছেন। একসময় বিচারপতির সংখ্যা ছিল ১১ জন। গত নভেম্বর পর্যন্তও দুটি বেঞ্চে বিচার কাজ চলে। বিচারাধীন মামলার সংখ্যা বৃদ্ধির পেছনে বিচারক স্বল্পতাই মূল কারণ বলছেন আইনজ্ঞরা।

এর আগে ৯ জানুয়ারি রাজধানীতে এক অনুষ্ঠানে এবং ১০ জুলাই জাতীয় সংসদে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানিয়েছিলেন, শিগগিরই আপিল বিভাগে কিছু বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হবে। এ বিষয়ে বুধবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও মন্ত্রীকে পাওয়া যায়নি। পরে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল ড. জাকির হোসেনের সঙ্গে কথা হয়। তিনিও আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ দেয়া উচিত বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন।

সংবিধানে উচ্চ আদালতে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ করা নেই। প্রয়োজনে প্রধান বিচারপতির পরামর্শে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। সংবিধানের ৯৪(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগে বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ ও নিয়োগ করে থাকেন।

ওই অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘প্রধান বিচারপতি (যিনি ‘বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি’ নামে অভিহিত হইবেন) এবং প্রত্যেক বিভাগে আসন গ্রহণের জন্য রাষ্ট্রপতি যেরূপ সংখ্যক বিচারক নিয়োগের প্রয়োজনবোধ করবেন, সেইরূপ সংখ্যক অন্যান্য বিচারক লইয়া সুপ্রিমকোর্ট গঠিত হইবে।’ সংবিধান অনুযায়ী ৬৭ বছর বয়স পর্যন্ত বিচারপতি পদে থাকা যায়। ২০০৯ সালে রাষ্ট্রপতির জারি করা প্রজ্ঞাপনে আপিল বিভাগে ১১ জন বিচারক থাকবেন বলে উল্লেখ করা হয়।

সূত্র বলছে, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা দায়িত্ব নেয়ার পর মামলাজট কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হয়। তবে বিচারক সংকটের কারণে মামলাজট সেভাবে কমানো যায়নি। গত বছরের শুরুতেও আপিল বিভাগের তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ৯ বিচারপতি ছিলেন। বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমানের মৃত্যু, বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা ও বিচারপতি নিজামুল হকের অবসর গ্রহণ, প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার পদত্যাগ এবং পরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞার পদত্যাগের পর আপিল বিভাগে বিচারপতির সংখ্যা নেমে চারজনে দাঁড়িয়েছে।

আপিল বিভাগে সবশেষ ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ৩ জন বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়। আড়াই বছরে কোনো বিচারপতি নিয়োগ দেয়া হয়নি। প্রাপ্ত তথ্য বলছে, বর্তমানে আপিল বিভাগে বিচারাধীন ১৯ হাজার ৪৯৩টি মামলার মধ্যে ১৩ হাজার ২৬টি দেওয়ানি, ৬ হাজার ৩৫১টি ফৌজদারি ও অন্যান্য ১১৬টি। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৯৭৪টি মামলা। বিচারক সংকট ও মামলাজট নিয়ে প্রধান বিচারপতিও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।

আইনজীবীদের উদ্দেশে এক বাণীতে তিনি বলেন, মামলাজট আজ শুধু আদালতের একার সমস্যা নয়। এটি বারের জন্যও অস্বস্তির কারণ। মামলার পাহাড় জমতে থাকলে আদালতের সঙ্গে বারের প্রতি বিচারপ্রার্থীদের আস্থা ও বিশ্বাস কমতে থাকবে।

আপিল বিভাগ বিচারপতি নিয়োগের প্রয়োজনিয়তা উল্লেখ করে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, সম্প্রতি হাইকোর্ট বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ হয়েছে। আপিল বিভাগেও হবে। আশা করছি, জ্যেষ্ঠতা ও দক্ষতা বিবেচনায় নিয়োগ হবে।

বিচারপতি নিয়োগে স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করে নীতিমালা প্রণয়নের বিকল্প নেই বলে মনে করেন সুপ্রিমকোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ এবং বিচারক নিয়োগে নীতিমালা সংক্রান্ত হাইকোর্টের রায়ের আলোকে সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগে বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে। এক্ষেত্রে জ্যেষ্ঠতা এবং দক্ষতাকে প্রাধান্য দিতে হবে।