টাকা পরিশোধ কাল

চীন ডিএসইর শেয়ার পাচ্ছে মঙ্গলবার

প্রত্যেক সদস্য পাবে ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা * শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের শর্তে কর মওকুফ চায় ডিএসই

প্রকাশ : ০২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মনির হোসেন

ডিএসই। ফাইল ছবি

বহুল আলোচিত ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) শেয়ার বিক্রির টাকা আগামীকাল সোমবার পরিশোধ করবে চীন। পরদিন মঙ্গলবার শেয়ার হস্তান্তর করবে (ডিএসই) কর্তৃপক্ষ। এক্ষেত্রে শেয়ারের জন্য চীনের দুই প্রতিষ্ঠানকে প্রায় সাড়ে ৯শ’ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে।

এতে ডিএসইর প্রত্যেক সদস্য ৩ কোটি ৭৮ লাখ কোটি টাকা করে পাবেন। চীনা কনসোর্টিয়াম ডিএসইর অংশীদার হওয়ায় দেশের পুঁজিবাজার আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদায় উন্নীত হচ্ছে। এছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জের উন্নয়নে চীনা কনসোর্টিয়াম ৩০৭ কোটি টাকার কারিগরি সহায়তা দেবে।

স্টক এক্সচেঞ্জের ডিমিউচুয়ালাইজেশনের (মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনা আলাদাকরণ) শর্তানুসারে কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনের দুই প্রতিষ্ঠানের কাছে ডিএসইর শেয়ার বিক্রি করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠান দুটি হল- সাংহাই ও শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জ।

জানতে চাইলে ডিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক কেএম মাজেদুর রহমান শনিবার যুগান্তরকে বলেন, টাকা হস্তান্তরের জন্য নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে অ্যাকাউন্টে টাকা চলে এসেছে। সেটি সোমবার ডিএসইর অ্যাকাউন্টে ক্রেডিট হবে। পরদিন মঙ্গলবার চীনা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একজনকে ডিএসইর বোর্ডে মনোনয়ন দেয়া হবে।

এরপর সংবাদ সম্মেলন করে আনুষ্ঠানিকভাবে শেয়ার হস্তান্তরের ঘোষণা আসবে। একই সঙ্গে ডিএসইর শেয়ার নিতে সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি প্রতিষ্ঠান সিডিবিএলে বিও অ্যাকাউন্ট খুলবে।

জানা গেছে, ডিএসইর শেয়ার নিতে আজ চীনা জোটটির ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দল ঢাকায় আসবে। এজন্য চীনের সাংহাই ও শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জকে নিটা অ্যাকাউন্ট (বিদেশ থেকে পাঠানো অর্থ টাকায় রূপান্তরের বিশেষ ব্যাংক অ্যাকাউন্ট) খোলার অনুমতি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে এই অ্যাকাউন্ট খুলে ডিএসইর শেয়ারের জন্য অর্থ পরিশোধ করবে চীনা জোট। সোমবার তারা অর্থ পরিশোধের পর মঙ্গলবার সকালে বোর্ড সভা করবে ডিএসই। সভায় জোটটির একজন প্রতিনিধি উপস্থিত থাকবেন, যিনি পরবর্তী সময়ে ডিএসইর পরিচালনা পর্ষদের সদস্য হবেন।

বোর্ড সভার মাধ্যমেই শেয়ার হস্তান্তরের সার্বিক কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। এরপর দুপুরে হোটেল সোনারগাঁওয়ে শেয়ার হস্তান্তরের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়া হবে।

২৬ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক চীনের সাংহাই ও শেনঝেন স্টক এক্সচেঞ্জ জোটকে নিটা অ্যাকাউন্ট খোলার অনুমতি দেয়। বিষয়টি পরদিন ২৭ আগস্ট ডিএসই থেকে জোটটিকে জানানো হয়। গত ১৪ মে চীনা জোটের সঙ্গে চুক্তি সই করে ডিএসই। চুক্তি অনুযায়ী, কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চীনা জোট ডিএসইর ২৫ শতাংশ বা ৪৫ কোটি ৯ লাখ ৪৪ হাজার ১২৫টি শেয়ার কিনবে।

এজন্য প্রতিটি শেয়ারের বিপরীতে ২১ টাকা দরে মোট ৯৪৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা পরিশোধ করবে। ডিএসইর শেয়ারের বিপরীতে চীনা জোটের দেয়া অর্থ ডিএসইর সদস্য ব্রোকারদের ভাগ করে দেয়া হবে। বর্তমানে ডিএসইর শেয়ারহোল্ডার রয়েছেন ২৩৭ ব্রোকার।

এ হিসাবে প্রত্যেক ব্রোকার পাবেন ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা করে। তবে ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের শেয়ার ২১ টাকা দরে বিক্রি করায় মূলধনী মুনাফার ওপর কর দিতে হবে। এদিকে ব্রোকাররা অন্তত তিন বছরের জন্য শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের শর্তে এ লেনদেনে কর ছাড় চেয়েছেন।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) এ বিষয়ে সুপারিশও করে। আর অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, সাংহাই ও শেনঝেন চীনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় পুঁজিবাজার। বাজার মূলধনের দিক থেকে বিশ্বের সেরা দশ স্টক এক্সচেঞ্জের তালিকায়ও রয়েছে এ দুই স্টক এক্সচেঞ্জ।

ফলে তারা ডিএসইর মালিকানায় আসায় দেশের পুঁজিবাজার আন্তর্জাতিকভাবে মর্যাদা পেয়েছে। এর ফলে পুঁজিবাজারে বিদেশিরা বিনিয়োগ করতে আকৃষ্ট হবে। এছাড়া কারিগরিভাবেও শক্তিশালী হবে বলে জানান তিনি।

চীনা জোটটিকে ডিএসইর কৌশলগত বিনিয়োগকারী হিসেবে চলতি বছরের ৩ মে অনুমোদন দেয় বিএসইসি। সঙ্গে বেশকিছু শর্তও জুড়ে দেয়া হয়। এর মধ্যে রয়েছে- কৌশলগত বিনিয়োগকারীর সব কার্যক্রম সিকিউরিটিজ আইন ও দেশের প্রযোজ্য অন্যান্য আইনসহ ডিমিউচুয়ালাইজেশন আইন ২০১৩ এবং ডিএসইর ডিমিউচুয়ালাইজেশন স্কিম অনুযায়ী পরিপালন করতে হবে।

চুক্তির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া চুক্তি সইয়ের এক বছরের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে। কমিশনের পূর্ব অনুমোদন ছাড়া চুক্তির শর্তাবলি ও আনুষঙ্গিক অন্যান্য বিষয় পরিবর্তন করা যাবে না।

প্রসঙ্গত, ডিমিউচুয়ালাইজেশনের শর্ত অনুসারে ডিএসইর ২৫ শতাংশ শেয়ার কৌশলগত বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রি বাধ্যতামূলক। এ কারণে শেয়ার বিক্রির জন্য আন্তর্জাতিকভাবে দরপত্র আহ্বান করে ডিএসই। এরপর চীনের দুই শেয়ারবাজার শেনঝেন ও সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ এবং ভারতের ন্যাশনাল স্টক এক্সচেঞ্জের নেতৃত্বে দুই কনসোর্টিয়াম আলাদাভাবে দরপত্রে অংশ নেয়।

চীনের প্রতিষ্ঠান ডিএসইর ১০ টাকা অভিহিত মূল্যের প্রতিটি শেয়ারের দরপ্রস্তাব করেছে ২২ টাকা (লভ্যাংশ সমন্বয়ের পর ২১ টাকা)। এতে ৪৫ কোটি শেয়ারের মোট মূল্য দাঁড়ায় ৯৯০ কোটি টাকা। এছাড়া স্টক এক্সচেঞ্জের কারিগরি সহায়তার জন্য আরও ৩০৭ কোটি টাকা দেবে চীন।

এতে চীনা প্রতিষ্ঠানের অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৩শ’ কোটি টাকা। বিপরীতে ভারতীয় প্রতিষ্ঠান প্রতিটি শেয়ারের দাম প্রস্তাব করেছিল ১৫ টাকা। এতে শেয়ারের মূল্য দাঁড়ায় ৬৭৫ কোটি টাকা।

ফলে কারিগরি সহায়তাসহ চীনের সঙ্গে ভারতের মূল্যের পার্থক্য দাঁড়ায় ৬২৫ কোটি টাকা। প্রভাবশালী একটি অংশ ভারতের কাছে শেয়ার বিক্রির জন্য স্টক এক্সচেঞ্জকে চাপ দিলেও শেষ পর্যন্ত চীনই পেল ডিএসইর মালিকানা।