‘আমরা’ ও ‘তোমরা’ বিভাজন দূর করাটাই চ্যালেঞ্জ

প্রকাশ : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হক ফারুক আহমেদ

আন্তর্জাতিক চিত্র সমালোচক সংস্থার চেয়ারম্যান মারেক বার্টেলিক। ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক চিত্র সমালোচক সংস্থার চেয়ারম্যান মারেক বার্টেলিক। বিশ্বনন্দিত এ সমালোচক ঘুরে বেড়িয়েছেন পৃথিবীর ৭০টির বেশি দেশ। যুগান্তরের সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় তিনি কথা বলেছেন নানা বিষয়ে। তার মধ্যে বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের কারণে শিল্পাঙ্গনে ক্ষতির বিষয়টি বিশেষভাবে এসেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঐতিহাসিক নানা স্থাপনা এবং শিল্পকর্ম ধ্বংস হয়েছে জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে। এ ব্যাপারে মারেক বার্টেলিক স্পষ্ট ভাষায় কিছু দৃপ্ত উচ্চারণ করেছেন।

তিনি বলেন, জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদের কারণে অনেক ঐতিহাসিক শিল্পসম্ভার ধ্বংস হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক। এর সমাধান চাইলে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হবে। মানুষে মানুষে যে বিভাজন ‘আমরা’ আর ‘তোমরা’ বলে করা হয়ে থাকে, এটা দূর করতে হবে। পৃথিবীর মানুষ সবাই এক। যারা এসব করছে, যে সমাজে এসব নির্বিঘ্নে করার সুযোগ পাচ্ছে, সেখানে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিতে হবে। তাদের সঙ্গে পারস্পরিক আলাপ চালিয়ে বোঝাতে হবে। এটা দু’পক্ষ থেকেই হতে হবে। কারণ, হিংসা দিয়ে, বিদ্বেষের বিপরীতে বিদ্বেষ দিয়ে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। একটা পথই আমি দেখি, মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রকৃত আলো ছড়িয়ে দিতে হবে।

শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে চলমান ১৮তম দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে অংশ নিতে এসে শনিবার আলাপচারিতায় তিনি এ মন্তব্য করেন।

গত ৩ দশকের অধিক সময় ধরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ম্যাগাজিন ও জার্নালে নিয়মিত চিত্রকলা নিয়ে লিখছেন মারেক বার্টেলিক। লেখক হিসেবে জড়িত রয়েছেন শিল্প-পত্রিকা আর্টফোরামের সঙ্গে। পোল্যান্ডের পুরকৌশলের ছাত্র হলেও মারেক বার্টেলিক পরে ঝুঁকে ছিলেন শিল্পকলার ইতিহাসের দিকে। সেই নেশায় পোল্যান্ড ছেড়ে পাড়ি জমান ফ্রান্সে, সেখান থেকে এখন থিতু হয়েছেন নিউইয়র্কে।

যুগান্তরের সঙ্গে আলাপচারিতায় তুরস্কের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, সম্প্রতি আমি সেখানে একটি চিত্রকলাবিষয়ক আয়োজনে গিয়েছিলাম। তারা এখন আধুনিক চিত্রকলা নিয়ে কাজ করছে। আমার শুধু একটা কথাই মনে হয়েছে, শুরুটা তো হল। এভাবেই আসলে সামনের দিকে এগোতে হবে।

ক্ষমতাসীনদের স্তুতিবাক্য বা কোনো একটি বিশেষ বিষয় বা ধরন নিয়ে অনেক শিল্পীর কাজের সমালোচনা করেন তিনি। বলেন, একজন শিল্পীর চিন্তার জগত অবশ্যই বিশাল হতে হবে। কেউ যদি সারা জীবন যুদ্ধ বা শুধু প্রকৃতি নিয়ে এঁকে যান তাহলে তা সেই শিল্পীর একমুখিতা প্রকাশ পায়। শিল্পীকে প্রকৃতি, মানবতা, বিশ্ব সমাজ, জীবনাচরণ নানা বিষয় নিয়েই কাজ করতে হবে।

দ্বিবার্ষিক চারুকলা প্রদর্শনীর গতবারের আয়োজনে এক সেমিনারে তিনি আমাদের এখানে কিউরেটিংয়ে সমস্যা আছে বলে মত দেন। কিউরেটিং কিভাবে দেখেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি বিষয়টিকে অনেক বেশি এডিটিং কাজের মতো মনে করি। ৫০টি ছবি জমা পড়লে আমরা বেছে সেখান থেকে হয়তো মানের বিচার করে ২৫টি শিল্পকর্মকে বাছাই করব। আমার মনে হয়, আয়োজনে চিত্রকর্ম বা শিল্পকর্মের পরিমাণ বাড়ানোর দিকে মনোযোগ না দিয়ে বাছাইয়ের দিকে জোর দেয়া উচিত।

বাংলাদেশের চিত্রকলার সার্বিক দিক নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এখানে অনেক গুণী শিল্পী রয়েছেন। এবং নতুনদের মধ্যেও কাজের বৈচিত্র্য ভালো লাগার মতো। অনেকের কারিগরি দক্ষতা অপূর্ব। আর রেট্রোস্পেকটিভ ধরনের উদ্যোগগুলোও অসাধারণ।

প্রত্যেক শিল্পীই চান তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্থান করে নিতে। এক্ষেত্রে একজন শিল্পী কিভাবে এগিয়ে যেতে পারেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি। একটা সময় আমি ভাবিনি এতদূর আসতে পারব। কিন্তু যৌবনে আমি পৃথিবী ঘুরেছি, যেখান থেকে যা পেয়েছি জ্ঞান আহরণের চেষ্টা করেছি। আমার মনে হয়, শিল্পীকে প্রতিনিয়ত নিজের আয়নায় আবিষ্কার করতে হয়। আপনি যত বেশি দেখবেন, যত বেশি ঘুরবেন তত বিস্তৃত হবে শিল্পজগত। আমি বলব, শিল্পীর দেখার চোখ হতে হবে অবারিত।

সমসাময়িক তরুণদের শিল্পকর্ম নিয়ে তিনি বলেন, তরুণরা সবসময়ই পরীক্ষা-নিরীক্ষায় ব্যস্ত থাকে। প্রতিদিন নতুন নতুন সব শিল্পকর্ম এসে স্থান পুরনো শিল্পকর্মের স্থান দখল করে নেবে। অনেক তরুণের কাছ থেকে আমিও নতুন কিছু শিখেছি। একবার এক তরুণের চিত্রকর্ম দেখে জানতে পারলাম সে একটা উত্তাল সমুদ্রভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে ছবিটি এঁকেছে। ছবিতে সেই সমুদ্রভ্রমণ নেই কিন্তু এক উত্তাল বর্ণনা আছে। যেটা আমার কাছে নতুন মনে হয়েছে। এভাবে অনেক নতুন ভাবনা নাড়া দেয়।

মারেক বার্টিলেট এমআইটি, ইয়েল, মেরিল্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল কলেজ অব আর্টের মতো প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কুপার ইউনিয়ন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব সায়েন্সেস অ্যান্ড আর্টে নিয়মিত শিল্পকলার ইতিহাস পড়াচ্ছেন। তার লেখা ‘দ্য ইনভেন্ট এ গার্ডেন : দ্য লাইফ অ্যান্ড আর্ট অব আদজা ইউনিকার্স’, ‘দ্য স্কাল্পচার অব উরুসলোলা ভন রাইডিংসবার্ড’, ‘আর্লি পোলিশ মডার্ন আর্ট’, ‘মার্ক রথকো’ শিরোনামে শিল্প সমালোচনা পোলিশ ও ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়েছে, যেগুলো সারাবিশ্বে সমাদৃত।