ডলারের বাজার হঠাৎ অস্থির

সোমবার সর্বোচ্চ ৮৬.৪০ টাকায় বিক্রি * ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারক ও ভোক্তারা * ডলার যাচ্ছে বেশি আসছে কম, অর্থ পাচারের শঙ্কা

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হামিদ বিশ্বাস

অস্বাভাবিক আমদানিতে বাড়ছে ডলারের চাহিদা। সে সুযোগে কিছু অসাধু ব্যাংক অতিমুনাফার লোভে বাড়িয়ে দিয়েছে বৈদেশিক এই মুদ্রার দাম। সোমবারও ডলারের সর্বোচ্চ দর ছিল ৮৬ টাকা ৪০ পয়সা। এতে আমদানিকারক ও ভোক্তা উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। অন্যদিকে যে হারে আমদানি বাড়ছে সে হারে রফতানি ও রেমিটেন্স না বাড়ায় অর্থপাচারের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এদিকে বিদায়ী অর্থবছরে আমদানি ব্যয় ছিল ৫৪.৪৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে রফতানি আয় ৩৬.৬৬ বিলিয়ন ডলার এবং রেমিটেন্স ১৪.৯৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ দুটো মিলিয়েও আমদানি ব্যয় সামলানো যায়নি। ডলার যাচ্ছে বেশি আসছে কম।

জানতে চাইলে অর্থনীতির গবেষক ড. আহসান এইচ মনসুর যুগান্তরকে বলেন, আমদানিতে কঠোর নজরদারি করা উচিত। আমদানি পণ্যের বদলে ইট-বালি এখন দৃশ্যমান। এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থাও নেয়া হচ্ছে না। কেন এত আমদানি, কী আসছে, কোথা থেকে আসছে-এসব খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া রফতানির সঙ্গে মিল রেখে আমদানি করা উচিত। কারণ আয়ের থেকে ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। অর্থাৎ এত খেলে বদহজম হতে পারে। তাই খাওয়া কমাতে হবে।

বিপুল অংকের আমদানির বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম রোববার যুগান্তরকে বলেন, অর্থপাচার হচ্ছে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। বৈদেশিক বাণিজ্যের ভারসাম্যে ব্যাপক ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে রিজার্ভে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র জানায়, ক্রমাগতভাবে আমদানি বাড়ায় বাজারে ডলারের চাহিদা এবং দর বাড়তির দিকে। বিদায়ী ২০১৭-১৮ অর্থবছরের ২৩১ কোটি ১০ লাখ ডলার বিক্রি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন-এফবিসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি মীর নাসির হোসেন সোমবার যুগান্তরকে বলেন, ডলারের দাম বেড়ে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমদানিকারক। একইসঙ্গে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে মূল্যস্ফীতিতে। দ্রব্যসামগ্রীর দাম বেড়ে যাবে। সুতরাং বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও ডলার ছাড়তে হবে।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক যে দামে ডলার বিক্রি করে বা কেনে তাকে আন্তঃব্যাংক মুদ্রাবাজার বলে। ব্যাংকগুলো এর চেয়ে কিছু বেশি দামে ডলার কেনাবেচা করে। সোমবার আমদানি পর্যায়ে ৮৩ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছে ব্যাংকগুলো। খুচরা পর্যায়ে ডলারের সর্বোচ্চ দর ৮৬ টাকা ছাড়িয়েছে। অথচ কিছু দিন আগেও ডলারের দাম ছিল ৭৮ থেকে ৮০ টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, সোমবার বেসরকারি খাতের এবি ব্যাংক সর্বোচ্চ ৮৬ টাকা ৪০ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছে। এছাড়া সিটি ব্যাংক এনএ ৮৫ টাকা ৭৫ পয়সা, আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক ৮৫ টাকা ৭৫ পয়সা ও একটি ইসলামী ব্যাংক ৮৫ টাকা ৭৫ পয়সা দরে ডলার বিক্রি করেছে। এ প্রসঙ্গে চাইলে ফরেন এক্সচেঞ্জ বিশেষজ্ঞ ও কৃষি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আলী হোসেন প্রধানিয়া যুগান্তরকে বলেন, ডলারের দাম এত পার্থক্য থাকার কথা নয়। কেউ করে থাকলে ঠিক করছে না। তিনি বলেন, এটা সাময়িক হতে পারে। ঠিক হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৮৮৬ কোটি ৫৩ লাখ ডলার। সেখানে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আমদানি ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৩৪৯ কোটি ডলার। ফলে গেল অর্থবছরে আমদানি ব্যয় বেড়েছে ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের তুলনায় ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ প্রবৃদ্ধির হার ছিল মাত্র ৯ শতাংশ। আর ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ৫ দশমিক ৯৪ শতাংশ। অন্যদিকে গেল অর্থবছরের পুরো সময় রফতানি বাবদ বাংলাদেশ আয় করেছে ৩ হাজার ৬৬৬ কোটি ৮১ লাখ ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। সে হিসাবে গেল অর্থবছরে রফতানি আয় বেড়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৮১ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে এলসি খোলা হয়েছে ৬ হাজার ৯৪২ কোটি ২১ লাখ ডলার; যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ হাজার ৮১২ কোটি ৫৯ লাখ ডলার। ফলে এলসি খোলায় প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে এ সময়ে বিভিন্ন পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র নিষ্পত্তি হয়েছে ৫ হাজার ১৫৩ কোটি ডলার; যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ হাজার ৪২৭ কোটি ২৭ লাখ ডলার। ফলে এলসি খোলায় নিষ্পত্তি বেড়েছে ১৬ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ সময়ে খাদ্যপণ্যের মধ্যে চাল ও গমের আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে ৩৬০ কোটি ৯১ লাখ ডলারের; যা আগের অর্থবছরে ছিল মাত্র ১৪৭ কোটি ৮৫ লাখ ডলার। সে হিসাবে খাদ্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র খোলার হার বেড়েছে ১৪৪ দশমিক ১০ শতাংশ। এ সময়ে খাদ্যপণ্য আমদানিতে ঋণপত্র নিষ্পত্তি বেড়েছে ১৬১ দশমিক ৭৪ শতাংশ। অর্থাৎ এ পণ্যগুলোর এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ৩০০ কোটি ৪০ লাখ ডলারের, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে ছিল মাত্র ১১৪ কোটি ৭৭ লাখ ডলার।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গেল অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র খোলা হয় ৬৪৭ কোটি ৩৪ লাখ ডলার; যা আগের অর্থবছরে ছিল ৫৩০ কোটি ৮১ লাখ ডলার। সে হিসাবে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ঋণপত্র খোলার হার বেড়েছে ২১ দশমিক ৯৫ শতাংশ। এ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছে ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে এ পণ্যটির এলসি নিষ্পত্তি বেড়েছিল প্রায় ৩৮ শতাংশ।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, এ সময়ে পেট্রোলিয়াম তথা জ্বালানি তেল আমদানির ঋণপত্র খোলার হার ৫২ দশমিক ৮৯ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩৯৩ কোটি ৩৮ লাখ ডলার; যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৫৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার। এ সময়ে পণ্যটির এলসি নিষ্পত্তি ৩২ দশমিক ৭০ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ৩৩৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ২৫২ কোটি ২২ লাখ ডলার।

প্রতিবেদনে আরও দেখা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শিল্পের কাঁচামালের আমদানি ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি বেড়েছে যথাক্রমে ১১ দশমিক ৮৪ শতাংশ এবং ১২ দশমিক ৩৬ শতাংশ। এ সময়ে শিল্পের কাঁচামাল আমদানি ঋণপত্র খোলা হয়েছে ১ হাজার ৯৮২ কোটি ৪৭ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৭৭২ কোটি ৫৮ লাখ ডলার। আর এ সময়ে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে ১ হাজার ৮২২ কোটি ৪০ লাখ ডলার; যা ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ছিল ১ হাজার ৬২২ কোটি ডলার। এছাড়া এ সময়ে অন্যান্য পণ্য আমদানির এলসি খোলা ও নিষ্পত্তি বেড়েছে যথাক্রমে ৬৯ দশমিক ১০ শতাংশ ও ১১ দশমিক ৬২ শতাংশ।

এদিকে আমদানি লাগামহীনভাবে বাড়তে থাকায় চাপের মুখে দেশের বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ। বাজার স্বাভাবিক রাখতে ডলার বিক্রি করেই চলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) বিল গত মার্চ-এপ্রিল মেয়াদে ১৪০ কোটি ডলারে উঠেছে, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। অতীতের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গত জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মেয়াদে আকুর বিল ১৫৬ কোটি ৩০ লাখ ডলারে উঠেছিল।