আলাপচারিতায় চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী

দেশভাগের প্রভাব এখনও সর্বক্ষেত্রে

প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  হক ফারুক আহমেদ

ভারতের বিখ্যাত চিত্রশিল্পী যোগেন চৌধুরী। তার চিত্রকর্মের একটি বিশেষ দিক, প্রচুর কালো রঙের ব্যবহার। শিল্পী এর কারণ হিসেবে বললেন, যখন তিনি আর্ট কলেজে পড়তেন তখন পরিবারের আর্থিক সংকটের কারণে হ্যারিকেনের আলোয় স্কেচ করতেন।

দ্বিতীয় কারণ হিসেবে বললেন ডিপ্রেশনের কথা, যা অজান্তেই চলে আসে। যুগান্তরের সঙ্গে মুখোমুখি আলাপচারিতায় শিল্পী যোগেন চৌধুরী বললেন, এই সবকিছুর পেছনে আসলে ১৯৪৭-এর দেশভাগ। একটা সংগঠিত সমাজ যেখানে সব ছিল, তা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পশ্চিমবঙ্গে আসতে হয়েছে। নতুনভাবে সাজাতে হয়েছে সব। তাই ডিপ্রেশন ছিল, আছে। সেটাই আমার ক্যানভাসে বারবার আসে।

দেশভাগের যে অভিঘাত তা কিন্তু আজও প্রকট। সেই সময় বাংলাদেশ ছেড়ে যারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বা অন্যান্য জায়গায় দেশান্তরিত হয়েছেন তাদের অনেক পরিবার কিন্তু আজও থিতু হতে পারেনি। লাখ লাখ মানুষ এখনও বেকার। একইভাবে যারা পশ্চিমবঙ্গ বা ভারতের অন্যান্য প্রদেশ থেকে বাংলাদেশে এসেছেন তাদেরও নিশ্চয়ই মনে একটা অজানা বেদনা আছে।

রোববার সন্ধ্যায় শিল্পকলা একাডেমিতে চলমান অষ্টাদশ দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনীতে অতিথি হিসেবে একটি সেমিনারে অংশ নেন ভারতের অন্যতম সেরা চিত্রকর যোগেন চৌধুরী। সেমিনার শেষে তিনি যুগান্তরের সঙ্গে আলাপচারিতায় তার শিল্পীজীবন, ভাবনা, বাংলাদেশের চিত্রকলাসহ নানা বিষয়ে কথা বলেন।

দেশভাগের প্রসঙ্গের পর পরই মিয়ানমার থেকে নির্যাতিত হয়ে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার কথা বলতেই শিল্পী যোগেন চৌধুরী বলেন, নিজের দেশ ছেড়ে কেউ আসতে চায় না। কিন্তু যখন আসতে বাধ্য হয় বা বাধ্য করা হয় তখন সে মানুষগুলোর জীবনে ভয়ংকর একটা ঝড় বয়ে যায়। একই পরিস্থিতিতে না পড়লে এটা কারও পক্ষে অনুভব করা অসম্ভব। এই রোহিঙ্গাদের মধ্য থেকে কোনো চিত্রশিল্পী, লেখক বা গায়কের জন্ম হলে এই দেশত্যাগ তার কাজে সবসময় প্রভাব ফেলবে।

যোগেন চৌধুরী ১৯৩৯ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত বাংলার ফরিদপুরের কোটালীপাড়ার ডহরপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ফরিদপুরে আড়াই হাজার বিঘা জমির জমিদার ছিলেন তার বাবা প্রমথনাথ চৌধুরী। যোগেন চৌধুরী তার ছেলেবেলা কাটিয়েছেন বাংলাদেশেই। দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে এবং পরে প্যারিসে গিয়ে তিনি চিত্রকলার ওপর পড়াশোনা করেন। চিত্রশিল্পীর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভার একজন সদস্য তিনি।

রাজনীতির প্রভাব সংস্কৃতির ওপর কতটা, জানতে চাইলে শিল্পী বললেন, রাজনীতি চায় সরকার হতে। কীভাবে সেটা হওয়া যায় রাজনীতি যারা করেন তারা ভালো জানেন। সরকার সংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষক। যার ফলে পরোক্ষভাবে রাজনীতি শিল্প-সাহিত্যকে প্রভাবিত করে। কিন্তু ব্যক্তি শিল্পসত্তাকে বাঁধা সম্ভব নয়। শিল্পী মনের আনন্দে সেই কাজটিই করবেন, যেটি তার মন চাচ্ছে। তবে শিল্পীদেরকে আর্থিকভাবে রাজনীতি প্রভাবিত করতে পারে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, বৃত্তি প্রদান করে।

দুই বাংলার চিত্রকলার তুলনা করতে গিয়ে যোগেন চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ একটি রাষ্ট্র। আর পশ্চিমবঙ্গ ভারতের অঙ্গরাজ্য। দুটোর মধ্যে তুলনা করাটা সঠিক হবে না। বাঙালিদের রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রাধান্য পায়, যেটা পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিরা হয়তো পায় না। শিল্পকলার ক্ষেত্রেও সেই প্রাধান্যটা বজায় রয়েছে।

একজন সার্থক চিত্রকরের কাজে সমাজ কীভাবে প্রতিফলিত হয় জানতে চাইলে যোগেন চৌধুরী বলেন, একজন শিল্পী তখনই সার্থক যখন তার কাজে সমাজ ও জীবনের গল্পগুলো উঠে আসে। মানুষের সঙ্গে, সমাজের সঙ্গে যুক্ত না থাকতে পারলে একজন শিল্পী কখনও গড়ে উঠতে পারেন না। যাপিত জীবনকে নানাভাবে ফুটিয়ে তোলাই শিল্পীর কাজ।

এবারের দ্বিবার্ষিক এশীয় চারুকলা প্রদর্শনী সম্পর্কে যোগেন চৌধুরী বললেন, প্রদর্শনীর অংশবিশেষ ঘুরলেও, মন্তব্য করার মতো সময় এখনও আসেনি। তবে গতবারের ১৭তম আয়োজনের তুলনায় এবারের আয়োজন অনেক বেশি জমজমাট ও আকর্ষণীয় মনে হচ্ছে। গত ৩৭ বছর ধরে এটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে, এর একটি ভূমিকা অবশ্যই সমাজে পড়েছে।

একটি শহরকে শিল্পের ভ্রমণের মতো করে গড়ে তুলতে হবে মন্তব্য করে যোগেন চৌধুরী বলেন, শিল্প অনেক দেশে শহর আর গ্রামের পার্থক্য কমিয়ে দিয়েছে। অনেক দেশে অনেক শহরে দালানকোঠা, আসবাবপত্র থেকে সবকিছুতেই শিল্পের ছোঁয়া। নকশা, ভাস্কর্যকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তুলতে হবে। গ্রিকরা প্রাচীন যুগে, ইতালীয়রা রেনেসাঁর সময় কিন্তু এভাবেই নিজেদের শহরগুলোকে গড়ে তুলেছিল।

শিল্পী যোগেন চৌধুরী ১৯৭২ সালে দিল্লিতে রাষ্ট্রপতি ভবনে কিউরেটর হিসেবে কাজ শুরু করেন। ১৯৮৭ সাল থেকে বিশ্বভারতী শান্তিনিকেতন কলাভবনের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। বর্তমানে তিনি সেখানকার ইমেরিটাস অধ্যাপক।