মন্ত্রীর কণ্ঠে অসহায়ত্বের সুর

সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা

  যুগান্তর রিপোর্ট ০৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

সমন্বিত উদ্যোগের অভাবে পরিবহন খাতে বিশৃঙ্খলা
ফাইল ফটো

সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত ও পরিকল্পিত উদ্যোগ না থাকায় পরিবহন খাতের বিশৃঙ্খলা দূর করা যাচ্ছে না। পরিবহন মালিক ও চালকরা আইন মানছেন না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রশ্রয়ে মহাসড়কে চলাচল করছে আনফিট গাড়ি।

চলছে নছিমন, করিমনসহ ছোট ছোট গাড়িও। এসব কারণে সড়কে দুর্ঘটনাও কমছে না, বরং বাড়ছে। সড়ক পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার সচিবালয় বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবী ও পরিবহন মালিকদের নিয়ে আয়োজিত বৈঠকে এসব তথ্য উঠে আসে। বৈঠকে কেউ কেউ প্রস্তাবিত সড়ক আইনে সাজা বাড়ানো ও রোড ফ্র্যাঞ্চাইজিং করার তাগিদ দেন। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সম্মেলন কক্ষে বৈঠকের আয়োজন করা হয়।

বৈঠকের সভাপতি সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের কণ্ঠে ভেসে আসে অসহায়ত্বের সুর। তিনি বলেন, ‘গত সাত বছর দিনরাত রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করছি। তবুও মাঝেমধ্যে অসহায়বোধ করি। অনেক উদ্যোগ নিয়েছি; কিন্তু ইমপ্লিমেনটেশন স্লো। সমন্বয়ের অভাবও আছে। এলজিআরডির সড়ক খারাপ অথচ দোষারোপ করা হয় আমাকে। সবই দুর্ভাগ্য। সড়কের সুফল জনগণ না পেলে ২৪ ঘণ্টার এসব কষ্টের কোনো মূল্য নেই। আমি সফল হয়েছি, এমন কথাও বলব না।’

স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ‘গণপরিবহনে শৃঙ্খলা ফেরাতে একক কোনো উদ্যোগ কাজে আসবে না। দরকার সমন্বিত পদক্ষেপ। ট্রাফিক আইন মানার নিয়ম হচ্ছে সিগন্যাল বাতি দেখে। সেখানে লাল আর সবুজ বাতির বিষয়টি অস্পষ্ট চালকের কাছে। লাল বাতি জ্বললে গাড়ি চালাতে দিচ্ছে পুলিশ আর সবুজ বাতি জ্বললে থামানো হচ্ছে যানবাহন। এটি হতে পারে না। তার মানে, সিটি কর্পোরেশনের বাতি এবং লাইটিং সিস্টেমে জটিলতা আছে।’

তিনি বলেন, ‘ফুটওভারব্রিজ ও জেব্রাক্রসিং একই স্থানে দেখা গেছে। একসঙ্গে এ দুটি পৃথিবীর কোথাও নেই। ফুটওভারব্রিজ এখন উন্নত বিশ্বে নেই। কারণ মানুষ ওপরে উঠতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে না। দরকার আন্ডারপাস। সেদিকে নজর কম। সমন্বয়হীনতার কারণে কোনো পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হচ্ছে না। হঠাৎ করে ফ্লাইওভার বানানো শুরু হল। অথচ ফুটপাত ও রাস্তার খবর নেই। এতে সড়কে শৃঙ্খলা আসবে না।

গণপরিবহনে বাস রুট ফ্র্যাঞ্চাইজির কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু এর বাস্তবায়ন নেই। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের প্রস্তাবনা ছিল এটি। আমরাও তা চাইছি। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, কেবল ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার বাস আমদানির প্রস্তাব আসছে বিভিন্ন তরফ থেকে।

কিন্তু এসব বাস চালুর আগে কোন রুটে চলবে, কে চালাবে, তার সিদ্ধান্ত হয়নি। চালকদের প্রশিক্ষণের খবর নেই। বর্তমান গাড়িগুলোর কী হবে, তার ব্যাপারেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই। সুতরাং হঠাৎ করে শুধু বাস নামালেই পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরবে না। দরকার সমন্বিত উদ্যোগ।’ তিনি বলেন, ‘সড়ক নির্মাণে ত্র“টি রয়েছে। প্রথমে সার্ভিস লেন, তারপর একটু উঁচু করে হাইওয়ে নির্মাণ করতে হবে।’

বুয়েটের এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (এআরআই) পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘ঢাকার ভেতর ও মহাসড়কে দুর্ঘটনার কারণ ভিন্ন। দুই জায়গায় দুর্ঘটনা কমাতে ভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নিতে হবে।’

রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনার কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘মহানগরীতে গাড়ির গতিবেগের কারণে দুর্ঘটনা হয় না, এখানে ৭-৮ কিলোমিটার বেগে গাড়ি চলতে পারে। দুর্ঘটনা ঘটে চালকের প্রতিযোগিতা ও বেপরোয়া মনোভাবের কারণে। এর নেপথ্যে থাকেন মালিকরা।

চালককে চুক্তিতে গাড়ি দেয়ায় তারা বাড়তি আয়ের আশায় বেপরোয়া প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। ঢাকায় যে ঘটনায় দু’জন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছিলেন, ওই দুর্ঘটনার জন্য চালকের বেপরোয়া মনোভাবই দায়ী ছিল।’

মহাসড়কে দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মহাসড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ অতিগতি। এছাড়া একই সড়কে কম গতি ও বেশি গতির গাড়ি চলাচলের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটে। মহাসড়কে লো স্ট্যান্ডার্ড ও আনফিট গাড়ি চলাচল করে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে।’

সড়কের অন্যান্য কারণ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘বিআরটিসির গাড়ি লিজ দেয়া হয়, যা দুঃখজনক। বড় বড় সেতুতে ম্যানুয়েল পদ্ধতিতে টোল আদায়ের কারণে দীর্ঘ যানজট হয়। ওই সেতু পার হলেও পরের রাস্তা খালি থাকায় চালকরা দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হন। প্রতিবছর ৪০ শতাংশ হারে মোটরসাইকেল রাস্তায় নামছে, যা অ্যালার্মিং।’

সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনতে ঢাকায় রোড ফ্র্যাঞ্চাইজিং করার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ‘ভারতের মুম্বাই ও ঢাকা শহরের জনসংখ্যার ঘনত্ব প্রায় একই। মুম্বাই একটি গাড়িতে দৈনিক ১ হাজার ৩৩০ জন যাত্রী পরিবহন করা হয়। অথচ ঢাকায় বহন করা হয় ৫০০ যাত্রী। রোড ফ্র্যাঞ্চাইজিং করা হলে ঢাকায় প্রতিটি গাড়িতে ১২০০ যাত্রী বহন করা যাবে।’

বিশিষ্ট কলামিস্ট সৈয়দ আবুল মকসুদ বলেন, ‘সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে বারবার আলোচনা হয়। কিন্তু সমস্যা কী, তা সবাই কমবেশি জানে।’ সড়ক আইন পাসের আগে তা আরও পর্যালোচনার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘আইনে দুর্ঘটনার সংজ্ঞা উল্লেখ নেই। এছাড়া অনেক ফাঁকফোকর রয়েছে। আইনে সাজা বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘সড়কে কে কত মানুষ হত্যা করতে পারে, সে প্রতিযোগিতা চলছে। দুর্ঘটনা বন্ধে প্রধানমন্ত্রী এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী গত দুই বছর যেসব নির্দেশনা দিয়েছেন, তা কেন মানা হচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।’

নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, ‘দুর্ঘটনায় কেবল চালককে দায়ী করা হয়। চালকের কাছে বাসটি ছেড়ে দিচ্ছেন যেই মালিক, তারও দায় আছে। গাড়ির ফিটনেস ত্র“টির কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। এগুলোর সমাধান দরকার। সড়ক পরিবহন আইনটি সংসদে পাঠানোর কথা শুনছি। কিন্তু আইনটির ব্যাপারে অনেক জায়গায় আমাদের দ্বিমত আছে। প্রথমত সড়ক পরিবহন আইনের সঙ্গে নিরাপত্তা শব্দটি থাকা দরকার। আর চালককে কেবল শিক্ষিত হলে চলবে না, তাদের আচরণগত প্রশিক্ষণ দরকার। আইনের শাস্তি নিয়েও আপত্তি আছে। বর্তমানে সর্বোচ্চ ৫ বছর করা হয়েছে। বাক্যটি হতে হবে সর্বনিু ১০ বছর। হাইকোর্টের রায়েই ৭ বছর করার কথা ছিল। তাছাড়া এ আইনটি আগেই ১০ বছরের ছিল। পরিবহন নেতাদের চাপে পড়ে তা একপর্যায়ে ৩ বছর করা হয়। তাই ‘নিরাপদ সড়ক চাই’র পক্ষ থেকে আমরা চাই, শাস্তি ১০ বছর করা হোক। বলা হচ্ছে- হত্যার উদ্দেশ্যে দুর্ঘটনা ঘটালে। এ কথাটিতে আমার আপত্তি আছে। কারও বেপরোয়া চালনা কিংবা অন্য কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হলে কি পার পেয়ে যাবে। কোন চালক, ক’জন চালক সরাসরি হত্যার উদ্দেশ্যে গাড়ি চালান। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, শাস্তির আওতায় দায়ী ব্যক্তি এবং সংগঠনগুলোকে আনতে হবে। আইনে কিছু শাস্তির ব্যাপারে দ্বিমত আছে। লাইসেন্সবিহীন চালক আর ভুয়া লাইসেন্সধারীর দুই রকম শাস্তির কথা আছে। এটি পাল্টাতে হবে। শিক্ষাগত যোগ্যতা হেলপারের জন্য ৫ম শ্রেণী এবং চালকের জন্য ৮ম শ্রেণী বলা হয়েছে। এটি ঠিক নয়। তাহলে হেলপার কি কখনও চালক হতে পারবে না? আর ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যাপারে সামাজিক অবস্থান এবং বয়স অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।’

পরিবহন মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ বাস-ট্রাক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ফারুক তালুকদার সোহেল বলেন, ‘দুর্ঘটনা কমাতে সড়কে ফ্র্যাঞ্চাইজিং করতে হবে। গাড়ির পার্কিং এরিয়া নির্দিষ্ট করে দিতে হবে। গাড়ির দরজা খোলা রেখে সারা পথে যাত্রী ওঠানামা বন্ধ করতে দরজা বন্ধের যন্ত্র লাগাতে হবে। মোটরসাইকেলের মতো রিকশায় লুকিং গ্লাস লাগাতে হবে। মহাসড়কের সঙ্গে এলজিআরডি রাস্তার সারাসরি মিলিয়ে দেয়ায় নছিমন, করিমন, ভটভটির মতো ছোট ছোট গাড়ি হঠাৎ মহাসড়কে উঠে যাচ্ছে। এতে দ্রুতগামী গাড়ির সঙ্গে দুর্ঘটনা ঘটছে।’

সবার বক্তব্যের পর ওবায়দুল কাদের তার আমলে নেয়া বিভিন্ন প্রকল্প তুলে ধরে বলেন, ‘আমার বড় ও প্রধান কাজ সড়কে ও পরিবহন খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু অনেকেই আইন মানেন না। মা-বাবার দোয়া, আল্লাহর নামে চলিলাম লিখে রাস্তায় যেনতেন গাড়ি নামিয়ে দেয়। অনেক সময় জনপ্রতিনিধিরাও এসব গাড়ি নামাতে সুযোগ সৃষ্টি করে দেন, উৎসাহ দেন। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৩৬টি ফুটওভার ব্রিজ থাকলেও ৪টিতেও মানুষ উঠে না। পথচারীরা কোনো নিয়ম মানেন না, রাস্তায় নেমে আসেন। সড়কে ছোট যান, ইজিবাইক, ব্যাটারিচালিত রিকশা উপদ্রব হয়ে দেখা দিয়েছে। পুলিশের হাইওয়েতে জনবলের অভাব আছে। ইজিবাইক কারখানার উৎসমুখ বন্ধে চিঠি ও মিটিং করেও পারিনি। মাঝেমধ্যে অসহায় বোধ করি।’

জাতীয় সংসদের আগামী অধিবেশনই বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের শেষ অধিবেশন জানিয়ে ওবায়দুল কাদের বলেন, ‘ওই অধিবেশনেই প্রস্তাবিত সড়ক পরিবহন আইন পাস হবে। এরপর আর অধিবেশন বসবে না। তবে সংসদ ভাঙবে না, এমপিদের যে পাওয়ার (ক্ষমতা) তা থাকবে না।’

সড়ক আইন সংশোধনের সুযোগ এখনও আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সড়ক আইনটি পার্লামেন্টে উত্থাপনের পরপরই সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে যাবে। সেখানে আপনাদের কয়েকজনকে ডাকা হতে পারে। সংশোধন করার জায়গা এখনও আছে। আমার মনে হয়, এ নিয়ে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।’ উল্লেখ্য, ৯ সেপ্টম্বর জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

বৈঠকে আরও বক্তব্য দেন হাইওয়ে পুলিশের ডিআইজি আতিকুল ইসলাম, ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার মীর রেজাউল আলম, পরিবহন মালিক নেতা রুস্তুম আলী প্রমুখ।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
.