ডলারের মূল্য বৃদ্ধি ও অধিক সঞ্চয়পত্র বিক্রি

সুদ পরিশোধে ব্যয় বৃদ্ধি চাপে সরকার

প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মিজান চৌধুরী

ডলারের মূল্য বৃদ্ধি ও অধিক সঞ্চয়পত্র বিক্রি ঋণের সুদ পরিশোধ ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। গত ১০ মাসে সরকারের নেয়া ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধ করতে হয়েছে ৩০ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা। এ ব্যয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ বেশি।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ‘নগদ এবং ঋণ’ ব্যবস্থাপনা কমিটির বৈঠকে সুদ খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণ দুটি শনাক্ত করা হয়। আর এ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এক ধরনের আর্থিক চাপের মুখে পড়েছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ এম কে মুজেরি যুগান্তরকে বলেন, বিদেশি ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হয় ডলারে। এ ক্ষেত্রে বিনিময় হার অনেক গুরুত্বপূর্ণ। টাকার অবমূল্যায়ন হলে সুদ পরিশোধ ব্যয় বাড়বে।

তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে নন-ব্যাংক সোর্স সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ গ্রহণ করে সরকার। এ ঋণের সুদহার ব্যাংকের তুলনায় বেশি হয়। এর প্রভাব পড়ে সুদ ব্যয়ের ওপর। তবে ভবিষ্যতে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনা ঠিকমতো চালাতে হবে। না হলে দায় বেড়ে যেতে পারে।

এটা হলে আর্থিক খাতে চাপ সৃষ্টি হবে। তিনি বলেন, ‘সরকারি ঋণ উৎপাদনশীল খাতের জন্য গ্রহণ এবং বিনিয়োগে ব্যয় করার চেষ্টা করতে হবে। এতে বিনিময়ে রিটার্ন পাওয়া যাবে।’

বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার দু’ভাবে ঋণ গ্রহণ করে। একটি হচ্ছে বৈদেশিক ঋণ, অপরটি অভ্যন্তরীণ ঋণ। অভ্যন্তরীণ ঋণ দুটি উৎস থেকে নেয়া হয়। এক ব্যাংকিং খাত থেকে। আরেকটি সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে।

সূত্র জানায়, সরকার ব্যাংকিং খাত থেকে যে ঋণ নিয়েছে তার বিপরীতে গত জুলাই থেকে এপ্রিল- এই দশ মাসে ১২ হাজার ৫১ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করা হয়েছে। একই সময়ে জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে নেয়া ঋণের সুদ পরিশোধ করা হয় ১৬ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা।

কিন্তু দেখা গেছে এর আগের ১০ মাসে সঞ্চয়পত্রের ঋণের সুদ বাবদ ১২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়। এ খাতে সুদ পরিশোধ ব্যয় বেড়েছে ২৭ শতাংশ। এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণের সুদ ২ হাজার ২৬ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়।

এ ব্যয় বিগত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।

বিগত সময়ের তুলনায় সুদ পরিশোধ ব্যয় বৃদ্ধির নেপথ্যে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ট্রেজারি ও ঋণ ব্যবস্থাপনা অনুবিভাগ। পর্যবেক্ষণে বলা হয়, বৈদেশিক উৎস থেকে নেয়া ঋণের সুদ ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার কমে যাওয়া।

২০১৬ সালে ৭৮ টাকার বিপরীতে পাওয়া যেত এক মার্কিন ডলার। বর্তমান এক ডলারের মূল্য দাঁড়িয়েছে ৮৪-৮৫ টাকা। দু’বছরের ব্যবধানে ডলারের মূল্য বেড়ে টাকার অবমূল্যায়ন হয়েছে ৭ টাকা। ওই পর্যবেক্ষণে বিদেশি ঋণের স্থিতি বৃদ্ধির কারণে সুদ ব্যয় বাড়ছে বলে উল্লেখ করা হয়।

জানা গেছে, বাজেট ঘাটতি মেটাতে গত জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত বিদেশ থেকে সরকার ৩৩ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। এর আগের বছরের একই সময়ে নিট বিদেশি ঋণ নেয়া হয় ৫ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বিদেশি ঋণ নেয়ার পরিমাণ বেড়েছে পাঁচ গুণ। পাশাপাশি একই সময়ে বিদেশি অনুদান পাওয়া গেছে ২ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা। যা আগের বছরের চেয়ে ১৯ শতাংশ কম।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা যায়, বিদেশি ঋণের বিপরীতে প্রতিবছর গড়ে সুদ-আসলে দেড়শ’ কোটি ডলার পরিশোধ করা হয়। গত দু’বছরের ব্যবধানে প্রতি ডলারের মূল্য বেড়েছে ৭ টাকা। ওই হিসাবে অতিরিক্ত সুদ খাতে ব্যয় বেড়েছে প্রায় এক হাজার পঞ্চাশ কোটি টাকা।

অর্থাৎ ২০১৬ সালে ঋণের বিপরীতে যে অর্থ সুদ বাবদ ব্যয় হয়েছে, বর্তমানে আরও এক হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় হচ্ছে। তবে বিদেশি ঋণ তুলনামূলক সস্তা। বেশিরভাগ নেয়া ঋণের সুদহার ১ শতাংশের নিচে এবং পরিশোধের সময় দীর্ঘ। অভ্যন্তরীণ সুদ ব্যয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে পর্যবেক্ষণে বলা হয়, ব্যাংকবহির্ভূত খাতের (সঞ্চয়পত্র) ঋণের সুদ ব্যয় বেড়েছে মূলত সঞ্চয়পত্র স্কিমের অস্বাভাবিক বিক্রি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকার কারণে।

গত জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে ৪০ হাজার ৬৩ কোটি টাকা। এটি বাজেটের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৯১ শতাংশের সমান। পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, সামগ্রিকভাবে চলতি অর্থবছরে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা বিবেচনায় সুদ বাবদ সরকারের বৃদ্ধির হার আগের অর্থবছরের তুলনায় কিছুটা বেড়েছে।