উচ্চ মূল্যের এলএনজি আমদানি

চট্টগ্রামে কাটতে শুরু করেছে গ্যাস সংকট

শিল্প খাতের ৬৭৬ আবেদন অনুমোদন * ২০ হাজার আবাসিক গ্রাহকের বিষয়ে সিদ্ধান্তের অপেক্ষা * সংযোগ অনুমোদন জটিলতায় সুফল পেতে ভোগান্তি

  শহীদুল্লাহ শাহরিয়ার, চট্টগ্রাম ব্যুরো ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

গ্যাস
ফাইল ছবি

সরকার উচ্চ মূল্যের এলএনজি (লিক্যুইড ন্যাচারাল গ্যাস) আমদানির পর চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট কাটতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে মহেশখালীর মাতারবাড়িতে তিন হাজার মিলিয়ন ঘটনফুট গ্যাস নিয়ে একটি জাহাজ ভিড়েছে।

আজ এলএনজি নিয়ে আরও একটি জাহাজ আসার কথা রয়েছে। তবে গ্যাস সংকট কাটলেও অনুমোদন ও সংযোগ জটিলতার কারণে চট্টগ্রামের গ্রাহকরা এর সুফল পেতে বেগ পাচ্ছেন। অনুমোদন পাওয়া অনেক শিল্প কারখানায় সঞ্চালন ও বেইস লাইন না থাকায় সেসব কারখানায় এখনও সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না।

যে কোনো শিল্প ও ক্যাপটিভ খাত এমনকি আবাসিক খাতের একটি গ্যাসের চুলার বার্নার বাড়ানোর অনুমোদনও ঢাকায় সুনির্দিষ্ট কমিটি ও বোর্ডের ওপর ন্যস্ত। এ কারণে যে কোনো ধরনের গ্যাস সংযোগের ফাইল অনুমোদনের জন্য ঢাকায় পাঠাতে হচ্ছে।

অথচ আগে দেশের প্রত্যেকটি গ্যাস কোম্পানির হাতেই যে কোনো ধরনের গ্যাস সংযোগ অনুমোদনের ক্ষমতা ছিল। মাঝখানে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে অনুমোদনের ক্ষমতা ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। বর্তমানে সংকট কাটতে শুরু করেছে। কিন্তু সংযোগ প্রদানের ক্ষমতা কোম্পানির হাতে ফিরে না আসায় সংশ্লিষ্টদের মধ্যে হতাশা রয়েছে।

এদিকে শিল্প খাতের ৬৭৯টি আবেদনের মধ্যে এলএনজি সরবরাহ শুরুর পর ৬৭৬টি আবেদন গ্রহণ করে সংযোগ প্রদানের অনুমতি প্রদান করেছে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (কেজিডিসিএল)। এর মধ্যে ২৭৫ জন গ্রাহকের বিপরীতে ইস্যু করা হয়েছে ডিমান্ড নোট।

এসব গ্রাহক ১৮০ কোটি টাকা জামানত প্রদান করেছে। এসব শিল্প-কারখানায় এরই মধ্যে সংযোগ প্রদানের কাজ শুরু হয়েছে। বাকি শিল্প-কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের বিপরীতেও পর্যায়ক্রমে ডিমান্ড নোট ইস্যু করে সংযোগ প্রদানের ব্যবস্থা করা হবে। তবে আবাসিক খাতের ২০ হাজার পেন্ডিং আবেদনের কী হবে সে বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে জানিয়েছে কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ।

কেজিডিসিএল সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা রায়েছে প্রায় সাড়ে ৪০০ মিলিয়ন ঘনফুট। কিন্তু এতদিন গ্যাস পাওয়া যেত ২০০ থেকে আড়াইশ মিলিয়ন ঘনফুট। জাতীয় গ্রিড থেকেই এই গ্যাসের জোগান দেয়া হতো। চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী নেতারা পেট্রোবাংলা, জ্বালানি মন্ত্রণালয় থেকে শুরু করে প্রধানমন্ত্রীর দফতর পর্যন্ত চট্টগ্রামের গ্যাস সংকট নিরসনের দাবি জানিয়ে বিভিন্ন সময় চিঠি চালাচালি করে আসছিলেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন চেম্বারও ছিল এই দাবিতে সোচ্চার। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করলেও শিল্প কারখানা- উৎপাদনে যেতে না পারায় বিনিয়োগকারীরা ছিলেন বেকায়দায়। ব্যাংকের দায়দেনা নিয়ে অনেকে পর্যুদস্ত হয়ে পড়েন।

মূলত প্রয়োজন বুঝতে পেরেই সরকার এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নেয় এবং আমদানি করা এলএনজি দিয়ে আগে চট্টগ্রামের চাহিদা মেটানোরও সিদ্ধান্ত হয়। এ জন্য মহেশখালীর মাতারবাড়িতে নির্মাণ করা হয়েছে এলএনজি টার্মিনাল।

সূত্র জানায়, মহেশখালীর মাতারবাড়িতে তিন হাজার মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নিয়ে ভেড়ে একটি জাহাজ। ১৪ আগস্ট ওই জাহাজ থেকে চট্টগ্রামে গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়েছে। পাইপে লিকেজসহ প্রক্রিয়াগত জটিলতার কারণে কয়েক দফা তারিখ পিছিয়ে চট্টগ্রামে এলএনজি সরবরাহ শুরু হয়। বর্তমানে প্রতিদিন ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়া হচ্ছে।

এই প্ল্যান্ট থেকে প্রতিদিন ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস রিংলাইনের মাধ্যমে সরবরাহ করার কথা রয়েছে। বাকি দেড়শ মিলিয়ন ঘনফুট জাতীয় গ্রিড থেকে যুক্ত করা হবে। আজ এলএনজি নিয়ে আরও একটি জাহাজ ভেড়ার কথা রয়েছে।

এই জাহাজ ভেড়ার পর দৈনিক ৩০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস চট্টগ্রামে সরবরাহ শুরু হবে বলে কেজিডিসিএল কর্তৃপক্ষ আশা করছে। তারা বলছে, পুরোদমে গ্যাস সরবরাহ শুরু হলে চট্টগ্রামে গ্যাস সংকট একেবারেই কেটে যাবে। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, অক্টোবর থেকে পুরোদমে এলএনজি সরবরাহ শুরু হলে জাতীয় গ্রিড থেকে আর চট্টগ্রামে গ্যাসের জোগান প্রয়োজন হবে না।

সূত্র জানায়, চট্টগ্রামে আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহকের সংখ্যা প্রায় ৬ লাখ। এর মধ্যে কেবল আবাসিক গ্রাহকের সংখ্যা পাঁচ লাখ ৯৭ হাজার। বাকি তিন হাজার হচ্ছে বাণিজ্যিক ও শিল্প গ্রাহক।

২০১০ সালের ১ জুলাই বাখরাবাদ গ্যাস কোম্পানি থেকে পৃথক হয়ে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) গঠিত হয়। ওই বছরের ১০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেজিডিসিএলের উদ্বোধন করেন। অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্নকরণ, বকেয়া আদায়সহ সাঁড়াশি অভিযানের মাধ্যমে একটি শক্ত ভিত্তির ওপর এই কোম্পানিকে দাঁড় করান প্রতিষ্ঠাতা এমডি প্রকৌশলী সানোয়ার হোসেন চৌধুরী।

কিন্তু বড় বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের গ্যাস চুরি রোধ, বকেয়া আদায় ও সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কেজিডিএল ছাড়তে হয় তাকে। পরবর্তীতে একাধিক এমডি এলে-গেলেও গ্যাস সংযোগ বাণিজ্য যেমন হয়েছে তেমনি শিল্পকারখানায় চুরির মহোৎসব চলে।

নিয়োগ-বাণিজ্য, অভ্যন্তরীণ বদলি বাণিজ্য, রাইজার উত্তোলন বাণিজ্যসহ নানা কারণে কোম্পানির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও গ্রাহকরা একপ্রকার জিম্মি হয়ে পড়ে। মূলত সংকটকে পুঁজি করেই কেজিডিসিএলের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে গঠিত সিন্ডিকেট নবগঠিত এ কোম্পানির সুনাম নষ্ট করে।

সূত্র জানায়, সংকটের কারণে ২০১৩ সালে আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগ বন্ধে সার্কুলার জারি করে সরকার। কেজিডিসিএলও এই সার্কুলার অনুযায়ী আবাসিক খাতে গ্যাস সংযোগ দেয়া বন্ধ করে দেয়। যার প্রভাব পড়ে শত শত কোটি টাকা বিনিয়োগে নির্মিত ফ্ল্যাট বাড়িতে। গ্যাস সংযোগ না থাকায় ফ্ল্যাটও বিক্রি হয়নি।

কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী অনুপম দত্ত যুগান্তরকে বলেন, এলএনজি আসার পর চট্টগ্রামের গ্যাসের সংকট অনেকটাই কাটতে শুরু করেছে। এরই মধ্যে শিল্প খাতে যেসব আবেদন জমা পড়েছে এর বেশির ভাগ অনুমোদন দেয়া হয়েছে। ২৭৬টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান ডিমান্ড নোটের টাকা জমা দিয়েছে। সেসব প্রতিষ্ঠানে ক্রমান্বয়ে সংযোগ দেয়া হচ্ছে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter