ফের জয় চায় আ’লীগ উদ্ধার চেষ্টায় বিএনপি

জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী পীরজাদা মুনির

  জাফর আহমেদ, টাঙ্গাইল ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি
ফাইল ছবি

সদর উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে আবারও জয়ী হতে চায় আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে বিএনপিও তাদের একসময়ের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এ আসন পুনরুদ্ধার করতে চায়। মাঠে আছেন জাতীয় পার্টির এক প্রার্থী।

নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, সম্ভাব্য প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকাসহ পুরো নির্বাচনী মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। প্রত্যেকেই নিজের মতো করে প্রচার চালাচ্ছেন। এ আসনে ছয়জন হেভিওয়েট সম্ভাব্য প্রার্থীর কারণে একাদশ জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সরগরম হয়ে উঠেছে টাঙ্গাইল সদর এলাকা।

বর্তমান এমপি জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছানোয়ার হোসেন মনোনয়ন পেতে মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। সাধারণ মানুষ যে কোনো প্রয়োজনে পাশে পান তাকে। তবে এ আসনে জোট-মহাজোটের প্রার্থী কে হবেন, তা চূড়ান্তের পর ভোটের হিসাব-নিকাশ পাল্টে যেতে পারে।

এ আসনে ভোটার ৩ লাখ ৭৪ হাজার ৬৫২ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৮৮ হাজার ৫০৪ ও পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৮৬ হাজার ১৪৮ জন।

ইনডেক্স গ্রুপের সিইও পীরজাদা শফিউল্লাহ আল মুনির জাতীয় পার্টির সবুজ সংকেত পেয়ে নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। বসে নেই বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও। তবে জেলা বিএনপির কমিটি গঠন নিয়ে দলের কোন্দল প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে। এ কারণে দুই গ্রুপ পৃথক পৃথক কর্মসূচি পালন করছে। গ্রুপিংয়ের কারণে মামলাও হয়েছে।

এ কারণে চার নেতা বহিষ্কার হয়েছেন। বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী ও সাবেক এমপি মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান, যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, বিএনপির নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট আহসান হাবিব, জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ছাইদুল হক ছাদু ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফরহাদ ইকবাল। মাঠে আছেন আরেক শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থী মুরাদ সিদ্দিকীও।

আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি ছাড়াও মনোনয়ন প্রত্যাশায় গণসংযোগ করে যাচ্ছেন টাঙ্গাইল পৌরসভার তিনবারের মেয়র জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জামিলুর রহমান মিরন ও জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাহার আহমেদ।

১৯৭৩ ও ১৯৯৬ সালে এ আসনে আওয়ামী লীগের আবদুল মান্নান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৭৯ সালে বিএনপির টিকিটে আবদুর রহমান নির্বাচিত হন। ১৯৮৬ সালে জাতীয় পার্টির টিকিটে মীর মাজেদুর রহমান, ১৯৮৮ ও ১৯৯১ সালে মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান নির্বাচিত হন।

পরে মাহমুদুল হাসান জাতীয় পার্টি থেকে বিএনপিতে যোগদান করে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এবং ২০০১ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য শিল্পপতি আবুল কাশেম মহাজোটের মনোনয়ন নিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

পরবর্তী সময়ে তিনি মামলায় হেরে গেলে সংসদ সদস্য পদ হারান এবং উচ্চ আদালত এ আসনে মাহমুদুল হাসানকে বিজয়ী ঘোষণা করেন। এ নিয়ে মাহমুদুল হাসান সদর আসনে পাঁচবার এমপি নির্বাচিত হন।

২০১৪ সালের নির্বাচনে এ আসনে মহাজোটের পক্ষ থেকে জাতীয় পার্টির অ্যাডভোকেট আবদুস সালাম চাকলাদারকে মনোনয়ন দিলেও পরে দলীয় প্রধানের অনুরোধে তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেন। পরে এ আসনে মনোনয়ন দেয়া হয় আওয়ামী লীগের ছানোয়ার হোসেনকে। তিনি নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন চেয়ে জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য জেলা সভাপতি এ আসনের সাবেক এমপি আবুল কাশেম, জেলা জাতীয় পার্টির সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম চাকলাদার ও টাঙ্গাইল জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক মুহাম্মদ মোজাম্মেল হক গণসংযোগ শুরু করেছিলেন।

কিন্তু দলের চেয়ারম্যান চিঠি দিয়ে মনোনয়ন নিশ্চিত করায় পীরজাদা শফিউল্লাহ আল মুনির জাতীয় পার্টির একক প্রার্থী হিসেবে বর্তমানে মাঠে রয়েছেন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি নির্বাচনে প্রথমবার ছানোয়ার হোসেন এ আসনে এমপি নির্বাচিত হন। এরপর এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন ও তৃণমূল পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রাখায় তার গ্রহণযোগ্যতা বেড়েছে। তিনি অধিকাংশ সময় এলাকায় অবস্থান করায় সাধারণ মানুষ তাদের প্রয়োজনে সহজেই তাকে কাছে পান।

ছানোয়ার হোসেন যুগান্তরকে বলেন, এলাকার রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। শহর থেকে চরাঞ্চলে যেতে কোনো বাধা নেই। শতভাগ বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা হয়েছে। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পেলে বিজয়ী হব বলে আশা রাখি। মাহমুদল হাসান দীর্ঘদিন মন্ত্রী ও এমপি থাকায় টাঙ্গাইল সদরের রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট, গ্যাস সংযোগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে তার হাতেই। তাই এলাকায় তার ইমেজ ও অবস্থান দৃঢ়।

তিনি যুগান্তরকে বলেন, টাঙ্গাইল-৫ (সদর) আসনে আমি দীর্ঘদিন এমপি থাকাকালীন এলাকায় সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, কৃষি সেচের ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। ‘মাহমুদুল হাসান শিক্ষা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের’ বৃত্তি নিয়ে দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ড মনে রেখে এলাকার ভোটাররা ধানের শীষ প্রতীকে আমাকে বিপুল ভোটে বিজয়ী করবে ইনশাআল্লাহ।

ইনডেক্স গ্রুপের প্রধান নির্বাহী পীরজাদা শফিউল্লাহ আল মুনির জাতীয় পাটির একক প্রার্থী হিসেবে নিয়মিত এলাকায় গণসংযোগ করছেন। তিনি গত রমজানে প্রায় পাঁচ হাজার নারী কর্মীর মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি ভোট প্রার্থনার পাশাপাশি জাকাতের কাপড় বিতরণ করেন, স্কুলের শিক্ষার্থীদের মাঝে স্কুল ব্যাগসহ শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করেন।

পীরজাদা শফিউল্লাহ আল মুনির যুগান্তরকে বলেন, আমার প্রয়াত বাবার নির্দেশনা অনুসারে ব্যবসার লভ্যাংশের একটি অংশ জনকল্যাণে ব্যয় করি। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সহায়তা করায় এলাকার লোকজন, জনপ্রতিনিধি আমাকে সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে অনুরোধ করেছেন। মানুষের জন্য আরও বেশি কাজ করার ইচ্ছা থেকেই আমি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী টাঙ্গাইল পৌরসভার তিনবারের মেয়র জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক জামিলুর রহমান মিরন যুগান্তরকে বলেন, টাঙ্গাইল পৌর এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার পারিবারিক সম্পর্ক। ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের পক্ষে ব্যাপক ভূমিকা রাখায় ইউনিয়ন নেতা ও নির্বাচিত চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সঙ্গেও রয়েছে গভীর সম্পর্ক। তাই এ আসনে দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি নেত্রীকে আসনটি উপহার দিতে পারব বলে আশা রাখি।

আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদের স্ত্রী নাহার আহমেদ গণসংযোগ করছেন। তিনি বলেন, দল যদি আমাকে মনোনয়ন দেয়, তাহলে আমি এ আসন থেকে বিজয়ী হব।

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় যুবদলের সাধারণ সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি সুলতান সালাউদ্দিন টুকু এ মুহূর্তে গণসংযোগে নেই। বর্তমানে তিনি করাবন্দি রয়েছেন। তিনি নির্বাচনের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত রয়েছেন বলে তার অনুসারীরা দাবি করেন। বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য অ্যাডভোকেট খন্দকার আহসান হাবিব দীর্ঘদিন ধরে গণসংযোগ করছেন।

তিনি বলেন, আমি আগে স্থানীয় সরকারের জনপ্রতিনিধি ছিলাম। এলাকার মানুষের সঙ্গে আমার নিবিড় সম্পর্ক। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে অবশ্যই বিজয়ী হব। জেলা বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি ছাইদুল হক ছাদুও মনোনয়ন প্রত্যাশায় তৎপর রয়েছেন। এ কারণে তিনি নিয়মিত গণসংযোগ করছেন। তিনি ২০০৪ সালে পৌরসভার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়েছিলেন। ছাদু কেন্দ্রীয় যুবদলের সদস্য, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক, শহর বিএনপির নির্বাচিত সভাপতি হিসেবে দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করেছেন।

তিনি বলেন, আমি ১/১১সহ দলের সব দুঃসময়ে দলীয় কর্মকাণ্ডে সক্রিয় ছিলাম। কাজেই দল আমাকে মনোনয়ন দিলে এ আসনে ধানের শীষ প্রতীক বিজয়ী হবে বলে আশা করি। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরহাদ ইকবালও এ আসনে প্রার্থী হতে চান। তবে তিনি নাশকতা মামলায় ৩১ আগস্ট আটক হয়ে কারাগারে রয়েছেন।

টাঙ্গাইলে সিদ্দিকী পরিবারের সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর ছোট ভাই মুরাদ সিদ্দিকী এ আসনে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি ২০০১ ও ২০০৮ সালে গামছা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করলেও ২০১৪ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নেন। তিনটি নির্বাচনেই তিনি উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সভা-সমাবেশ করছেন।

মুরাদ সিদ্দিকী যুগান্তরকে বলেন, আমি আওয়ামী পরিবারের সন্তান। কথায় নয়, কাজে বিশ্বাসী। তাই এবার এ আসনে জনগণের মধ্যে যে সাড়া পড়েছে, বিপুল ভোটে আমি বিজয়ী হতে পারব বলে আশা করছি। আরেক স্বতন্ত্র প্রার্থী সৈয়দ খালেদ মোস্তফা নিজেই নিজের পোস্টার সাঁটিয়ে ও দেয়াল লিখনের মাধ্যমে এলাকায় ভোট প্রার্থনা করছেন দীর্ঘদিন ধরেই।

ঘটনাপ্রবাহ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter
×