প্রেমের বিয়ে পরকীয়ায় শেষ

রিকশার নম্বর প্লেটের সূত্র ধরে খুনি চক্র শনাক্ত

  আহমদুল হাসান আসিক ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

তোতা মিয়া ও পূর্ণিমা রায়
তোতা মিয়া ও পূর্ণিমা রায়। ফাইল ছবি

এবার পরকীয়ার বলি হলেন হতভাগ্য রিকশাচালক লাল বাবু। স্ত্রীর পরকীয়ার খবর জেনে যাওয়ায় তাকে জীবন দিতে হল। এভাবে সমাপ্তি ঘটেছে এক যুগ আগে দু’জনের পছন্দে বিয়ে করা গরিবের সাজানো সংসারের।

বলা যায়, প্রেমের বিয়ে পরকীয়ায় শেষ। তবে স্ত্রী পূর্ণিমা রায়ের নতুন প্রেমেও ছেদ পড়েছে। নতুন সংসার আর বাঁধা হয়নি। পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়ে অকপটে সব বলে দিয়েছেন। অগত্যা ধরা পড়েছে প্রেমিক তোতা মিয়াও।

এদিকে চাঞ্চল্যকর এ খুনের ঘটনাটি শুরু থেকে এক রকম ক্লুলেস থাকলেও ঘটনাস্থলের অদূরে পড়ে থাকা রিকশার নম্বর থেকে বেরিয়ে আসে সব। পুলিশ জানতে পারে, জব্দ হওয়া রিকশাটি নিহত লাল বাবুর। আর পরকীয়ার জেরে তাকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করেছে তোতা মিয়াসহ দু’জন সহযোগী। ঘটনার সময় স্বামীর নির্মম মৃত্যু স্বচক্ষে দেখেছেন পূর্ণিমা রায়।

তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, এক যুগ আগে নিজেদের পছন্দেই অর্থাৎ প্রেম করে বিয়ে করেছিলেন দিনাজপুরের লাল বাবু ও পূর্ণিমা রায়। বিয়ের পর জীবিকার সন্ধানে তারা দিনাজপুর থেকে ঢাকার মোহাম্মদপুরে এসে ভাড়া বাসায় সংসার শুরু করেন। রিকশা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন লাল বাবু।

দুই সন্তান নিয়ে এক রকম সুখেই কাটছিল দিন আনা টানাটানির সংসার। কিন্তু হঠাৎ করেই প্রতিবেশী তোতা মিয়ার প্রেমে পড়ে যান লাল বাবুর স্ত্রী পূর্ণিমা রায়। এতেই ঘটে বিপত্তি। দিনে দিনে সবকিছু ওলট-পালট হতে থাকে। লাল বাবুর সংসার আর ভালো লাগে না পূর্ণিমার। কথায় কথায় ঝগড়া-বিবাদ।

একপর্যায়ে কয়েক মাস আগে পূর্ণিমা-তোতার গোপন সম্পর্কের কথা জেনে যান লাল বাবু। এরপর সুখের সংসারে রীতিমতো আগুন লেগে যায়। তবে শত চেষ্টা করেও পূর্ণিমাকে ফেরাতে পারছিলেন না লাল বাবু। কিন্তু বিধি বাম। এরপর শুরু হয় হত্যার ষড়যন্ত্র।

পরিকল্পনা অনুযায়ী গেল ১৫ আগস্ট আরও দুই সহযোগীকে নিয়ে লাল বাবুকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পথ বেছে নেয় তারা। লাশ ফেলে রাখে মোহাম্মদপুরের বছিলার ফিউচার টাউন এলাকার কাশবনে। এমনকি হত্যার ৮ দিন পর স্বামী নিখোঁজ উল্লেখ করে মোহাম্মদপুর থানায় একটি জিডি করেছিলেন পূর্ণিমা রায়। তবে শুরু থেকেই পুলিশের কাছে পূর্ণিমার কথাবার্তা ছিল সন্দেহজনক। শেষ পর্যন্ত সেই সন্দেহ সত্যি হল।

পুলিশ জানায়, ঘটনার দু’দিন পর (১৭ আগস্ট) কাশবন থেকে অজ্ঞাত হিসেবে লাল বাবুর লাশ উদ্ধার করা হয়। সাত দিন পরও পরিচয় না মেলায় পুলিশ বাদী হয়ে মোহাম্মদপুর থানায় একটি হত্যা মামলা করে। তদন্তের ভার পড়ে এসআই মো. নয়ন মিয়ার ওপর। শুরুতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান তিনি।

ঘটনাস্থলের ৮০০ গজ দূরে একটি রিকশা দেখতে পান তিনি। ওই রিকশায় একটি নম্বর প্লেট ছিল। শুরু হয় অনুসন্ধান। একপর্যায়ে তিনি জানতে পারেন মগবাজার থেকে এটি তৈরি করে বিক্রি করেন তোফাজ্জল নামে এক ব্যক্তি। তোফাজ্জল জানান, তিনি রিকশার গ্যারেজে এটি বিক্রি করেন।

লাশ দেখে তিনি ওই ব্যক্তিকে চিনতে পারেননি। তোফাজ্জলকে সঙ্গে নিয়ে ছয় দিনে এসআই নয়ন মোহাম্মদপুর, আদাবর এবং হাজারীবাগে শতাধিক রিকশার গ্যারেজে যান। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে তিনি মোহাম্মদপুরের মালেকের গ্যারেজে গিয়ে জানতে পারেন তাদের একজন চালক রিকশাসহ নিখোঁজ। রিকশা ও লাশ দেখে আবদুল মালেক জানান, এটি লাল বাবুর লাশ।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদপুর থানার এসআই মো. নয়ন মিয়া যুগান্তরকে বলেন, পূর্ণিমা ও তোতা মিয়ার পরকীয়ার বিষয়টি লাল বাবু জেনে যাওয়ায় সংসারে কলহ শুরু হয়। পূর্ণিমাকে মারধরও করেন ক্ষুব্ধ লাল বাবু। এর জেরেই লাল বাবুকে হত্যার পরিকল্পনা করে পূর্ণিমা ও তোতা মিয়া।

কীভাবে কোথায় হত্যা করা হবে সেসব আটঘাট বেঁধে তারা সম্ভাব্য স্পট ঘুরে আসে কিলিং মিশনের আগের দিন। এরপর পরিকল্পনা অনুযায়ী লাল বাবুকে পূর্ণিমা জানায়, তাদের সমস্যা সমাধানে তোতা মিয়া রাত ৯টার দিকে বছিলার ফিউচার টাউন এলাকায় বসতে চায়।

পূর্ণিমার অনুরোধে লাল বাবু রিকশা নিয়ে সেখানে যান। সেখান থেকে ভিন্ন কথা বলে তোতা মিয়া ও তার দুই সহযোগী লাল বাবুকে কাশবনের ভেতরে নিয়ে যায়। প্রথমে তোতা মিয়া গামছা দিয়ে লাল বাবুর গলায় চেপে ধরে। এ সময় সঙ্গে থাকা তোতা মিয়ার দুই সহযোগী হাত-পা চেপে ধরে রাখে। একপর্যায়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন লাল বাবু। পুরো ঘটনা নিজ চোখে প্রত্যক্ষ করে পূর্ণিমা।

পুলিশ জানায়, এ ঘটনায় ১ সেপ্টেম্বর পূর্ণিমা রায় এবং ৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয় তার প্রেমিক তোতা মিয়াকে। পূর্ণিমা হত্যার দায় স্বীকার করে ২ সেপ্টেম্বর আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দিয়েছেন। তোতা মিয়াকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। তাদের দুই সহযোগীকেও গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter