আলোর মুখ দেখছে চট্টগ্রাম বন্দরের বে-টার্মিনাল প্রকল্প

ভিড়তে পারবে মাদার ভেসেল

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  মজুমদার নাজিম উদ্দিন, চট্টগ্রাম ব্যুরো

ছবি: সংগৃহীত

গত অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য হ্যান্ডলিং হয়েছে ২.৮ মিলিয়ন টিইইউএস (টুয়েন্টি ফিট ইক্যুইভেলেন্ট কনটেইনার ইউনিটস)। বন্দরের প্রস্তাবিত বে-টার্মিনাল চালু হলে শুধু এই এক টার্মিনালের মাধ্যমেই এক অর্থবছরে পণ্য হ্যান্ডলিং করা যাবে ৩ মিলিয়ন টিইইউএস। অর্থাৎ চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সক্ষমতার চেয়েও বেশি পণ্য হ্যান্ডলিং হবে এ টার্মিনালে। এতে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে দ্বিগুণেরও বেশি।

এদিকে দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘুরপাক খেতে থাকা বহুল প্রতীক্ষিত সেই বে-টার্মিনাল অবশেষে আলোর মুখ দেখতে যাচ্ছে। এ প্রকল্পের জন্য প্রস্তাবিত ৯০৭ একর ভূমির মধ্যে ৬৮ একর ভূমির অধিগ্রহণ মূল্য বাবদ ৩৬৮ কোটি টাকা আজ (মঙ্গলবার) জেলা প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করবে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

বিকালে নগরীর রেডিসন ব্ল– হোটেলে আনুষ্ঠানিকভাবে চেক হস্তান্তর করা হবে। টাকা হস্তান্তরের চার সপ্তাহের মধ্যেই ভূমি বুঝে পাওয়া যাবে বলে আশা করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। যদিও প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় আরও ৮৩৯ একর ভূমি পাওয়া নিয়ে এখনও রয়ে গেছে অনিশ্চয়তা।

নগরীর হালিশহর এলাকার সাগর তীর ঘেঁষে বে-টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ৬৮ একর ভূমি বুঝে পাওয়ার পর তারা টার্মিনালের প্রাথমিক পর্যায়ের কাজ শুরু করবে। এ পর্যায়ে ডেলিভারি ইয়ার্ড ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণ করা হবে। এ কাজ বছরখানেক সময়ের মধ্যেই শেষ করা যাবে। কোনো জটিলতা না থাকলে জেটি নির্মাণসহ পুরো প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে ২০২২ সালের মধ্যে।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘দেশের প্রচলিত আইনে ভূমি অধিগ্রহণ একটি কঠিন কাজ। ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতার কারণে প্রকল্পটি এতদিন আটকে ছিল। তবে এ কাজে এরই মধ্যে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। প্রস্তাবিত ৯০৭ একর ভূমির মধ্যে ৮৩৯ একর সরকারি খাস ও ৬৮ একর ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি। ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি আমরা সহসাই বুঝে পাচ্ছি।

সরকারি খাসজমি অধিগ্রহণের কাজটি প্রক্রিয়াধীন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় প্রকল্পটি সরকারের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। তাই আশা করছি শিগগিরই সরকারি খাসজমির বন্দোবস্তও পাওয়া যাবে।’ তিনি বলেন, ‘বে-টার্মিনাল চালু হলে বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। পণ্য খালাসের অপেক্ষায় জাহাজকে অতিরিক্ত সময় বসে থাকতে হবে না।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৫ সালে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে কাজ করার সময় বে-টার্মিনালের সম্ভাব্যতার কথা তুলে ধরে। মূলত এরপর থেকেই এ টার্মিনাল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এরই মধ্যে প্রকল্পের কারিগরি ও অর্থনৈতিক সমীক্ষা শেষ করেছে জার্মানভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।

সমীক্ষা অনুযায়ী, হালিশহর উপকূল তীর থেকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরে জেগে ওঠা চরের সঙ্গে যে চ্যানেলটি রয়েছে তার গভীরতা ৭ থেকে ১০ মিটার। সাগরের দিকে এর গভীরতা ১২ মিটারেরও বেশি। অর্থাৎ এই টার্মিনাল দিয়ে ১২ মিটার গভীরতার এবং ২৮০ মিটার দৈর্ঘ্যরে জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারবে। কর্ণফুলীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান জেটিগুলোতে ৯ দশমিক ৫ মিটার গভীরতা ও ১৯০ মিটার দৈর্ঘ্যরে বড় কোনো জাহাজ ভিড়তে পারে না।

বে-টার্মিনাল প্রকল্পটি দেখভাল করছেন বন্দরের নির্বাহী প্রকৌশলী রাফিউল আলম। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘বে-টার্মিনাল হবে মূলত কনটেইনার জাহাজনির্ভর জেটি। তবে প্রয়োজন হলে এতে বাল্ক কার্গোবাহী (খোলা পণ্যবাহী) জাহাজও হ্যান্ডলিং করা যাবে। মোট ১৩টি জেটি থাকবে এ টার্মিনালে।

এর মধ্যে ৭টি কনটেইনার ও বাকি ৬টি মাল্টিপারপাস জেটি। মাল্টিপারপাস জেটিগুলোতে কনটেইনার জাহাজের পাশাপাশি প্রয়োজন হলে বাল্ক কার্গোবাহী জাহাজও হ্যান্ডলিং করার সুযোগ থাকবে। এখানকার চ্যানেলের গভীরতা বেশি থাকায় কিছু মাদার ভেসেলও ভিড়তে পারবে।’

রাফিউল আলম জানান, ভূমি অধিগ্রহণ ছাড়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে প্রয়োজন হবে ২০ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বন্দর কর্তৃপক্ষ নিজস্ব তহবিল থেকে ভূমি অধিগ্রহণের টাকা দিচ্ছে। বাকি অর্থের জন্য বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন হতে পারে। এরই মধ্যে কয়েকটি দেশ বে-টার্মিনালে বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছে। তবে এখনও পর্যন্ত বন্দরের পক্ষ থেকে কোনো বিদেশি বিনিয়োগ আহ্বান করা হয়নি।

বন্দর সংশ্লিষ্ট অপর একটি সূত্র জানায়, ব্যক্তি মালিকানাধীন ভূমি অধিগ্রহণের পাশাপাশি ৮৩৯ একর সরকারি খাসজমি বন্দরের নামে বন্দোবস্ত দিতে ভূমি মন্ত্রণালয়ে আবেদন জানানো হয়েছে। তবে এ বাবদ বন্দরকে খরচ করতে হবে বিপুল পরিমাণ অর্থ। তবে বন্দর চায় প্রতীকী মূল্যে জমি বরাদ্দ পেতে। বিষয়টি নিয়ে ১৮ সেপ্টেম্বর আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে।

তবে প্রতীকী মূল্যে ভূমি বরাদ্দের জটিলতাও রয়েছে। প্রতীকী মূল্যে বরাদ্দ দিতে পারেন শুধু প্রধানমন্ত্রী। এজন্য ফাইলটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানোর প্রয়োজন রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের উপব্যবস্থাপক (ভূমি) জিল্লুর রহমান বলেন, ‘যেহেতু বে-টার্মিনাল দেশের প্রয়োজনে হচ্ছে, তাই আশা করছি এর জন্য যে পরিমাণ সরকারি খাসজমির প্রয়োজন হবে, তা প্রতীকী মূল্যে বন্দরকে দেয়া হবে।’

বন্দর সূত্র জানায়, বে-টার্মিনালের প্রাথমিক কাজ অর্থাৎ ডেলিভারি ইয়ার্ড নির্মিত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের এফসিএল (ফুল কনটেইনার লোডেড) কনটেইনারগুলো সেখানে রাখা হবে। এতে বন্দরের ওপর কনটেইনারের চাপ কমবে। এছাড়া ট্রাক টার্মিনাল নির্মিত হলে তাতে অন্তত ৫ হাজার ভারি পণ্যবাহী গাড়ি রাখা যাবে। বে-টার্মিনালে ট্রাক টোল রোড দিয়ে যাতায়াত করবে। এতে নগরীতে যানবাহনের চাপ কমবে। থাকবে না বন্দরকেন্দ্রিক যানজট।