টাকার সংকটে লিজিং খাত

আমানতকারীদের টাকা ফেরত দিতে পারছে না অনেক প্রতিষ্ঠান

প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  দেলোয়ার হুসেন

ছবি: সংগৃহীত

দেশের নন-ব্যাংকিং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা লিজিং কোম্পানিগুলোতে তহবিল বা টাকার সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ব্যাংকে তারল্য সংকটের কারণে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যাংক থেকে পর্যাপ্ত অর্থ পাচ্ছে না। এমনকি কোনো কোনো ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে মেয়াদি আমানত হিসেবে রাখা বা কলমানিতে ধার দেয়া অর্থ তুলে নিচ্ছে।

আমানতকারীদের কাছ থেকেও চাহিদা অনুযায়ী অর্থ পাচ্ছে না। ফলে তাদের আর্থিক সংকট আরও প্রকট হয়েছে। ইতিমধ্যে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ঋণপ্রবাহ কমে গেছে। কয়েক প্রতিষ্ঠানে তারল্য সংকট বেড়ে যাওয়ায় তারা গ্রাহকদের টাকাও সময়মতো পরিশোধ করতে পারছে না। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।

সূত্র জানায়, বেশ কয়েকটি লিজিং কোম্পানি থেকে পরিচালকরা নামে-বেনামে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন। এ খাতে খেলাপি লিজিংয়ের পরিমাণ বেড়ে গেছে। ফলে বিনিয়োগ করা টাকা ফেরত আসছে না।

ব্যাংকে তারল্য সংকটের কারণে ব্যাংকগুলোও এখন লিজিং কোম্পানিগুলোকে অর্থ দিচ্ছে না। অন্য কোনো উৎস্য থেকেও তারা তহবিলের জোগান পাচ্ছে না। সব মিলিয়ে আর্থিক সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ লিজিং অ্যান্ড ফিন্যান্স কোম্পানিজ অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও ন্যাশনাল হাউজিং ফিন্যান্স অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খলিলুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, লিজিং খাতটি একটি সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।

কয়েকটি কোম্পানির কারণে পুরো খাতের দুর্নাম হচ্ছে। এটি উত্তরণের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং কোম্পানিগুলোর পক্ষ থেকে জোরালো উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আশা করছি এ সংকট কেটে যাবে।

তিনি আরও বলেন, একটি খাতে ২/১টি কোম্পানি ফেল করলেই পুরো খাতের বনদাম হচ্ছে। একটি ইমেজ সংকট তৈরি হচ্ছে। তখন এখানে যারা ভালো করছে তারাও ইমেজ সংকটের বাইরে থাকতে পারে না।

সূত্র জানায়, লিজিং কোম্পানিগুলো সঞ্চয়কারীদের কাছ থেকে ব্যাংকের মতো সহজে আমানত নিতে পারে না। তাদের আমানত নেয়ার ক্ষেত্রে বেশকিছু শর্ত আছে। এর মধ্যে তিন মাসের কম মেয়াদি কোনো আমানত নিতে পারে না। তবে এর বেশি মেয়াদি আমানত নিতে পারে।

ব্যাংকগুলো চলতি আমানতসহ যে কোনো মেয়াদি আমানত নিতে পারে। এ ছাড়া তারা নিজেরা সরাসরি আমানতের টাকা পরিশোধ করতে পারে না। লেনদেন করতে হয় ব্যাংকের মাধ্যমে। তারা কোনো চেকবইও ইস্যু করতে পারে না। এসব কারণে লিজিং কোম্পানিগুলোতে আমানত রাখতে সঞ্চয়কারীরা আগ্রহী হচ্ছে না। যদিও লিজিং কোম্পানিতে আমানতের সুদের হার ব্যাংকের ২ থেকে ৩ শতাংশ বেশি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর তহবিলের বড় উৎস হচ্ছে ব্যাংক। এদের কাছ থেকে তারা স্থায়ী আমানত ও কলমানি থেকে অর্থ নেয়। প্রায় সব ব্যাংকেরই স্থায়ী আমানত রয়েছে লিজিং কোম্পানিগুলোতে। এর বাইরে সামান্য কিছু আমানত আসে সঞ্চয়কারীদের মধ্যে থেকে। বর্তমানে তাদের মোট তহবিলের মধ্যে আমানত থেকে আসে ৬০ শতাংশ।

গত বছরের একই সময়ে ছিল ৫৯ শতাংশ। গত এক বছরে আমানতকারীদের কাছ থেকে তহবিলের জোগান বেড়েছে মাত্র ১ শতাংশ। আমানতের বড় অংশই হচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো থেকে চড়া সুদে নেয়া মেয়াদি আমানত।

কোম্পানির মূলধন থেকে আসে ১৫ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে ছিল সাড়ে ১৬ শতাংশ। কোম্পানিগুলোর খেলাপি লিজের হার বেড়ে যাওয়ার কারণে মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কলমানি মার্কেটে ধার করা থেকে আসে ২৪ শতাংশ। গত বছরে ছিল ২৪ শতাংশ।

অর্থাৎ লিজিং খাতের মোট তহবিল প্রায় ৮৪ শতাংশ আসে ব্যাংকিং খাত থেকে। বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে তারল্য সংকট চলছে। সরকারি খাতের চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক ও বেসরকারি খাতের কয়েকটি ইসলামী ব্যাংক ছাড়া প্রায় সব ব্যাংকেই রয়েছে তারল্য সংকট।

যে কারণে ব্যাংকগুলোও এখন লিজিং কোম্পানিতে আমানত রাখতে পারছে না। উল্টো স্থায়ী আমানত হিসেবে লিজিং কোম্পানিতে রাখা আমানতের অংশ তুলে নিচ্ছে ব্যাংক। এর মধ্যে ন্যাশনাল, মিউচুয়াল ট্রাস্ট, মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিজিং কোম্পানিতে রাখা তাদের স্থায়ী আমানতের একটি অংশ তুলে নিয়েছে।

কলমানি মার্কেট থেকেও তারা ধার পারছে না। কেননা কয়েকটি লিজিং কোম্পানি কলমানি থেকে একদিনের জন্য ধার করে তা পরিশোধ করতে পারছে না। ফলে তার মেয়াদ বাড়াতে হচ্ছে। এতে ব্যাংকও বিপাকে পড়েছে।

এর মধ্যে ইতিমধ্যে কয়েকটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বড় ধরনের তহবিল সংকটে পড়েছে। আর্থিক সংকটে তাদের যেমন লিজ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। তেমনি গ্রাহকদের কাছ থেকে নেয়া আমানতের টাকাও পরিশোধ করতে পারছে না। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে পিপলস লিজিং, বাংলাদেশ ফিন্যান্স। এ ছাড়া আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠান তহবিল সংকটে পড়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, আর্থিক খাতের তহবিলের জোগান বাড়াতে তারা বন্ড মার্কেটকে চাঙ্গা করার উদ্যোগ নিয়েছে। এ ছাড়া যেসব প্রতিষ্ঠান ভালো তারা শেয়ারবাজার থেকে রাইট শেয়ার বা বন্ড চেড়ে টাকা তুলতে পারছেন।

আর যারা ভালোভাবে চলতে পারছে না তাদের সংকটটিই বেশি। কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বড় ধরনের অনিয়ম রয়েছে সেগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।