রফতানিমুখী শিল্প

বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স দিতে আপত্তি

  সাদ্দাম হোসেন ইমরান ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স দিতে আপত্তি

শতভাগ বিদেশি-মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স দেয়ার ব্যাপারে আপত্তি তুলেছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। কারণ লাইসেন্সের অপব্যবহার করলে এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের দোষী সাব্যস্ত করা যায় না এবং রাজস্ব আদায় সম্ভব হয় না। এ জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে বেশকিছু ঝুঁকি এবং বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্সিং বিধিমালা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে সম্প্রতি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) চিঠি দিয়েছে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট। চিঠিতে পুরনো মেশিনের আমদানি প্রাপ্যতা নির্ধারণ জটিলতা, ভাড়া জায়গায় স্থাপন করা কারখানার লাইসেন্স দেয়ার ঝুঁকি, সিটি কর্পোরেশন এলাকায় অবস্থিত শিল্পের লাইসেন্স না দেয়া এবং প্রতিষ্ঠানের সব পরিচালককে বন্ডার হিসেবে মনোনয়ন দেয়ার যৌক্তিকতাও তুলে ধরা হয়।

চিঠিতে বলা হয়েছে, বন্ড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা অধিকাংশ বিদেশি বিনিয়োগকারী স্থায়ী ঠিকানা হিসেবে দেশের বাইরের ঠিকানা দেন।

এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে যারা (দেশি বা বিদেশি) কাজ করেন তারা বেতনভুক্ত কর্মচারী। বন্ড সুবিধার অপব্যবহার হলে আইনগতভাবে তাদের দায়ী করা সম্ভব নয়। তাছাড়া বিদেশি বিনিয়োগকারীদের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দূতাবাস, হাইকমিশন বা কনস্যুলেট থেকে প্রত্যয়নপত্র বা গ্যারান্টি দেয়া হয় না। ফলে পরবর্তীকালে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ প্রতিষ্ঠিত হলে তা আদায় সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্সিং বিধিমালা সংশোধন করে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে শর্তারোপ করা যেতে পারে। অন্যদিকে বিদেশি বিনিয়োগের আড়ালে দেশীয় দুষ্কৃতকারীরা বন্ড লাইসেন্সের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির সুযোগ নিতে পারে বলেও চিঠিতে বলা হয়।

জানা গেছে, বর্তমানে ৬ হাজার ৬৬৭টি প্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স দেয়া আছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক, এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠানের সংখ্যাই বেশি। প্রায় ৪ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স সচল আছে। বাকি দুই হাজার প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স বন্ড সুবিধা অপব্যবহারের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকি দেয়ায় বাতিল করা হয়েছে।

বন্ড কমিশনারেট সূত্র জানায়, বন্ডেড ওয়্যারহাউস লাইসেন্সিং বিধিমালা-২০০৮ এর আওতায় বিভিন্ন রফতানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স দেয়া হয়। এর বিপরীতে প্রতিষ্ঠান শুল্কমুক্ত সুবিধায় বিদেশ থেকে আমদানি করতে পারে। এ সুযোগ কাজে লাগাতে কোম্পানি আইনের অধীনে বিদেশি কোম্পানি গঠন এবং পরবর্তী সময়ে বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নিয়ে বন্ড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হয়। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স দিতে গিয়ে বেশকিছু বিষয় সামনে এসেছে। যেমন- অনেক বিনিয়োগকারীর ওয়ার্ক পারমিট থাকে না। বিনিয়োগকারী হিসেবে নিবন্ধিত হতে খুব অল্প সময়ের জন্য এরা দেশে অবস্থান করেন। এ ধরনের প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিলে অপব্যবহারের সম্ভাবনা বাড়ে।

সূত্র আরও জানায়, বিগত দিনে শতভাগ বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়ে নানামুখী ঝামেলায় পড়তে হয়েছে। শুধু লাইসেন্স স্বাক্ষরের দিন বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আসছেন। পরে হদিস পাওয়া যায় না। আবার অল্প সময়ের জন্য এসে তাদের এদেশের প্রতিনিধিদের বন্ডার হিসেবে ক্ষমতা অর্পণ করে যাচ্ছেন। এসব বিষয়ে নানা অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক দুষ্টচক্র সরকারের বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিদেশিদের সামনে রেখে কোম্পানি গঠন করছে। সব কাগজপত্রে বিদেশিদের নাম থাকছে। কিন্তু কোম্পানি গঠন থেকে শুরু করে পরিচালনা সবই করছে দুষ্টচক্র।

একই সঙ্গে জমি ভাড়া নিয়ে শিল্প স্থাপন করে অনেকে বন্ড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করছে। এক্ষেত্রেও জটিলতা আছে। বর্তমানে বেশকিছু দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান ভাড়া জায়গায় গার্মেন্টস ও এক্সেসরিজ প্রতিষ্ঠান করে সেই ঠিকানায় বন্ড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করছেন। বিধিমালায় এ বিষয়ে বিধিনিষেধ না থাকায় এ ধরনের আবেদন বিবেচনা করতে হচ্ছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে যদি প্রতিষ্ঠানের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির তুলনায় শুল্ক ফাঁকির পরিমাণ বেশি হয়, তাহলে ওই শুল্ক আদায় সম্ভব নয়।

এ দুই ধরনের জটিলতা নিরসনের বন্ড কমিশনারেট থেকে দুটি সুপারিশ করা হয়েছে। বন্ড কমিশনারেট মনে করে, বিদেশি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স দেয়ার ক্ষেত্রে ৫১ শতাংশ শেয়ার দেশীয় মালিকানাধীন হওয়ার শর্ত আরোপ করা যেতে পারে। এর যৌক্তিকতায় বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বিদেশি বিনিয়োগকে উৎসাহিত করতে শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন যে কোনো উৎপাদন বা ব্যবসা কার্যক্রম চলতে পারে। কিন্তু বন্ড একটি বিশেষ শুল্কমুক্ত সুবিধা হওয়ায় এ সুবিধার মাধ্যমে শুল্কমুক্তভাবে পণ্য আমদানিতে রাজস্ব ঝুঁকি রয়েছে। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলের (ইপিজেড) বাইরে অবস্থিত হলে ৫১ শতাংশ দেশীয়-মালিকানার শর্ত আরোপ করা যায়। এতে দেশীয় অংশীদারদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় সম্ভব হবে। দ্বিতীয়ত, সম্পদ বিবরণী দেয়া সাপেক্ষে বিদেশিরা উদ্ভূত দায়দেনা পরিশোধে বাধ্য থাকবেন- এমন অঙ্গীকারনামার বিধান চালু করা যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের কমিশনার ড. আল আমিন প্রামাণিক যুগান্তরকে বলেন, নতুন বন্ড লাইসেন্স ইস্যু ও আমদানি প্রাপ্যতা নির্ধারণের ক্ষেত্রে কিছু জটিলতা আছে। এগুলো এনবিআরকে অবহিত করা হয়েছে। এসব বিষয়ে এনবিআর যে সিদ্ধান্ত দেবে, সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

পুরনো মেশিনে আমদানি প্রাপ্যতা নির্ধারণে শর্তারোপের সুপারিশ : চিঠিতে বলা হয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে পুরনো এবং দেশীয় উৎস থেকে মেশিনারি সংগ্রহ করে বন্ড লাইসেন্সের জন্য আবেদন করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে মেশিনের মূল্য, আয়ুষ্কাল নির্ণয় করা কঠিন হচ্ছে। পাশাপাশি পুরনো মেশিনের বিপরীতে বন্ড সুবিধায় দেয়া কাঁচামালের আমদানি প্রাপ্যতা নির্ণয়ের ক্ষেত্রে যৌক্তিকীকরণ দুরূহ হয়ে পড়ে। এ বিষয়ে এনবিআরের প্রজ্ঞাপন বা আদেশ না থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন বিবেচনা করতে হচ্ছে। তাই পুরনো মেশিনে আমদানি প্রাপ্যতা দেয়ার ক্ষেত্রে শর্ত আরোপ করা প্রয়োজন বলে মনে করে বন্ড কমিশনারেট।

আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় বন্ড লাইসেন্সেও আপত্তি : এনবিআরে দেয়া চিঠিতে বলা হয়, বর্তমানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আবাসিক বা বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে ঘোষিত অনেক স্থানে অবস্থিত প্রতিষ্ঠানের জন্য বন্ড লাইসেন্সের আবেদন করা হচ্ছে। এ ধরনের আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকায় অবস্থিত প্রতিষ্ঠানকে বন্ড লাইসেন্স দেয়া সমীচীন নয়।

সব পরিচালককে বন্ডার মনোনয়ন দেয়ার যৌক্তিকতা তুলে ধরে চিঠিতে বলা হয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠানের নতুন বন্ড লাইসেন্স আবেদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সব পরিচালক বন্ডার হিসেবে আবেদন করছে না অথবা স্বাক্ষরও করছে না। এক্ষেত্রে পরিচালকদের কয়েকজনকে লাইসেন্সের বন্ডার হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হয়। কিন্তু প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ক্ষেত্রে দায়দেনা ও মুনাফা পরিচালকের শেয়ারের সংখ্যার আনুপাতিক হারে বণ্টন হয়। রাজস্বের সুরক্ষার স্বার্থে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির সব পরিচালককে বন্ডার হিসেবে লাইসেন্সে স্বাক্ষর করার বিধান চালু করা উচিত।

এনবিআর সূত্র জানায়, ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেটের চিঠিতে উল্লেখিত বিষয় পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এ জন্য ২০ সেপ্টেম্বর একটি সভা আহ্বান করা হয়েছে। ওই সভায় সব পক্ষের বক্তব্যের পর লাইসেন্সিং বিধিমালা সংশোধন করা হবে কিনা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

 

 

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter