আ’লীগে এগিয়ে ভিপি জোয়াহের মাঠে হেভিওয়েট কাদের সিদ্দিকী

  জাফর আহমেদ, টাঙ্গাইল ও মু. মাসুদ রানা, সখীপুর ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আ’লীগে এগিয়ে ভিপি জোয়াহের মাঠে হেভিওয়েট কাদের সিদ্দিকী

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের দৌড়ঝাঁপ বেড়ে গেছে। সখীপুর ও বাসাইল উপজেলা নিয়ে গঠিত টাঙ্গাইল-৮ আসনের প্রার্থীরাও ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। মনোনয়ন যুদ্ধে বর্তমান এমপি অনুপম শাহজাহান জয়সহ আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী মাঠে। তবে বর্তমান এমপির বিরুদ্ধে দলীয় নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন না করার অভিযোগ রয়েছে। তার সঙ্গে নেতাকর্মীদের দূরত্ব তৈরির দাবি অনেকের।

স্থানীয় নেতাকর্মীরা করটিয়ার সা’দত বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের দুইবারের ভিপি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলামের (ভিপি জোয়াহের) দিকে ঝুঁকে পড়েছেন। তার পক্ষে একাট্টা দুই উপজেলা আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিরাও।

মাঠে সরব আরেক হেভিওয়েট প্রার্থী কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি কাদের সিদ্দিকী। বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান গত এপ্রিলে দুই উপজেলায় কর্মিসভা করে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করার ব্যাপারে দলীয় সিদ্ধান্তের কথা জানান। দলের হাইকমান্ডের বরাত দিয়ে তিনি বিএনপি নেতাকর্মীদের কাদের সিদ্দিকীর পক্ষে নির্বাচন করতে দলীয় কর্মীদের নির্দেশনাও দেন। এর আগে আযম খানই বিএনপির টিকিটে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছিলেন। মঙ্গলবারও তিনি তার আগের বক্তব্যে অটল থাকার কথা যুগান্তরকে জানান।

এর আগে গত ৩০ মার্চ বাসাইল পৌরসভার নির্বাচনে কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের মেয়র প্রার্থীকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ান বিএনপি প্রার্থী। এসব বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। জাতীয় পার্টির কাজী আশরাফ সিদ্দিকী প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। তবে আওয়ামী লীগ যেকোনো মূল্যে আসনটি ধরে রাখতে চায়। জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে প্রার্থী ও ভোটের চিত্র পাল্টে যেতে পারে।

বিশেষ করে নব্বইয়ের পটপরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির হুমায়ুন খান পন্নী। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্র“য়ারি নির্বাচনে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহম্মেদ আযম খান এমপি হন। ১৯৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে নৌকা নিয়ে বিজয়ী হন কাদের সিদ্দিকী। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের শওকত মোমেন শাহজাহান। কিন্তু ২০১৪ সালে বিজয়ী হওয়ার দু’সপ্তাহের মধ্যেই শওকত মোমেন মারা যান। উপনির্বাচনে বিজয়ী হন তারই ছেলে অনুপম শাহজাহান জয়।

২০০৮ সালের নির্বাচনে শওকত মোমেন ১ লাখ ৩৪ হাজার ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিএনপির আহমেদ আযম খান ৬৫ হাজার ৫২১ ভোট ও কাদের সিদ্দিকী পেয়েছিলেন ৩৮ হাজার ৭৭৫ ভোট। এর আগে ২০০১ সালের নির্বাচনে কাদের সিদ্দিকী ৮০ হাজার ৫৫৮ ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবদুস সালাম খান ৫৪ হাজার ৫০৫ ভোট পেয়ে দ্বিতীয়, বিএনপির আহমেদ আযম খান ৫১ হাজার ভোট পেয়ে তৃতীয় হন। এছাড়া ২০১৪ সালের ২৯ মার্চের উপনির্বাচনে অনুপম শাহজাহান জয় ৭৩ হাজার ৫৬৫ ভোট পেয়ে এমপি হন। আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আবদুল মালেক ৭১ হাজার ৩২৯ ভোট পেয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় এলাকায় কাদেরিয়া বাহিনীর ব্যাপক দাপট ছিল। সেই বাহিনীর প্রধান বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম ১৯৯৬ সালে নৌকা নিয়ে প্রথম এমপি হন। এ সময় আওয়ামী লীগ ও সংসদ থেকে পদত্যাগ করেন তিনি। পরে উপনির্বাচনে অংশ নিলেও তিনি হেরে যান এবং বিজয়ী হন আওয়ামী লীগের শওকত মোমেন শাহজাহান। ওই নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ উঠে। ২০০১ সালের ভোটে কাদের সিদ্দিকী নিজের গড়া দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের প্রার্থী হিসেবে এমপি হন।

নানা অনিয়ম ও সমালোচনায় জড়িয়ে যাওয়া বর্তমান এমপি অনুপম শাহজাহান জয়ও আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন পেতে তৎপর। তবে দলের প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে রয়েছেন অ্যাডভোকেট জোয়াহেরুল ইসলাম। তৃণমূল থেকে উঠে আসা জোয়াহেরুল জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সম্পাদক ছিলেন। টাঙ্গাইলে আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা ফারুক আহমেদ হত্যার বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়ায় জেলায় তার ভাবমূর্তি উজ্জ্বল। তার এই সাহসী নেতৃত্বের কারণে তিনি এলাকায় ব্যাপকভাবে জনপ্রিয়। দুটি পৌরসভা ও ১৪টি ইউনিয়ন নিয়ে টাঙ্গাইল-৮ আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন- সখীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত শিকদার, সাবেক অতিরিক্তি সচিব ও বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান একেএম আসাদুল হক তালুকদার, জাতীয় শ্রমিক লীগের সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম খান, ঢাকা ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউটের সহসভাপতি আতাউল মাহমুদ, সখীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য অধ্যক্ষ সাঈদ আজাদ, বাসাইল উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী সরকার আরিফুজ্জামান ফারুক।

জোয়াহেরুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর অনেক অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে টাঙ্গাইল ছাত্রলীগকে সংগঠিত করেছি। পাঁচবার কারাভোগ করতে হয়েছে। শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে এলাকায় সরকারের ইমেজ বৃদ্ধি পেয়েছে। দলকেও শক্তিশালী করতে পেরেছি। আমি গণসংযোগে গেলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে কর্মিসভা রূপ নেয় জনসভায়। উন্নয়নের সুফল ছড়িয়ে দিতে নৌকার প্রার্থী হতে চাই। মনোনয়ন পেলে প্রতিপক্ষ যতবড় শক্তিধরই হোক, আসনটি শেখ হাসিনাকে উপহার দিতে পারব। বর্তমান এমপি তার পিতার উন্নয়ন ধারাবাহিকতা বজায় রেখে কাজ করলেও নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করেননি। ত্যাগী নেতাকর্মীদের বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী সখীপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান শওকত শিকদার বলেন, তৃণমূল ও জনসমর্থনের দিক বিবেচনা করলে দল আমাকেই আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন দেবে।

কথা হয় আসাদুল হক তালুকদারের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে জানান, তিনি তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকার সময় সখীপুর ও বাসাইলের উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছেন। নিয়মিত গণসংযোগ ও সভা-সমাবেশ করছেন। একমাত্র তিনিই বাসাইলের প্রার্থী, এটি তার জন্য বাড়তি সুবিধা। মনোনয়ন পেলে জয়ের ব্যাপারে তিনি আশাবাদী।

আবদুস সালাম খান বলেছেন, জননেত্রী শেখ হাসিনার আশীর্বাদ পেয়েই গণসংযোগ করছি। বর্ষীয়ান এই রাজনীতিক বলেন, আমাকে মনোনয়ন দিলে দলে কোনো গ্র“পিং থাকবে না।

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য ও ক্লিন ইমেজের সাঈদ আজাদ তরুণ ও মেধাবী হিসেবে ভোটারদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়। তিনি বলেন, জরিপের মাধ্যমে মনোনয়ন দেয়া হলে আমিই দলের মনোনয়ন পাব। আপামর জনতা, ভোটার ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের নিয়েই কাজ করছি।

কথা হয় সখীপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা কুতুব উদ্দিন আহমেদ ও সখীপুর পৌরসভার মেয়র আবু হানিফ আজাদের সঙ্গে। তারা বলেন, জোয়াহেরুলের পক্ষে শুধু আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাই নয়, অধিকাংশ ইউপি চেয়ারম্যান ও সদস্য, দলের ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডের নেতাকর্মীরাও তার পক্ষে। এ অঞ্চলে সাবেক ছাত্রদের মধ্যেও তার যথেষ্ট প্রভাব।

বাসাইল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কাজী অলিদ ইসলাম ও বাসাইল পৌরসভার নবনির্বাচিত মেয়র আবদুর রহিম আহমেদ বলেন, বাসাইলের অধিকাংশ ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং ইউপি চেয়ারম্যানদেরও সমর্থন রয়েছে ভিপি জোয়াহেরের প্রতি।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আহমেদ আযম খান মঙ্গলবার যুগান্তরকে জানান, দলের হাইকমান্ডের সিদ্ধান্ত হচ্ছে এ আসনে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর পক্ষে কাজ করা। দল ও দেশের বৃহত্তর স্বার্থে আমি এ ত্যাগ শিকার করে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে ধানের শীষ নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য মাঠে কাজ করে যাচ্ছেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক শফি শাওন।

এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব কাজী আশরাফ সিদ্দিকী। দলীয় মনোনয়নের ইঙ্গিত পেয়ে তিনি গণসংযোগে নেমেছেন। কাজী আশরাফ সিদ্দিকী বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সব রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হবে। সেজন্য নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। আসনের মোট ভোটার ৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩১৮। পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৮ হাজার ২৫৭।

  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত
সব খবর

ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : সাইফুল আলম, প্রকাশক : সালমা ইসলাম

প্রকাশক কর্তৃক ক-২৪৪ প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড), বারিধারা, ঢাকা-১২২৯ থেকে প্রকাশিত এবং যমুনা প্রিন্টিং এন্ড পাবলিশিং লিঃ থেকে মুদ্রিত।

পিএবিএক্স : ৯৮২৪০৫৪-৬১, রিপোর্টিং : ৯৮২৪০৭৩, বিজ্ঞাপন : ৯৮২৪০৬২, ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৩, সার্কুলেশন : ৯৮২৪০৭২। ফ্যাক্স : ৯৮২৪০৬৬ 

E-mail: [email protected]

© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত ২০০০-২০১৮

converter